ইতিহাসের এক নিবেদিত সাধক: আহমদ মমতাজ স্মরণে””

3 Min Read

মো.,কামাল উদ্দিনঃ
আজ আহমদ মমতাজের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালে মরণব্যাধি করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। এক নিঃশব্দ বিদায়, যা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে—একজন ইতিহাসপ্রেমী হিসেবে আজ গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনাভরে তাঁকে স্মরণ করছি।
আহমদ মমতাজ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬০ সালের ২০ জুন চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার পশ্চিম অলিনগর গ্রামে, এক প্রখ্যাত পীর পরিবারে। তাঁর পিতা আবদুল বারী ছিলেন সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ও ব্যবসায়ী; মা আমেনা খাতুন ছিলেন এক প্রজ্ঞাময় নারী। পূর্বপুরুষদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন দাদা, বাঘ শিকারি হাজী শমসের আলী পাহলোয়ান এবং নানা ইউসুফ আলী ভূঞা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি শিক্ষকতা, ব্যাংকিং ও সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন। তবে ১৯৯২ সালের পর থেকে তিনি মনোনিবেশ করেন মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্প এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ক গবেষণায়।
তাঁর লেখালেখির সূচনা কৈশোরেই—প্রথমে ছোটগল্প, পরে রম্যগল্প ও প্রবন্ধে। আশির দশকে তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্য সংগ্রহে আত্মনিয়োগ করেন এবং পরে স্বাধীনতা যুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাস ও লোকজ সংস্কৃতি নিয়ে ৬০০-র অধিক প্রবন্ধ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নাল ও পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: “চট্টল মনীষা”, যেখানে তিনি চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি ধরে রেখেছেন এবং সুফি-সাধকদের নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেছেন। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বলি খেলা ও জব্বর আলীর জীবন নিয়ে তাঁর লেখা ছোট বইটিও সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ইতিহাস একাডেমি, আন্তর্জাতিক লেখক সংস্থা PEN-এর নির্বাহী সদস্যসহ বহু জ্ঞানচর্চার সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম সমিতি-ঢাকাকে একটি সাহিত্য ও গবেষণা নির্ভর সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আজীবন নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন এক নিবেদিত প্রাণ গবেষক, লেখক ও সংগঠক। তাঁর সহধর্মিণী রাইহান নাসরিন একজন লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক ও লেখিকা। তাঁদের যুগল সংগ্রহ থেকে “চট্টগ্রামের প্রবাদ প্রবচন” অধ্যায়টি এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষা প্রকল্পে (২০০৯) প্রকাশিত হয়।
আমি নিজে একজন ইতিহাস অনুরাগী হিসেবে তাঁর অনেক বই পড়েছি, আর তাই আজ তাঁর মৃত্যুদিনে হৃদয়ভরা শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। তিনি আমার লেখালেখির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাঁর কর্ম ও আদর্শ আজও অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছে।
আহমদ মমতাজ ছিলেন চট্টগ্রামের এক আলোকবর্তিকা—যাঁর জ্ঞান, শ্রম ও সাধনায় ইতিহাস পেয়েছে তার নান্দনিক রূপ। এই শূন্যতা পূরণ হবার নয়। তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও চিরকালীন কৃতজ্ঞতা।

Share This Article
Leave a Comment