“চট্টগ্রামে বেকারি শিল্পে শুদ্ধি অভিযান: আমার নেতৃত্বে গঠিত এক ঐতিহাসিক রূপান্তর”

6 Min Read

– মো. কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামে একসময় প্রতিটি মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠছিল বেকারি। বাইরে থেকে আকর্ষণীয় মনে হলেও, ভেতরের চিত্র ছিল ভয়াবহ। অধিকাংশ বেকারিতেই চলছিল অনিয়মের রাজত্ব—অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ময়লাভরা মেঝে, পচা ডিম, নিম্নমানের ময়দা, ক্ষতিকর রঙ ও বাসি উপাদানে তৈরি হতো পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, টোস্টসহ নানা পণ্য। প্লাস্টিকঘ্রাণযুক্ত তেলে ভাজা এসব খাবার শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল শ্রেণির মানুষের জীবনের জন্য হয়ে উঠেছিল বিষ।
দু:খজনকভাবে, কেউ এগিয়ে আসেনি এই অন্যায় আর অনাচার থামাতে। প্রশাসন থেকেও ছিল না কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। তখনই আমি—কেবল কলমের সৈনিক হিসেবে নয়, একজন সংগঠক, জনসেবক ও নির্ভীক পথপ্রদর্শক হিসেবে—প্রতিবাদের মঞ্চে সরব হই। আমি উদ্যোগ নিই চট্টগ্রামের বেকারি শিল্পকে শুদ্ধ করার, মালিক-শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার, সমাজে জনসচেতনতা গড়ে তোলার এবং প্রশাসনকে যুক্ত করে একটি যুগান্তকারী রূপান্তরের সূচনা করার। পচা ডিম আর বিষাক্ত কেমিক্যালে ছেঁকে যাওয়া ইতিহাসে ইতি! আমার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে নগরীর বিভিন্ন বেকারিতে অভিযান চালানো হয়। নিজে উপস্থিত থেকে চিহ্নিত করি অস্বাস্থ্যকর উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে। পচা ডিম, অস্বচ্ছ উপাদান, অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহারের প্রমাণ সামনে আনতে আমি ব্যবস্থা নিই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়। কিন্তু আমি শুধু দমন নীতি নয়, পরিবর্তনের নীতিতেই বিশ্বাসী ছিলাম। তাই অনিয়মে জড়িত মালিকদের সঙ্গে সভা করি, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার বিষয়ে আলোচনা করি। সর্বজনস্বার্থে এক নির্দেশিকা প্রণয়ন করি, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি: এক যুগান্তকারী সংযোজন- আমার উদ্যোগেই চট্টগ্রামে প্রথম চালু হয় ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে বেকারির পণ্য সরাসরি পরীক্ষা করে মান নির্ধারণ করা হয়। এটি ছিল এক অভূতপূর্ব উদ্যোগ, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য শহরও অনুসরণ করতে শুরু করে। ফলে খাদ্যের মান নিয়ে আর কোনো গোপনীয়তা রইল না—বিশ্বাস স্থাপন হলো জনগণের মনে। মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক: আন্দোলনের চেয়ে আলোচনার জয়-আমার লক্ষ্য ছিল না শুধু বেকারি বন্ধ করা। আমি চেয়েছি এই শিল্প বাঁচুক, তবে নিয়ম-নীতির ভিতর থেকে। মালিকদের বলেছি—“আপনি ব্যবসা করুন, তবে বিষ নয়, খাবার দিন।” শ্রমিকদের বলেছি—“উৎপাদনে থাকুন, তবে অপরিচ্ছন্নতা নয়, পরিচ্ছন্নতা দিন।” এই সুসম্পর্ক গড়তে আমি আয়োজন করি বৈঠক, কর্মশালা ও আলোচনার। বুঝিয়ে দিই—নিয়ম মানা মানেই ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।চট্টগ্রাম আজ এক দৃষ্টান্ত-
আজ আমি গর্ব করে বলতে পারি—চট্টগ্রামে বেকারি শিল্পে এক ঐতিহাসিক রূপান্তর এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন BSTI-এর অনুমোদন নিয়ে উৎপাদন করছে। হাইজিন, হেলথ কার্ড, ফুড সেফটি প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে। জনগণ এখন সচেতন, গণমাধ্যম গুরুত্বসহকারে এই বিষয়ে প্রতিবেদন করছে।
এই পুরো আন্দোলনের পেছনে যেমন ছিল আমার কলম, তেমনি ছিল আমার পদক্ষেপ, নেতৃত্বের সাহস, এবং জনগণের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি। আমি বলব না আমি একাই সব করেছি—কিন্তু আমি নেতৃত্ব দিয়েছি, আমি প্রথম প্রতিবাদ করেছি, ঝুঁকি নিয়েছি। এবং সেই নিষ্ঠা ও সাহসের ফলেই সম্ভব হয়েছে এই পরিবর্তন।লালদীঘির সেই জনসমাবেশ—শিল্পের মর্যাদার ডাক-২০০৫ সাল। লালদীঘি মাঠে মালিক, শ্রমিক, শুভানুধ্যায়ী সহ হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। আমি মাইকে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম—
