তপ্ত বিকেলে নজরুল বন্দনা: ডিসি হিলে কবিতা, চেতনা ও মানবতার দীপ্ত উচ্চারণ” জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তীতে চট্টগ্রামে ব্যতিক্রমী শ্রদ্ধাঞ্জলি, কবিতায় মুখর ডিসি হিল

By admin
5 Min Read

চট্টগ্রাম ব্যুরোঃ
শ্রদ্ধার্ঘ্য কবিতা
“দ্রোহের আগুন, প্রেমের বাণী, জাগো হে অনন্ত প্রাণ,
অন্যায়ের দেয়াল ভেঙে শোনাও সাম্যের মহাগান।
তপ্ত বিকেল জুড়ে আজ উচ্চারিত তোমার নাম,
নজরুল তুমি জেগে আছো বাংলার প্রতিটি প্রাণে অবিরাম।”
চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ডিসি হিল এদিন যেন রূপ নিয়েছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি, চেতনা ও মানবতার এক উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। আকাশে বৃষ্টির কোনো ছোঁয়া ছিল না, বরং দিনের তীব্র গরম ও ভারী আবহাওয়ার মধ্যেও মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পাহাড়ঘেরা এই সাংস্কৃতিক অঙ্গন যেন নতুন করে ধারণ করেছিল দ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবমুক্তির কবি—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম–এর অগ্নিঝরা চেতনা। জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ডিসি হিলস্থ নজরুল স্কোয়ারে আয়োজন করা হয় এক বর্ণাঢ্য ও আবেগঘন শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান। বিকেল গড়াতেই শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কবিপ্রেমী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থী, তরুণ কবি ও সাধারণ মানুষ একত্র হতে শুরু করেন। প্রচণ্ড গরমে অনেকে ক্লান্ত হলেও তাঁদের চোখেমুখে ছিল এক ধরনের আলাদা উচ্ছ্বাস—একজন বিদ্রোহী কবিকে স্মরণ করার আনন্দ ও দায়বোধ।
কেউ হাতে করে নিয়ে এসেছেন পুষ্পস্তবক, কেউ কবিতার বই, কেউবা মোবাইল ফোনে ধারণ করছিলেন স্মরণীয় মুহূর্তগুলো। অনেকে আবার নীরবে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন কবিতা, আবৃত্তি আর আলোচনার প্রতিটি শব্দ। ডিসি হিলের পুরোনো বৃক্ষরাজির নিচে, গরম বাতাসের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে এক মননশীল ও শিল্পসুষমায় ভরা পরিবেশ। মনে হচ্ছিল, কবিতার শব্দগুলো যেন মানুষের হৃদয়ে গিয়ে এক নতুন আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে জাতীয় কবি নজরুল মঞ্চ, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। আয়োজনের প্রতিটি স্তরে ছিল নজরুলচর্চাকে আরও বিস্তৃত করার প্রত্যয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছে কবির অসাম্প্রদায়িকতা, বিদ্রোহী চেতনা ও মানবিক দর্শন পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিক প্রয়াস।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, সাংবাদিক ও লেখক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন— “নজরুল কেবল জাতীয় কবি নন; তিনি এক চেতনার নাম, এক বিপ্লবের নাম। তিনি মানুষের ভেতরের ভয় ভাঙতে শিখিয়েছেন, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করতে শিখিয়েছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায় মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে ভালোবাসা, সাম্য ও মানবতার পথে চলতে।” তিনি আরও বলেন— “আজকের সময়ে যখন সমাজ নানা সংকট, বিভাজন, বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি, তখন নজরুলের সাহিত্য ও দর্শন নতুন করে পাঠ করা জরুরি। নতুন প্রজন্ম যদি নজরুলকে হৃদয়ে ধারণ করে, তাহলে সমাজে মানবিকতা ও ন্যায়বোধ আরও শক্তিশালী হবে।” এ উপলক্ষে মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন নিজের লেখা নজরুলকে উৎসর্গ করা একটি কবিতা আবৃত্তি করেন, যা উপস্থিতদের গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে—
