
–মো.কামাল উদ্দিন
সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ আয়োজিত বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা বিষয়ক সেই আলোচনায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে—সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি নীরব সংগ্রাম, সত্যের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, পৃথিবীর নানা দেশে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, আর “সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা” গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনার সময় অর্জিত বাস্তব জ্ঞান—সব মিলিয়ে আজকের এই লেখার পেছনে রয়েছে এক বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীর উপলব্ধি। সাংবাদিকতা মানেই সত্য অনুসন্ধান, দায়িত্ববোধ এবং সমাজের প্রতি এক নৈতিক অঙ্গীকার। কিন্তু এই পথ সবসময় সোজা থাকে না। ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে জন্ম নেয় এমন এক ধারা—যা সংবাদকে তথ্যের চেয়ে বেশি বানিয়ে তোলে পণ্য, আর সত্যকে ঢেকে দেয় উত্তেজনা ও নাটকীয়তার পর্দায়। এই ধারার নাম হলুদ সাংবাদিকতা বা Yellow Journalism। প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভুয়া সাংবাদিকতা নয়। এটি পুরোপুরি মিথ্যা বা বানানো সংবাদ পরিবেশন করে না; বরং সত্যকে বিকৃত করে, অতিরঞ্জিত করে বা আংশিকভাবে তুলে ধরে পাঠকের মনোযোগ কাড়ার চেষ্টা করে। অর্থাৎ, এখানে তথ্য থাকে, কিন্তু সেই তথ্যের উপস্থাপন এমনভাবে করা হয় যাতে বাস্তবতা বিকৃত হয়ে যায়।
হলুদ সাংবাদিকতার উৎপত্তি উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র-এ। সে সময় নিউইয়র্কে সংবাদপত্রের জগতে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছিল। দুই প্রভাবশালী সংবাদপত্র মালিক—Joseph Pulitzer এবং William Randolph Hearst—পাঠকসংখ্যা বাড়াতে এক ধরনের চটকদার সাংবাদিকতার চর্চা শুরু করেন। তাদের পত্রিকা যথাক্রমে New York World এবং New York Journal পাঠক টানতে নানা ধরনের নাটকীয় কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। “হলুদ সাংবাদিকতা” শব্দটির পেছনেও রয়েছে একটি কৌতূহলোদ্দীপক ইতিহাস। এটি এসেছে জনপ্রিয় একটি কার্টুন চরিত্র Yellow Kid-কে ঘিরে। এই চরিত্রটি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকাতেই প্রকাশিত হতো, আর সেখান থেকেই “Yellow” শব্দটি সাংবাদিকতার এই ধারার সঙ্গে জুড়ে যায়। ধীরে ধীরে এটি এমন এক সাংবাদিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে, যেখানে সত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় উপস্থাপনার নাটকীয়তা। ১৮৯০-এর দশকে এই হলুদ সাংবাদিকতা তার সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ নেয়। তখন সংবাদপত্রগুলো পাঠক আকর্ষণের জন্য যেসব পদ্ধতি ব্যবহার করত, তা আজও পরিচিত—চটকদার শিরোনাম, আবেগপ্রবণ ভাষা, যাচাইবিহীন তথ্য, অপরাধ ও কেলেঙ্কারি নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ, এমনকি কখনো কখনো ছবি ও কার্টুনের মাধ্যমে উত্তেজনা তৈরি করা। সংবাদ তখন আর কেবল তথ্য নয়; হয়ে ওঠে এক ধরনের বিনোদন। এই ধারার সবচেয়ে আলোচিত প্রভাব দেখা যায় Spanish-American War-এর সময়। কিউবায় স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চলাকালে মার্কিন সংবাদপত্রগুলো ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করতে থাকে। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছে যখন USS Maine বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়। প্রকৃত কারণ তখনও নিশ্চিত হয়নি, কিন্তু সংবাদপত্রগুলো স্পেনকে দায়ী করে উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। “Remember the Maine!” স্লোগানটি জনমনে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বলা হয়ে থাকে, এই প্রচারণা জনমতকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল—যা হলুদ সাংবাদিকতার ক্ষমতা এবং বিপদের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এখন প্রশ্ন আসে—হলুদ সাংবাদিকতা ও ভুয়া সাংবাদিকতার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? ভুয়া সাংবাদিকতা সম্পূর্ণ মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে তথ্য বানানো হয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়; এটি সত্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে পাঠকের আবেগ উত্তেজিত হয় এবং বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়। এখানে তথ্যের বাছাই, ভাষার ব্যবহার এবং শিরোনামের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট প্রভাব তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, ভুয়া সাংবাদিকতা যেখানে সম্পূর্ণ প্রতারণা, সেখানে হলুদ সাংবাদিকতা হলো এক ধরনের বিকৃতি—যা আরও সূক্ষ্ম, আরও বিপজ্জনক। কারণ পাঠক বুঝতেই পারে না, কোথায় সত্য শেষ হয়ে অতিরঞ্জন শুরু হয়েছে। বিশ শতকের শুরুতে সাংবাদিকতার পেশাগত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে—যেমন নিরপেক্ষতা, তথ্য যাচাই, নৈতিকতা। এর ফলে হলুদ সাংবাদিকতা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু এটি কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ বদলেছে। বর্তমানে ডিজিটাল যুগে আমরা হলুদ সাংবাদিকতার নতুন রূপ দেখতে পাই—অনলাইন পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ক্লিকবেইট শিরোনামে। “আপনি বিশ্বাসই করতে পারবেন না…”, “চমকে উঠবেন…”, “শেষটা জানলে অবাক হবেন…”—এই ধরনের শিরোনামগুলো মূলত সেই পুরনো হলুদ সাংবাদিকতার আধুনিক সংস্করণ। এখানে উদ্দেশ্য একটাই—ক্লিক বাড়ানো, পাঠক টানা, এবং দ্রুত প্রভাব সৃষ্টি করা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই প্রবণতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অনেক সময় দেখা যায়, যাচাই না করেই সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তথ্য বিকৃত করা হচ্ছে, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে গুজবকে সংবাদ হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়, সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং কখনো কখনো সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে—সব সাংবাদিকতা হলুদ নয়, এবং সব ভুল সংবাদ ভুয়া নয়। সাংবাদিকতার ভেতরে নানা স্তর ও জটিলতা রয়েছে। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাজ হলো সত্যের প্রতি অবিচল থাকা, যত চাপই আসুক না কেন। শেষ পর্যন্ত, হলুদ সাংবাদিকতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সংবাদ শুধু তথ্য নয়, এটি একটি শক্তি। এই শক্তি যদি দায়িত্বহীনভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে, এমনকি ইতিহাসের গতিপথও বদলে দিতে পারে। আর যদি এই শক্তি সত্য, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তবে তা হয়ে উঠতে পারে সমাজের সবচেয়ে বড় আলোকবর্তিকা। সুতরাং, হলুদ সাংবাদিকতাকে বোঝা মানে শুধু একটি ইতিহাস জানা নয়; বরং বর্তমানকে বুঝে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হওয়া। সত্যকে রক্ষা করার এই লড়াইয়ে সাংবাদিক, পাঠক এবং সমাজ—সবারই দায়িত্ব