“বেকারি শুধু ব্যবসা নয়, এটি একটি শিল্প—একে শিল্পের মর্যাদা দাও।”
আমি তখন চট্টগ্রাম বেকারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মালিকরাই—ভালোবাসা, আস্থা ও সম্মানে। কারণ আমি এর আগেই জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি। রাজপথে আমার পদচিহ্ন ছিল, কলমে ছিল প্রতিবাদ।
আমার প্রতিষ্ঠান ‘ডিপ্লোমা ফুডস প্রোডাক্টস’ তখনই একটি মানসম্পন্ন বেকারি হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। আমি দেখেছি—বেকারি মালিকরা প্রশাসনের হয়রানি, বিএসটিআই’র জটিলতা, নিয়মের ফাঁদে পড়ে কীভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন। তখনই সিদ্ধান্ত নিই—এই অন্যায় আর চলবে না।
আমরা গঠন করি চট্টগ্রাম বেকারি মালিক সমিতি। বনফুল, ফুলকলি, মধুবন, ওয়েল ফুডসসহ নামী প্রতিষ্ঠানগুলো আমার পাশে দাঁড়ায়। তারা জানত—আমি শুধু বলি না, কাজও করি।
আমার নেতৃত্বে রাজপথে মিছিল, সমাবেশ, ডিসি অফিস ঘেরাও, বিএসটিআই কার্যালয় ঘেরাও—সবই হয়েছে।
আমাদের সেই ঐতিহাসিক জনসভায় উপস্থিত ছিলেন সিটি মেয়র মরহুম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমান, যাঁর অবদান আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তাঁর সহযোগিতায় আমাদের দাবি রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব পেতে শুরু করে।আজ বেকারি শিল্প একটি স্বীকৃত শিল্প-আজ বেকারি শিল্প সরকারিভাবে ‘শিল্প’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মালিকরা গর্ব নিয়ে ব্যবসা করছেন, শ্রমিকদের মর্যাদা বেড়েছে। এই অর্জনের পেছনে ছিল আমার নেতৃত্ব, সংগঠন, এবং সহযোদ্ধাদের ঐক্য।
কিছু সাংবাদিক আছেন, যাঁরা ইতিহাস না জেনে আমাকে ব্যঙ্গ করে বলেন—‘বেকারি কামাল’। আমি গর্ব নিয়ে বলি—
এই নামটাই আমার অহংকার।
এই বেকারিই ছিল আমার যুদ্ধক্ষেত্র, আমি ছিলাম সেই যুদ্ধের সম্মুখসারির সৈনিক।
আমি প্রথম ব্যক্তি, যিনি বেকারি শিল্পকে সরকারপ্রধানের দৃষ্টিসীমায় এনেছেন। রাজপথে আমার নামা শুরু ১৯৮৭-৮৮ সাল থেকেই। চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি, সভাপতি,ছাত্র সংগ্রাম কমিটি,সভাপতি,  বাংলাদেশ বেকার পুনর্বাসন কমিটি—সব জায়গায় আমি নেতৃত্ব দিয়েছি। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ (কে এম ওবায়দুর রহমানের গ্রুপ) ছাত্রদলের চট্টগ্রাম মহানগরের
সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শিক্ষা আন্দোলন, আসন সংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠাসহ বহু কাজে নেতৃত্ব দিয়েছি।
উপসংহার: আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকব-এই আন্দোলন শুধু প্রশাসনিক ছিল না—এটি ছিল সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক জাগরণের অংশ।
নিরাপদ খাদ্য আমাদের অধিকার—এই সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমি নেতৃত্ব দিয়েছি।
আমি বলছি না—এই ইতিহাস সবাই জানবে বা মানবে।
কিন্তু ইতিহাস তো এমনই—সে বিস্মৃত হতে পারে, বিকৃত হতে পারে, তবু মুছে ফেলা যায় না। আমি শুধু আন্দোলনের নেতৃত্বেই নয়, দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছি সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সঙ্গে। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে লিখে যাচ্ছি সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের পক্ষে। এ পর্যন্ত তিরিশটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছি, ভ্রমণ করেছি ২৮টি দেশ, আর দেশে-বিদেশে অর্ধশতাধিক সামাজিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছি সক্রিয়ভাবে। কলম, ক্যামেরা ও কণ্ঠ—এই তিন শক্তিকে হাতিয়ার করে আমি সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার পক্ষে পথ চলেছি। এটাই আমার পরিচয়, এটাই আমার অঙ্গীকার। পরিশেষে বলবো-
আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকব—আন্দোলনের নেতৃত্বে, সত্যের পক্ষে, জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে।
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম এবং সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রাম বেকারি মালিক সমিতি।
সদস্য- পেন ইন্টারন্যাশনাল।

Share This Article
Leave a Comment