“রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়ঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজায় জনসমুদ্র, শোকের আবহে রাজনৈতিক স্লোগান ঘিরে নতুন বিতর্ক-

By admin
4 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ চট্টগ্রাম আজ আরেকজন প্রবীণ রাজনীতিক, একজন পরীক্ষিত সংগঠক এবং মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সৈনিককে শেষ বিদায় জানালো। বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন–এর জানাজার নামাজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় নগরীর ঐতিহ্যবাহী জামিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ মাঠে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের ঢল নামে। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, পেশাজীবী এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা শোকে ভারী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ–এর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নগর পুলিশের কমিশনার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং জানাজায় আগত সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। অনেকেই বলছেন, দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ রাজনীতিককে সম্মান জানাতে প্রশাসনের এই উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে জানাজায় অংশ নিতে পারেন, সে জন্য ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নিরাপত্তা ও জনসমাগম ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। জানাজার আগে ও পরে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক স্মরণ করেন তাঁর সহকর্মী, অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীরা। বক্তারা বলেন, তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের রাজনীতির এক অভিজ্ঞ অভিভাবক, যিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে আজীবন রাজনীতি করেছেন। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গৃহায়ণ খাতের সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সাহসী ভূমিকার কথাও স্মরণ করা হয়। অনেকেই বলেন, বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন, বরং স্বাধীনতার চেতনা ও সাংগঠনিক দৃঢ়তার প্রতীক ছিলেন। তবে শোকের এই পরিবেশের মধ্যেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে কিছু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। জানাজা শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়া হয়। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মিছিল করার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ওয়াসা মোড় থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত বড় ধরনের মিছিল নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা কি শুধুই শোক, শ্রদ্ধা ও দোয়ার পরিবেশে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত ছিল না? কেউ কেউ মনে করছেন, জানাজাকে কেন্দ্র করে দলীয় শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা পরিস্থিতিকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে। সচেতন মহলের মতে, সরকার ও প্রশাসন যেখানে একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছিল, সেখানে কিছু অতিউৎসাহী নেতাকর্মীর আচরণ পুরো আয়োজনকে বিতর্কের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এতে পুলিশ প্রশাসনও অপ্রত্যাশিতভাবে সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও স্লোগানের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কিছু ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। যদিও এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন এক সুপরিচিত ও প্রভাবশালী নাম। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি সমালোচনাও মোকাবিলা করেছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে—চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান ছিল গভীর ও প্রভাবশালী। শেষ বিদায়ের দিনে তাই একদিকে ছিল শোক, শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণ; অন্যদিকে ছিল রাজনৈতিক আবেগ, বিতর্ক ও প্রশাসনিক প্রশ্ন। সব মিলিয়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং চট্টগ্রামের সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতারও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। জানাজায় অংশগ্রহণ করে মরহুমের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সাবেক সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও বিপুল সংখ্যক বীর মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সর্বস্তরের মানুষ জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। মিরসরাইয়ে আরেক দফা জানাজার নামাজ শেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন–কে তাঁর জন্মস্থান মিরসরাইয়ের ধুমগ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে।

Share This Article
Leave a Comment