
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে নতুন মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’কে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের পরিপন্থী ও অবৈধ ঘোষণা করেছে। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের এই রায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয়েও এর প্রভাব রয়েছে। কিছুদিন আগেই শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ, যেখানে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এই চুক্তি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমালোচনা রয়েছে—তাদের মতে, শর্তগুলো বাংলাদেশের জন্য সমান সুবিধাজনক নয়। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে পুরোপুরি পিছু হটেনি; বরং অন্য আইনের আওতায় ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের ওপর কার্যকর শুল্ক ১৯ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে প্রস্তুত থাকা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন প্রশাসন ‘ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪’-এর ধারা ১২২ ব্যবহার করে ১৫০ দিনের জন্য এই শুল্ক আরোপ করেছে। এই সময়ের মধ্যে তারা যাচাই করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বাণিজ্যে কোনো অনিয়ম করছে কি না। তদন্তে অনিয়ম পাওয়া গেলে আরও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। তবে দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ঘাটতি রয়েছে—বাংলাদেশ বেশি রপ্তানি করে, আমদানি তুলনামূলক কম। শুল্ক ইস্যুতে সমাধানে পৌঁছাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান, তুলা ও কৃষিপণ্য আমদানির বিষয়েও সম্মত হয়েছিল। তবে চুক্তির শর্ত নিয়ে দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সমালোচনা রয়েছে, কারণ অনেকেই মনে করেন এতে বাংলাদেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র বেশি সুবিধা পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই মুহূর্তে নতুন করে আলোচনা না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাই যুক্তিযুক্ত। তার মতে, যদি এখনই চুক্তি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হলেও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন। শিল্পখাতে পরিবেশগত মান, শ্রমিকের কর্মপরিবেশ ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হবে। পাশাপাশি বাণিজ্য সম্পর্ক বৈচিত্র্যকরণের দিকেও নজর দিতে হবে। সার্বিকভাবে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি নিয়ে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—আলোচনায় তাড়াহুড়া না করে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া।