
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে সম্প্রতি ঘটে এক চরম উদ্বেগজনক ও অস্বাভাবিক ঘটনা। শেখ হাসিনার সমর্থনে স্লোগান দিতে দিতে ছাত্রলীগের একদল কর্মী হঠাৎ পুলিশের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা পুলিশের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করলে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে দশজনকে আটক করে। পরে আটক ছাত্রলীগ কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল খুলশী থানায়। ঠিক সেই সময় ঘটে আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা, যার কেন্দ্রবিন্দু যমুনা টিভির প্রতিবেদক জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত। জোবায়েদের পরিচয় যতটা সাংবাদিকতার, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাবের। তিনি আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। তার পিতা শাহাদাত হোসেন তালুকদার ছিলেন রাঙুনিয়ার পদুয়া ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার ফুফা রাঙুনিয়া পৌরসভার মেয়র শাহাজাহান সিকদার—দলীয়ভাবে প্রভাবশালী নেতা। সবচেয়ে আলোচিত তথ্য হলো, তিনি পলাতক সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও অনুগত ব্যক্তি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, হাসান মাহমুদের ব্যক্তিগত প্রভাব ও সুপারিশের ফলেই জোবায়েদ যমুনা টিভিতে চাকরি লাভ করেন। ফলে সাংবাদিকতার ন্যূনতম নৈতিকতা নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্যই তার পেশার ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কোনো সাংবাদিক বা নাগরিক থানার ভেতরে হেফাজতে থাকা আসামির সঙ্গে দেখা করতে বা ভিডিও ধারণ করতে পারেন না পুলিশের অনুমতি ছাড়া। এটি Code of Criminal Procedure (CrPC), Police Regulations Bengal (PRB) এবং Police Act, 1861 অনুযায়ী একটি গুরুতর “নিরাপত্তা লঙ্ঘন” (Security Breach)। কিন্তু জোবায়েদ সেই আইনি বিধান উপেক্ষা করে খুলশী থানার ভেতরে প্রবেশ করেন এবং আটক ছাত্রলীগ কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় ভিডিও ধারণ শুরু করেন। এটি শুধু প্রশাসনিকভাবে বেআইনি নয়, সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিও লঙ্ঘন করেছে। কারণ এতে তদন্তের গোপনীয়তা নষ্ট হয়, সাক্ষ্য প্রভাবিত হতে পারে এবং আসামিদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। জোবায়েদের বেআইনি কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডিসি আমিরুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিককে নির্দেশ দেন ভিডিও ধারণ বন্ধ করতে। কিন্তু নির্দেশ উপেক্ষা করে জোবায়েদ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং প্রকাশ্যে ডিসির সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
এই আচরণ শুধু একজন কর্মকর্তার প্রতি অসম্মান নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের প্রতি চরম অবমাননা। সাংবাদিকতার নামে এই ধরনের আগ্রাসী আচরণ আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বাধা সৃষ্টি করে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলশী থানার এই ঘটনাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়—বরং এটি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনৈতিক অপতৎপরতার অংশ। বর্তমানে তারা প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে না পেরে নতুন কৌশল নিয়েছে
বিশেষ করে চট্টগ্রামের ফোর্ট সিটি ইউনিভার্সিটির একদল ছাত্রলীগ ক্যাডার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রবেশ করে তাদের গোপন রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়েছে। এদের মধ্যে জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত অন্যতম। ঘটনাটির আগের রাতেই খুলশী থানার জিইসি কনভেনশন হল থেকে “জয় বাংলা” মিছিলের সময় কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করা হয়। পরদিন সকালে ওই ঘটনার পরপরই জোবায়েদ থানায় প্রবেশ করেন এবং আটক ছাত্রলীগ কর্মীদের স্বজনদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার নামে ভিডিও ধারণ শুরু করেন—যা স্পষ্টতই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। থানা চত্বরে এমন কার্যক্রম শুধু নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে না, বরং প্রশাসনের গোপনীয় তথ্যেরও ঝুঁকি সৃষ্টি করে। থানায় থাকে অস্ত্রাগার, মালখানা, গুরুত্বপূর্ণ মামলার ডকেট ও হাজতখানা—যেখানে সাংবাদিকের অননুমোদিত প্রবেশ সম্পূর্ণ বেআইনি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
একটি স্পর্শকাতর তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—জুলাই-আগস্টের গণহত্যা ও সহিংসতা মামলার অনেক আসামি ছাত্রলীগের ক্যাডাররা বর্তমানে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রবেশ করেছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—আইনের আওতা এড়িয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও পুলিশের কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করা। তারা মনে করছে, সাংবাদিকতার ছদ্মবেশে থাকলে প্রশাসনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হবে। এই অপচেষ্টা শুধু সাংবাদিকতা নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থারও প্রতি চরম চ্যালেঞ্জ।
ডিসি আমিরুল ইসলাম ও খুলশী থানার কর্মকর্তারা যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, তা পেশাদারিত্বের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তারা আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে পুলিশ প্রশাসনের মর্যাদা রক্ষা করেছেন।
পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট—আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, এবং প্রশাসনিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা। সাংবাদিকতা কখনো রাষ্ট্রবিরোধী হতে পারে না। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে প্রশাসনবিরোধী অপপ্রচার, ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এই সংস্কৃতি রোধ করা এখন সময়ের দাবি। খুলশী থানার এই ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে—কীভাবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, এবং কিভাবে সাংবাদিকতার আড়ালে রাজনৈতিক ক্যাডাররা প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত। এখনই সময় মিডিয়া হাউসগুলোকে সচেতন হওয়ার। এ ধরনের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাংবাদিকতার নৈতিক আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি।
কারণ, সত্য সাংবাদিকতা কখনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়—বরং সত্যেরই প্রতিরক্ষা।