
-মো.কামাল উদ্দিনঃ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—প্রতিভার অভাব নয়, বরং প্রতিভাকে চিনতে না পারা। একটি অমূল্য হীরা যদি অজ্ঞ মানুষের হাতে পড়ে, তবে সেটিও কাচের টুকরো হয়ে যায়। অথচ একই হীরা যখন একজন জহুরির হাতে পৌঁছায়, তখন তার প্রকৃত পরিচয়, সৌন্দর্য ও মূল্য এক মুহূর্তেই প্রকাশ পায়। একজন প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ বাবা তাঁর ছেলেকে একদিন একটি ছোট্ট হীরার টুকরো হাতে দিয়ে বললেন, “বাবা, আজ তোমাকে একটি শিক্ষা দেব। তবে সেই শিক্ষা বইয়ের পাতায় লেখা নেই, জীবনের পথে লুকিয়ে আছে। এই হীরাটি নিয়ে বাজারে যাও। কাউকে বিক্রি করবে না। শুধু জিজ্ঞেস করবে, এর বিনিময়ে তারা কী দিতে রাজি।” ছেলেটি কৌতূহলী মনে রওনা হলো। প্রথমেই সে গেল এক সবজি বিক্রেতার কাছে। হীরাটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “চাচা, এই জিনিসটির বিনিময়ে আপনি আমাকে কী দিতে পারবেন?” সবজি বিক্রেতা হীরাটি হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন। তারপর হেসে বললেন, “এটা তো কাচের মতোই লাগছে। চাইলে এক কেজি আলু দিতে পারি। এর বেশি দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” ছেলেটি কিছু না বলে চলে গেল। এরপর সে পৌঁছাল এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর দোকানে। স্বর্ণ ব্যবসায়ী অভিজ্ঞ চোখে হীরাটি দেখলেন। কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে বললেন, “এটি সাধারণ পাথর নয়। এর কিছু মূল্য আছে। আমি নগদ এক লাখ টাকা দিতে পারি।” ছেলেটি এবারও হীরাটি বিক্রি করল না। শেষে সে গেল শহরের সবচেয়ে অভিজ্ঞ জহুরির কাছে। জহুরি হীরাটি হাতে নিয়ে বিশেষ কাচে পরীক্ষা করলেন। তাঁর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। মুখে ফুটে উঠল প্রশংসার হাসি। তিনি বললেন, “বাবা, তুমি জানো কি, তোমার হাতে কী আছে? এটি সাধারণ কোনো হীরা নয়। এটি বিরল, দুষ্প্রাপ্য এবং অসাধারণ মানের রত্ন। আমি এর বিনিময়ে এক কোটি টাকা দিতে প্রস্তুত। তবুও মনে হচ্ছে এর প্রকৃত মূল্য হয়তো এরও বেশি।”
ছেলেটি বিস্মিত হয়ে বাড়ি ফিরল। সব ঘটনা শুনে বাবা শান্তভাবে বললেন, “আজ তুমি মানুষের সবচেয়ে বড় একটি স্বভাব দেখেছো। মানুষ কোনো কিছুর মূল্য তার প্রকৃত গুণে নির্ধারণ করে না; বরং নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সীমা অনুযায়ী বিচার করে। সবজি বিক্রেতার কাছে হীরার মূল্য এক কেজি আলু। স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে তার মূল্য এক লাখ টাকা। আর জহুরির কাছে সেটি এক কোটি টাকারও বেশি। হীরা কখনো বদলায়নি—বদলেছে শুধু মূল্যায়নকারীর চোখ।” বাবা আরও বললেন,
“জীবনে কখনো এমন মানুষের কাছে নিজের মূল্য খুঁজতে যেও না, যার চোখে প্রতিভা দেখার ক্ষমতা নেই। কারণ অন্ধের কাছে সূর্যেরও কোনো মূল্য নেই।” এই গল্প শুধু একটি হীরার নয়; এটি প্রতিটি মেধাবী, সৎ, সাহসী ও আদর্শবান মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যজগতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। এখানে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা সত্য প্রকাশের জন্য নিজের নিরাপত্তা, স্বার্থ ও আরাম বিসর্জন দেন। তাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন, ক্ষমতার অপব্যবহারের মুখোশ উন্মোচন করেন এবং সমাজের নীরব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁদের সবাই মূল্যায়ন করতে জানে না। কিছু নামসর্বস্ব সাংবাদিক আছেন, যাঁদের কাছে সাংবাদিকতা একটি পেশা নয়, বরং পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা অর্জনের মাধ্যম। তাঁরা প্রকৃত সাংবাদিকের সাহসকে বেপরোয়া বলে, সততাকে দুর্বলতা বলে, আর অনুসন্ধানী মনকে অহংকার বলে ব্যাখ্যা করেন। কারণ তাঁদের চোখে হীরা ও কাচের পার্থক্য বোঝার মতো জহুরির দৃষ্টি নেই। কিন্তু সত্য কখনো চিরকাল আড়ালে থাকে না। সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিচারক, আর ইতিহাস সবচেয়ে নিরপেক্ষ জহুরি। সময়ই একদিন ঠিক করে দেয় কে ছিল সত্যিকারের হীরা, আর কে ছিল কেবল চকচকে কাচ। তাই যদি কোনোদিন দেখেন, কেউ আপনাকে এক কেজি আলুর দামে মূল্যায়ন করছে, তবে কষ্ট পাবেন না। মনে রাখবেন, সেটি আপনার মূল্য নয়—সেটি তার দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা। আপনি যদি সত্যিই হীরা হন, তবে আপনার দীপ্তি কোনো অজ্ঞ মানুষের কথায় ম্লান হবে না। হয়তো আজ নয়, কাল নয়—কিন্তু একদিন কোনো না কোনো জহুরি আপনাকে চিনবেই। তখন আপনার মূল্য নির্ধারণ করবে আপনার সততা, মেধা, সাহস, কর্ম এবং চরিত্র।
মনে রাখবেন— হীরা কখনো নিজের মূল্য ঘোষণা করে না; তার দীপ্তিই তার পরিচয়। সিংহ কখনো নিজেকে রাজা বলে প্রমাণ করে না; তার উপস্থিতিই তার পরিচয়। আর একজন প্রকৃত সাংবাদিক কিংবা লেখক নিজের শ্রেষ্ঠত্ব মুখে বলেন না; তাঁর কলম, তাঁর বিবেক, তাঁর সাহস এবং তাঁর কর্মই একদিন তাঁকে মানুষের হৃদয়ের সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছে দেয়। তাই কখনো অযোগ্য মানুষের বিচারে নিজের মূল্য নির্ধারণ করবেন না। কারণ কোটি টাকার হীরার প্রকৃত মূল্য কখনো এক কেজি আলু হতে পারে না। প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের অধিকার কেবল জহুরিরই থাকে।