মো.কামাল উদ্দিনঃ
আমি একজন সচেতন নাগরিক এবং নাগরিক ফোরামের মহাসচিব হিসেবে মনে করি, এই মুহূর্তে দেশের জনগণের পক্ষ থেকে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করা সময়ের অনিবার্য দাবি। বিশেষ করে যখন জনগণের করের টাকায় চলা সরকারি চাকরিজীবীরা আজ নিজেদের স্বার্থরক্ষায় আন্দোলনে নেমেছেন, তখন আমাদের নিরুত্তর থাকা মানেই অন্যায়ের পক্ষে নীরব সম্মতি দেওয়া। এই আন্দোলন শুরু হয়েছে বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে, আর দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। এই আন্দোলনের মোড়লরা এখন নিজেদের দাবি মানাতে গিয়ে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকেই অচল করার হুমকি দিচ্ছে।
আমাদের প্রশ্ন একটাই—এই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি কোথায়? বিগত এক যুগের বেশি সময় ধরে যারা রাষ্ট্রীয় সুবিধার শীর্ষ ভোগী ছিলেন, যারা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দুর্নীতিবান্ধব একটি প্রশাসনিক কাঠামোর রক্ষক ছিলেন, আজ তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিতের অভিনয় করছেন। অথচ বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনার শাসনামলে এই সরকারি চাকরিজীবীরা নানা কৌশলে অগণিত বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন। বেতন স্কেলে একাধিকবার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, পেনশন সুবিধা, টাইম স্কেল, গৃহঋণ সুবিধা, এবং নানা ভাতা—সবকিছুই এক অনাকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো হয়েছিল, যাতে করে জনগণের ওপর ট্যাক্সের বোঝা আরও বাড়ে।
কিন্তু এই বর্ধিত সুবিধাগুলোর বিনিময়ে কী পেল সাধারণ মানুষ? আমরা দেখেছি, সরকারি অফিসে ফাইল আটকে রাখা, ঘুষ ছাড়া ন্যূনতম সেবা না দেওয়া, দালালদের দৌরাত্ম্য, প্রকল্পে অকারণে বিলম্ব, দুর্নীতির পাহাড় এবং কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে জনসেবার প্রতি তীব্র উদাসীনতা। আর এই অবস্থার পেছনে একটি বড় কারণ ছিল—সরকারি চাকরিজীবীদের দায়িত্বহীন ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া। তারা নিজেকে “সরকার” মনে করতে শুরু করেছিল, ভুলে গিয়েছিল যে তারা জনগণের সেবক, মালিক নয়।
শেখ হাসিনার সরকার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় এই কর্মকর্তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ফলে প্রশাসন রূপ নেয় এক ‘প্রশাসনিক গোষ্ঠী’তে—যারা জনগণের ওপর এক ধরনের আধিপত্য কায়েম করে। সাধারণ মানুষ, যাদের ভোটে এবং করের টাকায় এই রাষ্ট্র চলে, তারা হয়ে পড়ে এই শ্রেণির কাছে জিম্মি। হাসপাতাল থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ভূমি অফিস থেকে পুলিশ স্টেশন—সব জায়গায় একটিই বাস্তবতা: ঘুষ, দালালি, হয়রানি ও লাঞ্ছনা।
আজ যখন শেখ হাসিনার শাসনের অবসান ঘটেছে, জনগণ জেগে উঠেছে, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কথা উঠছে—তখনই এই গোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে নিজেদের ‘অধিকার’ রক্ষার নামে মাঠে নেমেছে। আসলে, তারা তাদের অযৌক্তিক সুবিধা, অবাধ দুর্নীতি, এবং প্রশ্নবিদ্ধ চরিত্রকে রক্ষা করতেই এখন আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।
আমরা ভুলে যেতে পারি না—সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই চাকরি পাওয়ার পর অল্প সময়েই গাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, ব্যবসা ইত্যাদির মালিক হয়ে উঠেছেন। এই অবস্থা একে একে তরুণ প্রজন্মকে সরকারি চাকরির প্রতি এমন এক মোহে ফেলেছে যেন এটি ‘সোনার হরিণ’। বাস্তবতা হলো, এই মোহের পেছনে দায়ী ছিল সেই দুর্নীতিগ্রস্ত চাকরিজীবীদের তৈরি করা এক মিথ্যা স্বপ্ন—”চাকরি মানেই নিশ্চিত বিলাসিতা, নিশ্চিত নিরাপত্তা, নিশ্চিত অর্থবিত্ত”। এই অবস্থার বিরুদ্ধে দেশের মানুষ এখন সোচ্চার হচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে, যে গোষ্ঠীটি এত বছর জনগণের অধিকার দমন করে, প্রশাসনকে দুর্নীতির আস্তানায় পরিণত করেছে, তাদের আর ছাড় দেওয়া যাবে না। দেশের মালিক জনগণ—এই কথাটির বাস্তব চর্চা শুরু হওয়া দরকার এখনই।
আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে দলমত নির্বিশেষে সকল নাগরিককে বলতে হবে:
না, এই আন্দোলন জনগণের পক্ষে নয়।
না, এই দাবি যৌক্তিক নয়। না, আমরা আর জিম্মি হয়ে থাকব না। সরকারি চাকরিজীবীদের প্রতি আমাদের কোনো বিদ্বেষ নেই। আমরা চাই, তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করুক, দেশের ও জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকুক। কিন্তু নিজেরাই যখন নিজেদের স্বার্থরক্ষায় জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে আমাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে—এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
একটি সমাজে অস্ত্র ঠেকিয়ে চাঁদাবাজি যেমন অপরাধ, তেমনি ফাইল আটকে রেখে ঘুষ আদায় করাও অপরাধ। যেমন কারও সন্তানকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা অপরাধ, তেমনি সেবা আটকে রেখে, হয়রানি করে জনগণকে জিম্মি করাও রাষ্ট্রীয় অপরাধ। আমরা চাই না এই রাষ্ট্র চলে দুর্নীতির নামে, সুবিধাভোগী শ্রেণির নামে, বা প্রশাসনিক চাতুরীর নামে। আমরা চাই গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, এবং জনগণের অধিকার। এই মুহূর্তে সময় এসেছে—রাষ্ট্রের সব সৎ নাগরিক, তরুণ সমাজ, সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক—সবার ঐক্যবদ্ধভাবে প্রশ্ন তোলা:
“কেন সরকারি চাকরিজীবীরা বারবার আমাদের অধিকার হরণ করবে, আর আমরা চুপ থাকব?” নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে আমি বলতে চাই—এটি আর শুধুই চাকরিজীবীদের আন্দোলনের সময় নয়, এটি জনগণের পক্ষ থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সময়।
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের একটি অংশ বর্তমানে সরকার নির্ধারিত বেতন কাঠামো ও পদোন্নতির নীতিমালার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। দাবি-দাওয়া যেমনই হোক না কেন, প্রশ্ন উঠেছে—এ আন্দোলন কি আইনসঙ্গত? সরকারি সেবাদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এই শ্রেণির কর্মচারীদের এমন ধর্মঘট ও আন্দোলন কি দেশের জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী নয়? চলমান এই পরিস্থিতি কেবল প্রশাসনিক কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করছে না, বরং রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও নাগরিকদের সেবা পাওয়ার অধিকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সম্প্রতি ‘গ্রেড’ ও ‘টাইম স্কেল’ পুনর্বিন্যাসের দাবিতে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ অফিসে না গিয়ে মানববন্ধন, কর্মবিরতি ও ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশাসনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ সেবাক্ষেত্রের কর্মকর্তারা এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন।
তাদের দাবি: ১. জাতীয় বেতন স্কেলে প্রথম শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য পৃথক গ্রেড নির্ধারণ ২. টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড ফিরিয়ে আনা ৩. পদোন্নতির জন্য বিদ্যমান নীতিমালা সংশোধন
এ দাবিগুলোকে অনেকেই ‘ন্যায্য’ বলে সমর্থন করলেও পদ্ধতি ও সময়চয়নে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের আন্দোলন বা ধর্মঘট করার অধিকার আইন দ্বারা কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ। প্রযোজ্য আইন: ১. বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (BSR)
২. বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯ ৩. শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, ২০১৮ ৪. Essential Services Act, 1958 (প্রয়োগযোগ্য ক্ষেত্র: হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি সেবা)
উল্লেখযোগ্য ধারা: আচরণ বিধিমালা ৩(১): সরকারি কর্মচারীকে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে নিজ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। আচরণ বিধিমালা ২২: ধর্মঘট, কর্মবিরতি, অসহযোগ আন্দোলন ইত্যাদি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। Essential Services Act অনুসারে, এসব ক্ষেত্রে ধর্মঘট ডেকে আনা রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল হতে পারে। এই আন্দোলনের ফলে বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। জনস্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এমনকি আদালত পর্যন্ত বলেছেন, “সরকারি সেবা জনগণের অধিকার, কেউ ব্যক্তিগত দাবিতে সে সেবা বন্ধ করতে পারে না।” আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট যুক্তরাজ্য: সরকারি চাকরিজীবীরা ইউনিয়ন করতে পারলেও NHS (স্বাস্থ্য), পুলিশ, সেনা বিভাগে ধর্মঘট নিষিদ্ধ। আইন ভঙ্গ করলে চাকরিচ্যুতি হয়।
ভারত: Central Civil Services Conduct Rules, 1964 অনুসারে সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘট নিষিদ্ধ। বেতন কাটা, সাসপেনশন এবং চাকরিচ্যুতি হয়। জাপান ও চীন: সরকারি চাকরিজীবীদের ধর্মঘট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চলমান আন্দোলনের মূল্যায়ন: ন্যায়সঙ্গত না বেআইনি?
ন্যায়সঙ্গত কি না তা নির্ভর করে দাবির বাস্তবতায়: সরকার নির্ধারিত বেতন কাঠামোর মধ্যেই পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া VIII পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র কিছু বছর আগে। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও কর্মচারীদের বেতন অনেকাংশে বেসরকারি খাতের তুলনায় বেশি।
চিকিৎসক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যারা জনগণের জরুরি সেবাদানে নিয়োজিত, তাদের পেশাগত শপথও বিবেচনায় আসা উচিত। বেআইনি ও অশৃঙ্খল দিক:
জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে তাদেরই সেবা বন্ধ করে দেওয়া অসাংবিধানিক আচরণ। সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারি চাকরি “একটি জনসেবা”, যার অবহেলা রাষ্ট্রদ্রোহীতার সমতুল্য হতে পারে। সরকারের করণীয় ও সম্ভাব্য ব্যবস্থা- . প্রশাসনিক ব্যবস্থা:Warning, Show-cause notice, Suspension, Termination গত ১০ বছরে প্রায় ৭০০০ সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন (জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী)। আইনি ব্যবস্থা:
Essential Services Act প্রয়োগ করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা
দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারা (রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ) আর্থিক ব্যবস্থা: কর্মবিরতির দিনগুলোর বেতন কাটা প্রাপ্য সুবিধা স্থগিত
নৈতিক ও সামাজিক প্রচার: গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি সরকারি দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব তুলে ধর, সরকারি চাকরিজীবীরা যদি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেন, তবে তা শুধু অমানবিক নয়, আইনবিরুদ্ধও। কোনো দাবি বাস্তবায়নের পথ আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ভাঙন নয়, বরং যৌক্তিক ও নীতিগত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত। দেশে এখন দরকার দায়িত্বশীল কর্মচারী, যারা শুধু দাবি নয়—দায়িত্বও বুঝবেন।
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।