“ঝড়ের ভাষায় যে শোনায় মুক্তির আহ্বান, সে নজরুল—মানবতার জাগ্রত প্রাণ। প্রেমের আগুন জ্বেলে শেখায় সাহসী আশা,
সে কবিই মানুষকে দেয় জেগে ওঠার ভাষা।” মঞ্চজুড়ে একে একে আবৃত্তি করা হয় নজরুলের বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতির কবিতা। পরিবেশিত হয় তাঁর কালজয়ী গান। কখনও শ্রোতারা নীরব হয়ে শুনেছেন, কখনও হাততালিতে মুখর করেছেন পুরো পরিবেশ। গরমের তীব্রতা তখন যেন আর কাউকে স্পর্শ করছিল না; সবাই ডুবে ছিলেন কবিতার অনুভবে। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডিজিএম আকরাম হোসেন, প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিতেন্দ্রলাল বড়ুয়া, ইতিহাসবিদ সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন, সাহিত্যপ্রেমিক জিএম মামুনুর রশিদ, শিক্ষক-কবি ইমরানুল ইসলাম, নুরুল হুদা চৌধুরী, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, কবি দিল আফরোজ, সাংস্কৃতিক সংগঠক আনিছ খোকনসহ আরও অনেকে। তাঁরা তাঁদের বক্তব্যে নজরুলের সাহিত্য, জীবনসংগ্রাম, সাংবাদিকতা, সাম্যবাদী দর্শন এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে তাঁর নির্ভীক অবস্থানের কথা স্মরণ করেন। বক্তারা বলেন, নজরুল ছিলেন এমন এক কবি যিনি কেবল কাব্যের অলংকারে আবদ্ধ থাকেননি; বরং শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজের কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর সাংবাদিকতাও ছিল প্রতিবাদী ও সত্যভিত্তিক। তাই তাঁকে কেবল কবি হিসেবে নয়, একজন মানবিক বিপ্লবী চিন্তক হিসেবেও নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। তারা আরও বলেন, চট্টগ্রামের মতো ঐতিহাসিক, বন্দরনগরী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ শহরে একটি স্থায়ী নজরুল গবেষণা কেন্দ্র, নজরুল আর্কাইভ এবং নিয়মিত সাহিত্যচর্চার উদ্যোগ সময়ের দাবি। কারণ নজরুলের সাহিত্য ও দর্শন কেবল অতীতের স্মৃতি নয়—এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশ। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে পরিবেশিত হয় নজরুল সংগীত, আবৃত্তি ও সমবেত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। তরুণদের সম্মিলিত কণ্ঠে ধ্বনিত হয় চল চল চল—যা পুরো ডিসি হিলকে মুহূর্তেই প্রাণচঞ্চল করে তোলে। দর্শকদের অনেকেই কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে ওঠেন; যেন কবির আহ্বান আবারও জাগিয়ে তুলছে সংগ্রামী চেতনাকে। সন্ধ্যা নামতে শুরু করলে ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান শেষ হয়, কিন্তু শেষ হয় না আবেগের রেশ। গরমে ক্লান্ত শরীর নিয়েও অনেকে দাঁড়িয়ে থাকেন, ছবি তোলেন, আলোচনা করেন, স্মৃতিচারণ করেন। মনে হচ্ছিল, ডিসি হিলের বাতাসেও যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই বার্তা—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, মানুষকে ভালোবাসো, সাম্যের পৃথিবী গড়ো। একজন বিদ্রোহী কিশোর থেকে প্রেম, মানবতা, ইসলামী ভাবনা ও সাম্যের কবিতে উত্তরণ—নজরুলের জীবন এক অবিনাশী প্রেরণার নাম। তাঁর কবিতা আজও শেখায়—শিকল ভাঙতে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে, ভালোবাসতে এবং প্রতিবাদ করতে। ডিসি হিলের তপ্ত বাতাসে তাই দিনশেষে উচ্চারিত হয়েছে একটাই আহ্বান— “আসুন, নজরুলের চেতনায় জেগে উঠুক সাহস, মানবতা, সাম্য ও সত্যের বাংলাদেশ।”

Share This Article
Leave a Comment