“পথের মানুষ, মাইজভান্ডারের প্রেমিক: এমদাদুল রহমান ভান্ডারির জীবনগাথা কথা-

By admin
8 Min Read

 মো. কামাল উদ্দিনঃ  মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পেশা নয়, তার সম্পদ নয়, এমনকি তার সামাজিক অবস্থানও নয়। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার হৃদয়, তার বিশ্বাস, তার মানবিকতা। পৃথিবীর পথে-ঘাটে চলতে গিয়ে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মুখোমুখি হই। তাদের অধিকাংশকেই আমরা ভুলে যাই। কিন্তু কিছু মানুষ এমনভাবে মনের মধ্যে জায়গা করে নেয়, যাদের কথা দীর্ঘদিন মনে থাকে। কারণ তাদের মধ্যে থাকে এক ধরনের সরলতা, এক ধরনের সত্য, যা আজকের কৃত্রিম পৃথিবীতে খুবই বিরল। আজ এমনই একজন মানুষের কথা লিখতে বসেছি। তিনি কোনো বড় ব্যবসায়ী নন, কোনো রাজনীতিবিদ নন, কোনো আলোচিত ব্যক্তি নন। তিনি একজন সাধারণ রিকশাচালক। কিন্তু তার জীবনের গল্প, তার বিশ্বাসের শক্তি, তার আধ্যাত্মিক যাত্রা এবং মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তার নাম এমদাদুল রহমান। তবে অনেকেই তাকে “ভান্ডারি” বলেই চেনেন। আজ বিকেলে কাজীর দেউড়ি থেকে চেরাগী পাহাড় মোড়ে আমার অফিসে আসার জন্য একটি রিকশা খুঁজছিলাম। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি রিকশা চোখে পড়তেই হাত তুলে ইশারা করলাম। রিকশাটি ধীরে ধীরে আমার সামনে এসে থামল।
রিকশার চালকের দিকে প্রথমবার তাকিয়েই আমার মনে হলো, এই মানুষটির মধ্যে অন্যরকম কিছু আছে। মলিন পোশাক, রোদে পোড়া মুখ, দীর্ঘ সাদা-কালো দাড়ি, অগোছালো চুল, কিন্তু চোখে এক ধরনের প্রশান্তি। সেই চোখে কোনো অভিযোগ নেই, নেই কোনো লোভ, নেই কোনো অস্থিরতা। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন সংসারের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া কোনো দরবেশ। রিকশায় ওঠার আগেই মনে মনে ভাবলাম—এই মানুষটি হয়তো মাইজভান্ডারি তরিকার অনুসারী। রিকশায় উঠে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, — “মামা, আপনি কি ভান্ডারি?” তিনি মৃদু হেসে বললেন, “হ, আমি মাইজভান্ডারি ভক্ত।” আমার মনের ধারণা যে সঠিক ছিল, তা বুঝতে পেরে আমি অবাক হলাম না। বরং আগ্রহ বেড়ে গেল। তারপর শুরু হলো কথোপকথন। জানলাম, তার আসল নাম আব্দুর রহমান। জন্মের সময় তার মা-বাবা কোনো পীর সাহেবের পরামর্শে এই নাম রেখেছিলেন। পরে নানা কারণে তিনি এমদাদুল রহমান নামে পরিচিত হন। বয়স ষাটের বেশি। জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন শ্রমিক হিসেবে। কখনো নির্মাণকাজে, কখনো দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন।  বর্তমানে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কাজ বন্ধ। কয়েকদিন ধরে কোনো কাজ নেই। তাই বসে না থেকে রিকশা চালাচ্ছেন।  তার কথায়, “খালি বসে থাকলে তো পেট চলবে না। কাজ ছোট বড় কিছু নাই। হালাল রুজি থাকলেই হইলো।” এই একটি বাক্য যেন তার পুরো জীবনের দর্শন। কথা বলতে বলতে জানতে পারলাম তার বাড়ি বরিশালের পটুয়াখালীতে। স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা বড় হয়েছে। একজন মাইজভান্ডারে লেখাপড়া করছে। তার স্ত্রী তার আপন খালাতো বোন। কিন্তু তার জীবনের আসল গল্প শুরু হয় ১৯৯০ সালের দিকে। সেই সময় তিনি ছিলেন তরুণ। হঠাৎ একদিন তার মনে হতে লাগল, কেউ যেন তাকে ডাকছে। কোনো মানুষের ডাক নয়। কোনো আত্মীয়ের ডাক নয়। একটি অদৃশ্য শক্তি যেন তাকে টানছিল। তিনি বললেন, “আমি বুঝতাম না কি হইতাছে। কিন্তু মনে হইত, মাইজভান্ডারে যাইতে হইবো।” সেই সময় তিনি কখনো মাইজভান্ডার যাননি। মাইজভান্ডার কোথায়, কেমন—সেটাও ভালোভাবে জানতেন না। তবুও অদ্ভুত এক আকর্ষণ তাকে গ্রাম ছেড়ে চট্টগ্রামে নিয়ে আসে।
তার কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল যেন কোনো উপন্যাসের চরিত্রের গল্প শুনছি। চট্টগ্রামে এসে তিনি প্রথমে চলে যান পটিয়ার সিকামাই দরবারে। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন।
