-মো.কামাল উদ্দিনঃ
বাংলাদেশের নাগরিক জীবনে গ্যাস আজ একটি অপরিহার্য জ্বালানি। শহরের রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা পর্যন্ত সর্বত্র গ্যাসের ব্যবহার অপরিসীম। অথচ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ এক অদৃশ্য বৈষম্যের শিকার। কেউ গ্যাস পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে না—একই রাষ্ট্রে এমন বৈষম্য কতটা অসহনীয়, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। “কেউ পাবে, কেউ পাবে না—তা হবে না, তা হবে না” এই শ্লোগানকে সামনে রেখে গ্রাহক-গ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণ ঠিকাদার ঐক্য ফেডারেশন বাংলাদেশ সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। সংগঠনের সভাপতি আবুল হাসেম পাটোয়ারী এবং সাধারণ সম্পাদক এ.কে.এম অলিউল্লা হক নেতৃত্বে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নেন বিপুল সংখ্যক ভুক্তভোগী গ্রাহক, বাড়ির মালিক, ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষ।দশ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা- ২০১৫ সাল থেকে পেট্রোবাংলার ছয়টি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির আওতায় প্রায় ২,১৫,০০০ গ্রাহক আবাসিক গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেছেন। আবেদন জমা দেওয়ার পাশাপাশি তারা ডিমান্ডনোট, পাইপ লাইন নির্মাণ, রাস্তা কাটার অনুমতি, ঠিকাদারি খরচসহ সব ধরণের অর্থ ব্যয় করেছেন। অনেকেই নিজেদের সঞ্চয় খরচ করেছেন, কেউ আবার ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন। তবুও আজ পর্যন্ত তাদের ঘরে আগুন জ্বলেনি। অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে দশ বছর পার হয়ে গেছে। অথচ সরকারের ২০১৪ সালের গেজেট নোটিফিকেশনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সার্ভিস লাইন নির্মাণ এবং তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিশন সম্পন্ন করে সংযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা আজও কার্যকর হয়নি। সভাপতি আবুল হাসেম পাটোয়ারীর ভাষায়—“এটি শুধু অবহেলা নয়, সরাসরি জনগণের সাথে প্রতারণা। একই দেশে এক শ্রেণি মানুষ গ্যাস সুবিধা ভোগ করবে আরেক শ্রেণি বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে—এ অন্যায় আর চলতে পারে না।”আবাসন খাতের বিপর্যয়-শহরের জনসংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন। মানুষের বসবাসের জায়গা তৈরি করতে বহু পরিবার ভিটেমাটি বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না থাকায় এসব ভবন আজ ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। নির্মিত ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া যাচ্ছে না। বিনিয়োগের বিপরীতে মালিকরা প্রত্যাশিত আয় পাচ্ছেন না।ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে অনেকে দেউলিয়া হয়ে পড়ছেন। বিদ্যমান সংযোগে চুলা বর্ধিতকরণ কাজ বন্ধ থাকায় বাড়ির অতিরিক্ত তলা ভাড়া দেওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভয়াবহ আর্থিক ও মানসিক চাপে দিন কাটাচ্ছেন।
ঠিকাদারদের বেকারত্ব-শুধু গ্রাহকরাই নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ঠিকাদাররাও। ২০১৫ সালে হঠাৎ করে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে সারাদেশের প্রায় ২৩০০ ঠিকাদার ও তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তারা আজ পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সাধারণ সম্পাদক এ.কে.এম অলিউল্লা হক বলেন—“দেশ যখন উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে, তখন হাজার হাজার মানুষকে কর্মহীন করে রাখা মোটেও যৌক্তিক নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবর্তে এই খাতে বেকারত্ব তৈরি করা রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর।” বৈষম্যের চিত্র-ভুক্তভোগীরা মনে করেন, একই রাষ্ট্রে কেউ সংযোগ পাচ্ছে আবার কেউ পাচ্ছেন না—এটাই বৈষম্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ—এসব নাগরিক সুবিধা সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। অথচ বছরের পর বছর এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, পেট্রোবাংলার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ও অবহেলার কারণেই এই দীর্ঘসূত্রিতা চলছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সংযোগ না দিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করছেন, যা নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে।সংগঠনের সুস্পষ্ট দাবি-মানববন্ধন থেকে সভাপতি আবুল হাসেম পাটোয়ারী ও সাধারণ সম্পাদক এ.কে.এম অলিউল্লা হক নিম্নলিখিত দাবিগুলো উত্থাপন করেন—১. অপেক্ষমাণ প্রায় ২.১৫ লক্ষ গ্রাহকের গ্যাস সংযোগ অবিলম্বে প্রদান। ২. বিদ্যমান লাইনে চুলা বর্ধিতকরণ কাজ পুনরায় চালু। ৩. নতুন আবাসিক ও শিল্প-বাণিজ্যিক সংযোগ প্রদানের জটিলতা দ্রুত নিরসন। ৪. বৈষম্যহীন সার্বজনীন সংযোগ প্রদানে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা। ৫. দীর্ঘসূত্রিতা ও অবহেলার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দেশের সাংবাদিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন— “আপনারা জনগণের কণ্ঠস্বর। আপনারা আমাদের এই ন্যায্য দাবিগুলো সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিন। গণমাধ্যমের ভূমিকা ছাড়া এই বৈষম্যের অবসান সম্ভব নয়।” তারা বিশ্বাস করেন, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের প্রচারের মাধ্যমেই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এ সংকটের বাস্তব চিত্র পৌঁছাবে এবং দ্রুত সমাধানের পথ খুলে যাবে। দশ বছর ধরে অমানবিক ভোগান্তি সহ্য করা আড়াই লক্ষ গ্রাহক আজ একটাই প্রত্যাশা করেন—অবিলম্বে গ্যাস সংযোগ। এই দাবি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের সাথেও জড়িত। আবাসন খাত, শিল্প-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান—সবকিছুই এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। সভাপতি আবুল হাসেম পাটোয়ারী এবং সাধারণ সম্পাদক এ.কে.এম অলিউল্লা হক মানববন্ধনের সমাপনী বক্তব্যে বলেন—“আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাসী। কিন্তু বৈষম্যের শিকার হয়ে আর চুপ থাকব না। গ্যাস সংযোগ আমাদের অধিকার—এ অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।” তাদের কণ্ঠে ছিল বিশ্বাস, সরকারের সঠিক পদক্ষেপে এ বৈষম্যের অবসান ঘটবে, ঘরে ঘরে আলো জ্বলবে, রান্নাঘরে আগুন জ্বলবে।