
– মো. কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার ৪নং ওয়ার্ডে শিক্ষার্থী নওরিন সুলতানা ও তার পরিবারের ওপর নৃশংস সশস্ত্র হামলার ঘটনায় প্রধান আসামি আজিজুর রহমান (৫৮) অবশেষে গ্রেফতার হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকালে চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাহিদুল কবিরের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে মামলাটির তদন্ত চলছিল। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এবং মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে আসামির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে ওসি জাহিদুল কবিরের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে আজিজুর রহমানকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে। হামলার পটভূমি-গত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর পরপর দুই দফায় নওরিন সুলতানার বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রথম দফায় ১২ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে কয়েকজন সশস্ত্র হামলাকারী তাদের ঘরে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের মারধর করে এবং হত্যার হুমকি দেয়। পরদিন, ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টার সময় হামলাকারীরা আবারও দেশীয় অস্ত্র, লাঠি, রড, দা ও চাকু নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে তাণ্ডব চালায়। এসময় নওরিনের মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করা হয়, ফলে তার কপাল ফেটে রক্তাক্ত হয়। তার মা চাকুর আঘাতে হাতে গুরুতর জখম হন এবং ভাই মোহাম্মদ হাসানকে পিটিয়ে মাটিতে ফেলে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয়। হামলাকারীরা পরিবারের নারী সদস্যদের শ্লীলতাহানিরও চেষ্টা চালায়। ঘটনাস্থলে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ফলে আনুমানিক ২৫–৩০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। পরিবারটি পরদিন চান্দগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ৮৩১) করে এবং পরবর্তীতে ১৭ সেপ্টেম্বর লিখিত অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগে আজিজুর রহমানসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়। পুলিশের ভূমিকা-চান্দগাঁও থানার ওসি মো. জাহিদুল কবির বলেন, “ঘটনাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই আমাদের টিম মাঠে নামে। মূল আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের ধরতে অভিযান চলছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।” তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ মহোদয়ের নির্দেশে আমরা ভিকটিম পরিবারকে নিরাপত্তা দিয়েছি এবং তাদের বাড়ির আশপাশে টহল জোরদার করেছি।”ভিকটিম পরিবারের প্রতিক্রিয়া-মূল আসামি গ্রেফতারের পর নওরিন সুলতানা ও তার পরিবার স্বস্তি প্রকাশ করেন। তারা বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ভয়ে ছিলাম। মনে হতো, যেকোনো সময় আবারও হামলা হতে পারে। পুলিশ যেভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে আমরা কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে ওসি জাহিদুল কবির ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।” নওরিন বলেন, “আমি একজন শিক্ষার্থী। আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল আতঙ্কের কারণে। এখন কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি, তবে চাই এই মামলার দ্রুত বিচার হোক। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অন্যায়ের শিকার না হয়।”
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া- স্থানীয় সচেতন মহল ও নাগরিক সমাজ পুলিশের এই দ্রুত তৎপরতাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। তারা বলছেন, এই ধরনের পদক্ষেপই জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। স্থানীয় এক সমাজকর্মী বলেন, “নওরিন পরিবারের ওপর হামলা শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা এলাকার নিরাপত্তার প্রশ্ন ছিল। পুলিশ যে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে, এটি প্রশংসনীয়। এখন প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।” প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা-নওরিনের মা বলেন, “যেদিন আমাদের ওপর হামলা হয়, আমরা ভেবেছিলাম আর কেউ পাশে দাঁড়াবে না। কিন্তু আজ যখন শুনলাম প্রধান আসামি গ্রেফতার হয়েছে, মনে হলো আমাদের কষ্টের কিছুটা প্রতিফলন পেলাম। আমরা পুলিশ প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞ।” চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার এই ঘটনাটি স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ, ওসি জাহিদুল কবিরের নেতৃত্বে সফল অভিযান এবং মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎপরতা স্থানীয়দের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। এখন নাগরিকদের প্রত্যাশা—আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী বা পরিবার আর কখনও এমন সন্ত্রাসের মুখোমুখি না হয়।