রাউজানে বিএনপি নেতা আবদুল হাকিম হত্যায় শোকের ঢল — বালু ব্যবসা, রাজনীতি আর প্রতিশোধের ঘূর্ণাবর্তে রক্তাক্ত রাউজান

By admin
5 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের রাউজান — এক সময়ের শান্ত-সবুজ জনপদ, এখন পরিণত হয়েছে ভয় আর প্রতিশোধের রাজনীতির নামান্তরে। এই জনপদে আবারও ঝরল রক্ত, নিহত হলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম (৬৫)। রবিবার সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলে আসা সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারালেন তিনি। আর তাঁর মৃত্যুর পর যেন পুরো রাউজান থমকে গেছে—শোক, ক্ষোভ আর আতঙ্কে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে জনপদটি। জানাজায় উপচে পড়া জনস্রোত: শোকের মাঠে “আর কত?” প্রশ্ন- বুধবার (৮ অক্টোবর) বাদ আসর অনুষ্ঠিত হয় আবদুল হাকিমের জানাজা। স্থান: রাউজানের ঐতিহ্যবাহী পাঁচখাইন দরগাহ ডা. মো. মিয়া চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ। মাঠজুড়ে মানুষের ঢল—রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, ছাত্র, তরুণ—সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্রিত হয়েছিলেন প্রিয় এই মানুষটির জানাজায়। জানাজার আগে ও পরে মানুষের মুখে একই প্রশ্ন—“এই রক্তপাত কবে থামবে? নিরীহ মানুষকে আর কত মরতে হবে?” মাঠজুড়ে কান্নার রোল পড়ে যায় যখন মরদেহটি আনা হয় গ্রামের পথে। চারপাশে শোনা যাচ্ছিল—“হাকিম ভাইয়ের মতো মানুষকে কেন হত্যা করা হলো?”
“রক্তের প্রতিশোধ নেব”—গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী- জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সাবেক নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, “আমি আজ এই জানাজা মাঠে কথা দিচ্ছি—হাকিমের রক্তের প্রতিটি ফোঁটার জবাব নিতে হবে। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের কেউ রক্ষা পাবে না। হত্যার পেছনে যারা মাস্টারমাইন্ড, সেই গডফাদারদেরও চিহ্নিত করে বিচার করা হবে।” এই প্রতিশোধের ঘোষণা যেন মুহূর্তেই মাঠের বাতাসকে আরও ভারী করে তোলে। হাকিম ছিলেন গিয়াস কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী, এবং রাউজানে তাঁর দলের অন্যতম সংগঠক। হত্যাকাণ্ডের পেছনের ছায়াযুদ্ধ: বালু ব্যবসা ও ক্ষমতার লড়াই-রাউজানের রাজনীতি ও অর্থনীতি—দুইয়েরই মূলে এখন বালু ব্যবসা। কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও বালু মহালের ইজারাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছিল। স্থানীয় সূত্র জানায়, এবারের ইজারায় প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার পে-অর্ডার জমা দিয়েছিলেন আবদুল হাকিম। কিন্ত হাকিম তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম বাদদিয়ে ইজারা নেন তাঁর দুই সহযোগী পারভেজ ও ফরিদের প্রতিষ্ঠানে। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই গোপনীয় ভাবে দ্বন্দ্বের আগুন জ্বালিয়েদেন বোয়ালখালীর এক বালুর মাফিয়া। সেই ইজারায় পারভেজ ও ফরিদ নামমাত্র সহযোগী হলেও, পেছনে ছিল সেই বালুর মাফিয়া এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক গ্রুপ। আর এই গ্রুপের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মাঠে নামে আরেক শক্তিশালী পক্ষ—ফজল হক গ্রুপ, যাদের নেতৃত্বে আছেন প্রবাসী ফজল হক, যিনি একসময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সহযোগী, পরে ঘনিষ্ঠ হন আওয়ামী লীগ নেতা ফজলে করিম চৌধুরীর। ফজল হক বর্তমানে সৌদি আরবে থাকলেও, রাউজানের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব প্রবল। স্থানীয়দের মতে, “দুবাই বা সৌদি থেকেই তিনি নির্দেশ দেন—কার বালু যাবে, কার যাবে না, কে থাকবে, কে মরবে।” হত্যা ছিল পরিকল্পিত: পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত- চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, “এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মদুনাঘাট এলাকায় প্রাইভেটকারে থাকা অবস্থায় হামলাকারীরা গুলি চালায়। চারজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।” তিনি আরও বলেন, “হাকিম হত্যার মূল প্ররোচনাকারীরা বালু ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী। তদন্তে পাওয়া যাচ্ছে—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষাই এই হত্যার মূল উদ্দেশ্য।” ওসির চাঞ্চল্যকর মন্তব্য: মন্ত্রী ঘনিষ্ঠ বালু মাফিয়া জড়িত- হাটহাজারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মন্জুর কাদের সাদা কালো মাল্টিমিডিয়া গ্রুপের চারটি পত্রিকার সাংবাদিকদেরকে জানান, “হত্যার পরিকল্পনা করেছে এক প্রভাবশালী বালু মাফিয়া। এই ব্যক্তি বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ের প্রভাবশালী মন্ত্রী হাসান মাহমুদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। এবং মন্ত্রীর পাটনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তারা অবৈধভাবে শত শত কোটি টাকা আয় করেছে, হাকিম তাদের ব্যবসায় বাধা দিচ্ছিলেন। সেই কারণেই সৌদি আরবে অবস্থানরত ফজল হকের সঙ্গে আঁতাত করে পেশাদার খুনিদের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।” ওসি আরও বলেন, “আমরা তদন্ত চালাচ্ছি। হত্যার আসল রহস্য খুব শিগগিরই উদঘাটন হবে।” রাউজানের ভয়াবহ বাস্তবতা: রাজনীতি মানেই এখন বালু, চাঁদা ও অস্ত্র- গত এক বছরে রাউজানে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন। সব হত্যার পেছনেই একই সূত্র—বালু মহাল, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রতিশোধ। স্থানীয়রা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন, কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতেও ভয় পান। এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “রাউজানে এখন রাজনীতি মানে উন্নয়ন নয়—মানুষ হত্যা, টেন্ডারবাজি আর অস্ত্রের প্রদর্শনী।” মানুষ এখন একটাই দাবি জানায়: “হাকিম হত্যার বিচার চাই”- আবদুল হাকিমের মৃত্যুর পর রাউজানজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দোকানপাট, বাজার, চায়ের দোকান—সবখানেই একটাই আলোচনা, “হাকিম ভাইয়ের মতো নির্লোভ মানুষকে কে হত্যা করল?” তাঁর সহকর্মীরা জানান, তিনি ছিলেন মানবিক ও সমাজসেবী ব্যক্তি। বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েও কখনো ব্যক্তিস্বার্থ দেখেননি। তিনি এলাকার গরিব মানুষদের সহায়তা করতেন, অসুস্থদের চিকিৎসা দিতেন, সামাজিক কাজে ছিলেন সবসময় এগিয়ে। আজ তাঁর শূন্যতা রাউজানবাসীর হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে। আবদুল হাকিমের হত্যাকাণ্ড রাউজানের রাজনীতির অন্ধকার দিককে আবারও উন্মোচন করেছে। রাজনীতি যখন ব্যবসার ঢাল, বালু যখন ক্ষমতার প্রতীক, তখন সৎ মানুষদের জায়গা থাকে না। মানুষ এখন কেবল একটি প্রার্থনা করছে— “এই হত্যার বিচার হোক, হাকিমের রক্ত যেন বৃথা না যায়।”

Share This Article
Leave a Comment