মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম মহানগরের চান্দগাঁও এলাকায় টর্চার সেল গড়ে তুলে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা চালিয়ে আসছিল একদল কুখ্যাত অপরাধী। অবশেষে একটি সাহসী, পরিকল্পিত ও দুর্ধর্ষ অভিযানে তাদের আস্তানায় হানা দিয়ে র্যাব-৭ ও চান্দগাঁও থানা পুলিশ যৌথভাবে ১০ জন সক্রিয় সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে দেশীয় অস্ত্র, পিস্তলের গুলি, শটগানের কার্তুজ, ইলেকট্রিক শক মেশিন, মাদকদ্রব্য, সিসিটিভি ক্যামেরা, টাকা গোনার মেশিন ও টর্চার সেলের ভয়ংকর উপকরণ। এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন চান্দগাঁও থানার সুযোগ্য অফিসার ইনচার্জ জনাব মোঃ আফতাব উদ্দিন। অভিযান পরিচালনায় অংশ নেন র্যাব-৭ এর সিপিসি-৩ এর বিশেষ দলও।
ঘটনার পটভূমি: প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া-২১ জুলাই দুপুর ৩টার দিকে ফরিদারপাড়া এলাকায় নগরীর কুখ্যাত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী শহিদুল ইসলাম ওরফে “বুইস্যা” তার দলবল নিয়ে শো-ডাউনে নামে। এলাকায় দাপট দেখিয়ে প্রকাশ্যে শটগান ও পিস্তল থেকে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক ছড়ায়। স্থানীয়দের আতঙ্ক আর তথ্যভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারির পরপরই অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
অভিযান ও সাফল্য: ধরা পড়ল ১০ সন্ত্রাসী-বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের পেছনে মাছ বাজারের উপর তৃতীয় তলায় অবস্থিত গোপন আস্তানায় হানা দিয়ে পুলিশের আভিযানিক দল গ্রেফতার করে ১০ জন কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে। এটি শুধু সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি ছিল না, বরং এটি ছিল অত্যাধুনিক নির্যাতন কেন্দ্র (টর্চার সেল) যেখানে অপরাধীদের নিজেদের আইন ছিল, ছিল বিচারহীনতার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
উদ্ধারকৃত ভয়ংকর আলামতসমূহের তালিকা: অস্ত্র ও গোলাবারুদ: ধারালো চাইনিজ কুড়াল, বিশালাকৃতির রামদা, চাকু, করাত,একটি তাজা পিস্তলের গুলি (KF 7.65),বিভিন্ন ধরনের ১৬টি শটগানের তাজা ও ব্যবহৃত কার্তুজ,৯টি ব্যবহৃত পিস্তলের খোসা,হিটগান ও বিভিন্ন অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম নির্যাতন ও টর্চার সামগ্রী:,৯৮০০০০ ভোল্ট ক্ষমতাসম্পন্ন ‘Made in USA’ ইলেকট্রিক শক মেশিন,সিসিটিভি ক্যামেরা,২০ ফুট লম্বা ক্লাইম্বিং রোপ টর্চার কক্ষে ব্যবহৃত কাঁচি, র্যাট, ব্লেড ইত্যাদি মাদকদ্রব্য ও সরঞ্জাম:,১০ লিটার দেশীয় চোলাই মদ (মূল্য ৫ হাজার টাকা),১০টি HUNTER ব্রান্ডের বিয়ার ক্যান (মূল্য ৫ হাজার টাকা),৪০০ গ্রাম গাঁজা (মূল্য ৪ হাজার টাকা),মাদক বিক্রির কাজে ব্যবহৃত ৫০০টি বায়ুরোধক জিপার, ২০০০ পিস খালি কাগজের প্যাকেট,ডিজিটাল ওজন মেশিন (RFL ব্র্যান্ড) অর্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি:,একটি সাদা-কালো রঙের টাকা গণনার মেশিন,একটি কালো রঙের কাঁধ ব্যাগ,বিভিন্ন মাপের স্ক্রু ড্রাইভার ও প্লাস,গ্রেফতারকৃতদের পরিচয়: গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ চাঁদপুর, কেউ পটিয়া, কেউবা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রাঙ্গামাটির বাসিন্দা হলেও সবাই এখন চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছিল। তারা একে অপরের সঙ্গে সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। সবার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রধান অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম বুইস্যা পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের বক্তব্য: চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আফতাব উদ্দিন বলেন, “এই সন্ত্রাসীদের তৎপরতায় এলাকাবাসী আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। তারা শুধু অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা চালাত না, বরং সাধারণ মানুষকে অপহরণ করে নির্যাতন করত, জোর করে টাকা আদায় করত। আমরা জনগণের নিরাপত্তার জন্য জীবন বাজি রেখে কাজ করছি।”জনমনে স্বস্তি ও পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা: এই অভূতপূর্ব অভিযানে জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরেছে। এলাকাবাসী পুলিশের এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে—এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করতে হবে যেন কেউ আর সন্ত্রাসের নামে সাধারণ মানুষের শান্তি হরণ না করতে পারে।