
-মো.কামাল উদ্দিনঃ এক সময় ছিল, সরকারি কোনো অনুষ্ঠান মানেই ব্যানারের মাঝখানে বড় করে প্রধানমন্ত্রীর ছবি, পাশে মন্ত্রী-এমপি ও স্থানীয় নেতাদের ছবি। কোথাও যদি সেই ছবি না থাকত, তাহলে শুরু হতো নানা প্রশ্ন, অসন্তোষ, এমনকি সংঘর্ষও। নিজের চোখে এমন ঘটনাও দেখেছি—শুধু প্রধানমন্ত্রীর ছবি নেই বলে অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, হাতাহাতি হয়েছে, আবার কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি ক্ষোভে অনুষ্ঠান বর্জন করে চলে গেছেন। যেন একটি রাষ্ট্রের সাফল্য, একটি উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা একটি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল একটি ছবি। আজ সময় বদলেছে। আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন—সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড কিংবা সরকারি প্রচারণায় তাঁর ছবি ব্যবহার করা হবে না। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি প্রশাসনিক নির্দেশ হলেও এর তাৎপর্য অনেক গভীর। এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা, যেখানে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান, প্রচারের চেয়ে কাজ এবং ব্যক্তিপূজার চেয়ে জনগণের সেবাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা রয়েছে। প্রকৃত নেতৃত্ব কখনো নিজের ছবি দিয়ে বড় হয় না; প্রকৃত নেতৃত্ব বড় হয় মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়ে। একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়ক জানেন, জনগণের ভালোবাসা ব্যানারে ঝুলে থাকে না, মানুষের বিশ্বাসে বেঁচে থাকে। বিলবোর্ডের বিশাল ছবি মানুষকে সাময়িকভাবে আকৃষ্ট করতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনই একজন নেতাকে ইতিহাসে অমর করে রাখে। ক্ষমতার সবচেয়ে সুন্দর রূপ তখনই প্রকাশ পায়, যখন ক্ষমতা নিজেকে প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু না বানিয়ে জনগণকে কেন্দ্র করে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রকল্প জনগণের টাকায় পরিচালিত হয়। তাই সেই প্রকল্পের মূল পরিচয় হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সেবা, কোনো ব্যক্তির প্রতিকৃতি নয়। জনগণ কর দেয় উন্নয়নের জন্য, ছবি টাঙানোর জন্য নয়।
পরিবর্তন সব সময় বিপ্লবের শ্লোগান নিয়ে আসে না। অনেক সময় একটি ছোট সিদ্ধান্তই যুগের পর যুগ চলে আসা একটি সংস্কৃতিকে বদলে দেয়। এই নির্দেশনাও তেমনই একটি পরিবর্তনের বার্তা বহন করে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখাবে—রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি নির্ভর ব্যবস্থা নয়; রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সংবিধান, একটি জনগণের সম্মিলিত অঙ্গীকার। একটি সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজে নেতার পরিচয় তাঁর ছবি নয়, তাঁর কর্ম। একটি সেতু, একটি বিদ্যালয়, একটি হাসপাতাল, একটি নিরাপদ সড়ক, একজন কৃষকের মুখের হাসি, একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ কিংবা একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই একজন নেতার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে। আমরা যদি সত্যিই উন্নত রাষ্ট্র গড়তে চাই, তাহলে আমাদেরও মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। কে কত বড় ছবি লাগালো, কার ছবি কত উঁচুতে টাঙানো হলো—এসব নিয়ে ব্যস্ত না থেকে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, কাজ কতটা হলো, মানুষের জীবন কতটা বদলালো, দুর্নীতি কতটা কমলো, সেবার মান কতটা বাড়লো। ইতিহাস সাক্ষী—বিশ্বের মহান নেতারা তাঁদের প্রতিকৃতির জন্য নয়, তাঁদের কর্মের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার জন্য বিলবোর্ডের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সততা, দূরদর্শিতা, ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণে নিবেদিত নেতৃত্ব। আজকের এই সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবে আন্তরিকভাবে অনুসরণ করা হয়, তবে এটি শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হবে না; এটি হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। যেখানে ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বাড়বে, প্রচারের পরিবর্তে সেবার মূল্যায়ন হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিখবে—একজন নেতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর ছবি নয়, তাঁর কর্ম। কারণ ছবির আয়ু কয়েক বছর হতে পারে, কিন্তু মানুষের কল্যাণে করা কাজ ইতিহাসের পাতায় শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থাকে। আর একজন সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় প্রতিকৃতি কোনো ব্যানারে নয়—তা অঙ্কিত থাকে জনগণের হৃদয়ে।