কিন্তু তার মন যেন অন্য কোথাও। তার হৃদয় যেন অপেক্ষা করছিল এক বিশেষ মুহূর্তের জন্য। অবশেষে একদিন তিনি পৌঁছে যান মাইজভান্ডার দরবারে। সেদিন ছিল শুক্রবার। দরবারে ওরস শরীফ চলছিল। হাজার হাজার মানুষের সমাগম। জিকির, দরুদ, মিলাদ, আধ্যাত্মিক আবহে মুখরিত পুরো এলাকা। আর সেই পবিত্র পরিবেশের মধ্যেই তিনি প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎ লাভ করেন হযরত সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভান্ডারীর। এই অংশটুকু বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ বদলে গেল। চোখে এক ধরনের আবেগ ফুটে উঠল। তিনি বললেন, “মনে হইছিল আমি আমার হারানো জায়গা পাইয়া গেছি।” একজন মানুষ যখন নিজের আধ্যাত্মিক আশ্রয় খুঁজে পায়, তখন তার অনুভূতি কেমন হয়—হয়তো সেই মুহূর্তে আমি তার চোখে তা দেখছিলাম।  সেই সাক্ষাতের পর তিনি বায়াত গ্রহণ করেন। মাইজভান্ডারি তরিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, হযরত এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী তাকে বলেছিলেন,  “তুমি এখনো ছোট। ঘরে ফিরে যাও। সংসার করো।” কিন্তু তখন তার মন আর সংসারে বসে না। তিনি ভাবতেন, “যে মন মাইজভান্ডারে রেখে আসছি, সেই মন নিয়ে আবার সংসার করুম কেমনে?” এই পরিবর্তন দেখে পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। অনেকেই তাকে পাগল বলতে শুরু করে। মা-বাবা ভেবেছিলেন, ছেলেকে বিয়ে দিলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। অবশেষে তার খালাতো বোনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিয়ের পর সবাই বুঝতে পারে, তিনি বিয়ের জন্য পাগল নন। তিনি মাইজভান্ডারের প্রেমে পাগল।  তবুও সংসার থেকে পালিয়ে যাননি। স্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। সন্তানদের মানুষ করেছেন। সংসারের সব দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তার হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় ছিল মাইজভান্ডার। ধীরে ধীরে তার স্ত্রীও মাইজভান্ডারি তরিকায় বায়াত গ্রহণ করেন। তারপর সন্তানরাও বাবার পথ অনুসরণ করে। আজ পুরো পরিবারই মাইজভান্ডারের অনুসারী। এ যেন একজন মানুষের বিশ্বাসের শক্তির এক অনন্য উদাহরণ। রিকশা তখন চেরাগী পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। আমরা কথা বলছি। তিনি তার জীবনের নানা স্মৃতি বলছেন। কোথাও কোনো আক্ষেপ নেই। কোথাও কোনো অভিযোগ নেই। দারিদ্র্য আছে। অভাব আছে। কষ্ট আছে। কিন্তু হতাশা নেই। এমন মানুষ আজকাল খুব কম দেখা যায়। এক পর্যায়ে তার স্ত্রীর কথা উঠল। হঠাৎ তার মুখের হাসি ম্লান হয়ে গেল। জানালেন, তার স্ত্রী বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ। তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“ভাই, আমার বউয়ের জন্য একটু দোয়া কইরেন।” এই একটি বাক্যের মধ্যে আমি একজন স্বামীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা অনুভব করলাম। দীর্ঘ জীবনের সঙ্গী অসুস্থ। তার নিজের পকেটে হয়তো পর্যাপ্ত টাকা নেই। তবুও তার ভরসা আল্লাহর উপর। রিকশা এসে থামল চেরাগী পাহাড় মোড়ে, দৈনিক আজাদী অফিসের সামনে। ভাড়া হলো ৫০ টাকা। আমি তাকে ১০০ টাকা দিলাম।
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, “এত টাকা ক্যান?” আমি শুধু হেসে বললাম, “রাখেন মামা।” সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে যে হাসি ফুটে উঠল, তা ছিল নির্মল আনন্দের হাসি। সেই হাসির মধ্যে কোনো অভিনয় ছিল না। ছিল না কোনো স্বার্থ। ছিল শুধু কৃতজ্ঞতা। আমি দেখলাম, সামান্য কিছু ভালোবাসা একজন মানুষের মুখে কত বড় আনন্দ এনে দিতে পারে। আজও সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি এই মানুষগুলো। যারা প্রতিদিন সংগ্রাম করে। প্রতিদিন ঘাম ঝরায়। প্রতিদিন কষ্ট সহ্য করে। কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা হারায় না। এমদাদুল রহমান ভান্ডারি আমার কাছে শুধু একজন রিকশাচালক নন। তিনি জীবনের এক চলমান পাঠশালা। তিনি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন—বিশ্বাস মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, ভালোবাসা মানুষকে শক্তি দেয়, আর বিনয় মানুষকে মহৎ করে তোলে।
চেরাগী পাহাড়ের সেই বিকেল হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে সময়ের স্রোতে। কিন্তু এমদাদুল রহমান ভান্ডারির হাসিমাখা মুখ, তার সরল কথাগুলো, তার স্ত্রীর জন্য দোয়া চাওয়ার আকুতি, আর মাইজভান্ডারের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা আমার স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো অনেক সময় রাজপ্রাসাদে নয়, লেখা হয় রিকশার হ্যান্ডেলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এমন সাধারণ মানুষের জীবনেই।

Share This Article
Leave a Comment