
১৯৯২ সালে যখন প্রথমবার বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়, তখন মানসিক সুস্থতা নিয়ে সচেতনতা ছিল খুবই সীমিত। আজ প্রায় তিন দশক পরে সেই আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। অক্টোবর মাস এখন বিশ্বজুড়ে ‘ইমোশনাল ওয়েলনেস মান্থ’ বা মানসিক সুস্থতা মাস হিসেবে উদ্যাপিত হয়। যেখানে মানুষকে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। অনেকেই বিশেষভাবে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে আলাদা করে মনোযোগ দেন না। কাজ, সম্পর্ক, পরিবার সব কিছুর চাপকে ‘বড় হওয়ার অংশ’ ভেবে মেনে নেওয়া হয়। তবে সকলেরই আসলে ভাবা উচিত নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিচ্ছি তো? সত্যি বলতে, উত্তরটা বেশিরভাগের ক্ষেত্রে আসে ‘না’। প্রতিদিনের কাজের ভিড়ে নিজের মানসিক প্রশান্তি যেন হারিয়ে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরো একটি মাস শুধুমাত্র নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে ব্যয় করা যেতে পারে। আর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বেছে নেওয়া যায় ধ্যান ও আত্মচর্চাকে। বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ প্রথম কয়েকদিনই বোঝা যাবে— যতই ইচ্ছা হোক না কেন, দীর্ঘ সময় ধ্যান করার মতো সময় বের করা সহজ নয়। শুরুতে প্রতিদিন ৩০ মিনিট ধ্যান করার পরিকল্পনা করা ভালো। তবে সকালপ্রেমী না হলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। তাই মানসিক যত্ন নিতে গেলে প্রথমেই দরকার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। দিনের নির্দিষ্ট সময়গুলোতে মাত্র কয়েক মিনিট নিজের জন্য রাখলেই মানসিক ভারসাম্য অনেকটা ফিরে আসে। যেমন- ঘুম থেকে ওঠার পর, কাজের বিরতিতে বা রাতে ঘুমানোর আগে— এই ছোট ছোট সময়গুলোকে ব্যবহার করা যায় ধ্যান বা শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলনে। নিজের জন্য নির্দিষ্ট যত্ন “মানসিক স্বাস্থ্য ও ভালো থাকার ক্ষেত্রে এক ধরনের পদ্ধতি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় না” বলেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ধ্যান প্রশিক্ষক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লিন গোল্ডবার্গ। ‘ওয়েলঅ্যান্ডগুড ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি বলেন, “মানসিক সুস্থতার জন্য যেসব পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি কার্যকর, সেগুলোকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো দরকার। আমরা একদিকে তাত্ক্ষণিক উদ্বেগ বা অনিদ্রার মতো সমস্যার দ্রুত উপশমের চেষ্টা করি, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ‘স্ট্রেস’ বা উৎকণ্ঠার মূল কারণ নিয়েও কাজ করি।” এক্ষেত্রে দুটি লক্ষ্য ঠিক করা যেতে পারে— ঘুমের উন্নতি ও কাজের চাপ কমানো। ধীরে ধীরে দেখা যাবে কর্মস্থলের উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তখন রাতের ঘুমও ভালো হবে। আর ভালো ঘুমের ফলে সারাদিন মনোযোগী ও প্রশান্ত থাকা অনেক সহজ হয়ে যাবে। ছোট থেকে শুরু করা ধ্যান করার অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ নয়। অনেকবার শুরু করেও কেউ কেউ ব্যর্থ হন। তবে মূল পার্থক্য হল, ছোট ছোট সময় থেকে শুরু করা। লিন গোল্ডবার্গ বলেন, “ধ্যান বা আত্মচর্চায় সফল হতে গেলে প্রথমে সময় নয়, নিয়মিততা-ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিনিটের অনুশীলনও মস্তিষ্কের জন্য আশ্চর্যজনক উপকার বয়ে আনতে পারে।” দিন শেষে মাত্র দুই মিনিটের মনোসংযোগ বা গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়। আর সবচেয়ে বড় কথা— এমন ছোট ছোট অনুশীলনগুলোই ধীরে ধীরে বড় অভ্যাসে পরিণত হয়। নিজের অগ্রগতি উপভোগ করা মানসিক সুস্থতা অর্জনের যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হল- নিজের অগ্রগতি লক্ষ করা। অনেকেই ভুলে যান কত দিন ধরে নিয়মিত ধ্যান করছেন বা কখনও বাদ পড়েছে কিনা। তবে এবার সেই বিষয়গুলো ট্র্যাক করতে শুরু করা উচিত। নিয়মিত আত্মচর্চা করলে তা নিজেকে আরও উৎসাহিত করবে । লিন গোল্ডবার্গও বলেন, “নিজের অগ্রগতি উপলব্ধি করা মানসিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ এতে আপনি নিজেই নিজের সহায়ক হয়ে ওঠেন।” দুই সপ্তাহ পরেই বোঝা যাবে শুধু ভালো ঘুম হচ্ছে না বরং সারাদিনের উদ্বেগও অনেক কমে যাচ্ছে। যে কারণে মানসিক স্বাস্থ্য মাস গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি আটজন মানুষের মধ্যে একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এ কারণেই প্রতি বছর ১০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। যার উদ্দেশ্য হল মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা বাড়ানো। অক্টোবরের পুরো মাসব্যাপী মানসিক সুস্থতা উদ্যাপনের অর্থই হল— নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া, নিজেকে বোঝা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা নেওয়া। এক মাসের ধ্যান ও আত্মচর্চা, নিজের মানসিক শান্তি কখনই বিলাসিতা নয়, এটি জীবনের অপরিহার্য অংশ। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় প্রায়ই নিজেদের উপেক্ষা করা হয়। অথচ প্রতিদিনের মাত্র কয়েক মিনিট আত্মচর্চা আমাদের মন, ঘুম ও সম্পর্ক— সব কিছুতেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।