পাকিস্তানের ইসলামপুরা হলো কৃষ্ণনগর, মুস্তাফাবাদ এখন ধরমপুরা!

By admin
5 Min Read
পাকিস্তানের ঐতিহাসিক শহর লাহোরে শুরু হয়েছে দেশভাগ-পূর্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ। প্রায় আট দশক পর শহরের বিভিন্ন এলাকা, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ইসলামীয় নাম পরিবর্তন করে পুরনো হিন্দু, শিখ, জৈন ও ঔপনিবেশিক আমলের নাম ফিরিয়ে আনছে পঞ্জাব সরকার। বিষয়টি ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে লাহোরের বহুসাংস্কৃতিক অতীত। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত উক্তি— ‘হোয়াট’স ইন আ নেম?’— যেন বাস্তবেই প্রতিফলিত হচ্ছে পাকিস্তানে। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশভাগের পর পরিবর্তিত হওয়া বহু ঐতিহাসিক নাম আবারও পুনর্বহাল করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইসলামপুরার পুরনো নাম কৃষ্ণনগর পুনরায় চালু করা হয়েছে। একইভাবে বাবরি মসজিদ চক এখন আবার জৈন মন্দির চক নামে পরিচিত হচ্ছে। সুন্নত নগরের নাম ফিরিয়ে আনা হয়েছে সন্ত নগর হিসেবে এবং মুস্তাফাবাদের পুরনো নাম ধরমপুরাও পুনর্বহাল করা হয়েছে। পাকিস্তানের পঞ্জাব সরকারের দাবি, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য লাহোরের দেশভাগ-পূর্ব ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আবার সামনে আনা। কয়েক দিন আগে মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পঞ্জাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে লাহোর ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন রাস্তা ও স্থাপনার ঐতিহাসিক নাম পুনর্বহালের পরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হয়। গত দুই মাসে শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুরনো নামসংবলিত নতুন সাইনবোর্ডও বসানো হয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত নয়টি স্থানের পুরনো পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মী চক, যা একসময় মৌলানা জাফর আলি খান চক নামে পরিচিত ছিল। এখন আবার পুরনো নামেই ফিরছে এলাকাটি। এছাড়া ডেভিস রোড, যা পরে স্যার আগা খান রোড নামে পরিবর্তন করা হয়েছিল, সেটিও আগের নামে ফিরছে। ফাতিমা জিন্না রোডের নামও পুনরায় কুইন্স রোড করা হয়েছে। ‘দ্য প্রিন্ট’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাহোরের ঐতিহাসিক লরেন্স গার্ডেনের নাম একসময় বদলে রাখা হয়েছিল ‘বাগ-এ-জিন্না’। দীর্ঘ সময় পর আবারও তার পুরনো নাম ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাচীরঘেরা শহর লাহোরের সাবেক ডিরেক্টর জেনারেল ও লাহোর মানবাধিকার কাউন্সিলের সচিব কামরান লাশারী বলেন, সাধারণ মানুষ এখনও বহু স্থানকে পুরনো নামেই চেনে ও ডাকে। তার মতে, লাহোরের পরিচয় কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর নয়; বরং মুসলিম, হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান ও ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বহুমাত্রিক সংস্কৃতির শহর। তাই পুরনো নাম পুনর্বহালকে তিনি ঐতিহাসিক বাস্তবতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশভাগ-পূর্ব পঞ্জাবের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির আবহ আবারও ফিরে আসছে লাহোরে। ভারতের অমৃতসর থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরের এই শহর একসময় ছিল পঞ্জাব অঞ্চলের অভিন্ন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান ছিল। লাহোরের পুরনো বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাগান, আখড়া, মন্দির, গুরুদ্বার ও তীর্থস্থান এখনও সেই অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে অধিকাংশ হিন্দু ও শিখ পরিবার শহর ছেড়ে চলে যায় কিংবা চলে যেতে বাধ্য হয়। এরপর ধীরে ধীরে বহু এলাকার নাম পরিবর্তন করে ইসলামীয় বা জাতীয়তাবাদী নামকরণ করা হয়। তবুও সরকারি নথিতে নাম বদলালেও সাধারণ মানুষের মুখে পুরনো নামগুলো টিকে ছিল। স্থানীয় দোকানদার, রিকশাচালক ও বাসিন্দাদের অনেকেই এখনও দৈনন্দিন জীবনে কৃষ্ণনগর, ধরমপুরা বা লক্ষ্মী চক নামগুলো ব্যবহার করেন। বর্তমানে লাহোরে ১০০টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি ঔপনিবেশিক আমলের ভবন, গির্জা ও মহারাজা রণজিৎ সিংহের আমলের বিভিন্ন স্থাপনা পুনরুদ্ধারের কাজও চলছে। এদিকে লাহোর দুর্গ কর্তৃপক্ষ শিখ রাজপরিবারের শেষ বংশধর রাজকুমারী বাম্বা সাদারল্যান্ডের একটি চিত্রকর্মও পুনরুদ্ধার করেছে। কামরান লাশারী জানান, আগে মহারাজা রণজিৎ সিংহের মূর্তি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ভাঙচুর করা হয়েছিল। তবে এখন পরিস্থিতি বদলেছে এবং মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি উদার ও উন্মুক্ত চিন্তার হয়ে উঠেছে বলে তিনি মনে করেন। সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগে লাহোরের ক্রীড়া ঐতিহ্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পিটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ঐতিহাসিক ক্রিকেট মাঠ ও মিন্টো পার্কের পুরনো কুস্তি আখড়া পুনরুদ্ধারের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই মাঠ থেকেই দেশভাগের আগে উঠে এসেছিলেন ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার লালা অমরনাথ। একই মাঠ পাকিস্তানকে উপহার দিয়েছে ইনজামাম-উল-হকের মতো তারকা ক্রিকেটার। একসময় সেখানে কুস্তি লড়েছেন কিংবদন্তি গামা পালোয়ান ও ইমাম বখশও। সব মিলিয়ে, লাহোরে পুরনো নাম পুনর্বহালের এই উদ্যোগকে কেবল নাম পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও বহুত্ববাদী পরিচয় পুনরুদ্ধারের প্রতীকী প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।
Share This Article
Leave a Comment