“কুকুরের মব জাস্টিস ও মানুষের বিবেকহীনতা : এক ভোরবেলার অদ্ভুত আয়না”

4 Min Read

মো.কামাল উদ্দিনঃ
আজকের ভোর যেন আমার হৃদয়ের গভীরে একটা দাগ কেটে গেল।
সকালে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেল। ভাবলাম, শরীরটাকে একটু সচল করা যাক। সকাল ৬টা ১২ মিনিটে হাঁটতে বের হলাম। প্রথমে জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের মাঠ, পরে বাটালি হিল। শ্বাসভরে সকালটাকে উপভোগ করছিলাম—মৃদু বাতাস, ফজরের পরের প্রশান্তি, একান্ত সময়। কিন্তু এক মুহূর্তেই সবকিছু বদলে গেল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অমানবিক এক রূপ আমার সামনে খুলে ধরল নিজেকে।
জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের পশ্চিম গেটের দিকে হাঁটছিলাম। হঠাৎই দেখি একঝাঁক বেওয়ারিশ কুকুর চিৎকার করে তেড়ে আসছে। আমি ঘাবড়ে গেলাম—মনে হল হয়তো আমাকে আক্রমণ করতে আসছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুঝলাম, তারা আমাকে নয়, বরং এক নিরীহ, কালো, ক্লান্ত কুকুরটিকে আক্রমণ করতে এসেছে।
এমন তাণ্ডব আমি আগে কখনো দেখিনি। প্রায় ১৫ থেকে ২০টি কুকুর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই একমাত্র দুর্বল প্রাণিটির ওপর। কেউ কামড়াচ্ছে, কেউ থাবা মারছে, কেউ লেজ উঁচিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে আমি আর আরেক পথচারী শুধু দেখছিলাম। আমাদের সামনে যে ‘মব জাস্টিস’ চলছে, সেটি যেন কেবল কুকুরদের ব্যাপার নয়—এটা আসলে আমাদের সমাজেরই এক প্রতিবিম্ব।
এই দৃশ্যটা ছিল যেন এক জীবন্ত রূপক।
যেভাবে কুকুরের দল নির্দ্বিধায় এক নিরীহ প্রাণিকে ঘিরে ধরে আক্রমণ করল, কোনো কারণ ছাড়াই, কোনো প্রশ্ন ছাড়াই—ঠিক সেভাবেই আজ আমাদের দেশে মানুষ মানুষকে ঘিরে ধরে। পিঠে রাজনৈতিক পতাকা, মুখে ধর্মীয় স্লোগান, হাতে লাঠি আর চোখে ঘৃণা—এই দলীয় হিংস্রতা এখন আর আলাদা চেনা যায় না।
আজ আমাদের সমাজে “মব জাস্টিস” এক ভয়াবহ নিয়মে পরিণত হয়েছে। কেউ যদি অন্য মত পোষণ করে, কেউ যদি ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সত্য বলে, কেউ যদি চুপচাপ নিরীহ হয়ে পড়ে থাকে—তাকেই চিহ্নিত করে হামলা করা হয়।
ঠিক যেমন আজ সেই কালো কুকুরটি জানত না—তার দোষ কী? কেন তাকে ঘিরে সবাই এমন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল? আমরাও জানি না, বুঝি না, সেই নিরীহ লেখক, ছাত্র, কর্মজীবী মানুষটা কেন মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে পড়ে? কুকুরের মতোই আমরা চুপ করে থাকি, শুধু ‘ঘেউ ঘেউ’ করে ব্যথা জানাই, কেউ শুনে না।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটা হলো—এই আক্রমণগুলো হয় জনসমক্ষে।
সবার চোখের সামনে, শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে দেখে, মোবাইলে ভিডিও করে, হাসাহাসি করে, মজা নেয়। কেউ বাধা দেয় না। কেউ প্রশ্ন তোলে না। যেমন আজ কেউ থামায়নি কুকুরদের, তেমনি আমরা কেউ থামাই না আমাদের আশপাশে ঘটে চলা অন্যায়ের ঝড়কে। বরং আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি—নির্বাক, নীরব দর্শক হয়ে উঠতে।
আক্রমণের শিকার মানুষটির পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস নেই কারো। পুলিশ আসে, কিন্তু উদ্ধার করতে নয়—তাকে থানায় নিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেয়। তারপর হয় জামিনের লড়াই, নয়তো বছরের পর বছর কারাগারে জীবন কাটানো।
আজকের এই কুকুরের মব জাস্টিস দেখে মনে হলো—এই কুকুরগুলো অন্তত মিথ্যা কাগজ বানায় না, ষড়যন্ত্র করে না, কারো জীবন তছনছ করে দেয় না। তারা হিংস্র ঠিকই, কিন্তু আমাদের মতো ‘সভ্যতা’র মুখোশ পরা হিংস্রতা নয়।
শেখ হাসিনার শাসনামলে আমরা শুধু ভোটাধিকার হারাইনি, আমরা হারিয়েছি বাঁচার অধিকারও।
এখন শুধু নির্বাচন নয়, প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি মত প্রকাশ—সবই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। কে কী বললো, কী লিখলো, কার সঙ্গে কথা বলল—এসব নিয়েই বিচার হয়ে যায়। বিচার হয় না ধর্ষকের, দুর্নীতিবাজের, খুনির। বিচার হয় সেই নিরীহ মানুষের, যে শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে।
তাহলে কুকুরেরা কি মানুষ হয়ে উঠছে, আর মানুষ পশুতে রূপান্তরিত হচ্ছে?
আজকের এই ভোর আমাকে একটা আয়না ধরিয়ে দিলো—আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমরা কি কেবল নিশ্বাস নেওয়ার নামেই বেঁচে আছি, নাকি এই সমাজে নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকারও আজ বিলাসিতা হয়ে উঠেছে?
শেষ কথাঃ
প্রতিটি জীব বাঁচার অধিকার নিয়ে জন্মায়—মানুষ হোক বা কুকুর। কিন্তু এই সভ্য সমাজ, যেটি কাগজে-কলমে গণতান্ত্রিক, বাস্তবে যেন কুকুরের মব জাস্টিসকেও হার মানিয়ে দিয়েছে।
আমরা যদি এখনই না জাগি, তাহলে একদিন আমরা নিজেরাই হব সেই কালো কুকুর—আক্রমণের শিকার, কারণহীন ঘৃণার বলি।

Share This Article
Leave a Comment