আলো-আঁধারের গোপন কথা: কর্ণফুলী থেকে খোলা হাওয়ার যাত্রা

By admin
5 Min Read

মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির নির্জন সভাঘরটি আজকে যেন এক অদ্ভুত আবেশে মোড়া ছিল। মঞ্চের লালচে পর্দা, ফাঁকা চেয়ার আর হালকা আলো-আঁধার পরিবেশকে ঘিরে রেখেছিল এক নীরব সুর। বাইরে শহরের কোলাহল থাকলেও ভেতরে যেন অন্য এক জগৎ—যেখানে মানুষ তাদের স্বপ্ন, আশা আর বেদনার কথা ভাগাভাগি করে নিতে চায়। আমি ছিলাম মূল বক্তা। পরিবেশবাদী সংগঠন এ্যাডভিশন বাংলাদেশ–এর উদ্যোগে কর্ণফুলী নদী রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করছিলাম। বহু বছর ধরে নদীর বুক চিরে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানা, দখলদারিত্ব আর দূষণের কাহিনি শুনে মানুষ হয়তো ক্লান্ত। আমি জানতাম, আমার শব্দগুলো হয়তো নতুন নয়, হয়তো শ্রোতাদের মনে অগ্নি জ্বালাতে পারবে না। তবুও চোখ তুলে যখন সামনের সারিতে বসা কয়েকজন নারীর মুখোমুখি হলাম, তখন হঠাৎ মনে হলো—তারা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, শুধু শুনছেনই না, অপেক্ষা করছেন। হয়তো আমার বক্তব্যের ভেতর কোনো অপ্রকাশিত বাণী তারা খুঁজছিলেন। এই নারীরা সাধারণ কেউ নন। সমাজের অসংগতি, অরাজকতা, হানাহানি আর পারিবারিক অশান্তির বিরুদ্ধে শান্তির নিঃশ্বাস ভাগাভাগি করার জন্য তারা গড়ে তুলেছেন একটি সংগঠন—“খোলা হওয়া।” নামটি যত সরল, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস, নীরবতা আর শূন্যতার ব্যাখ্যা। পরিচয়ের পালা হলো। সামনে বসা ভদ্র নারীদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনের আহ্বায়ক সাঈদুন নেছা, যার চোখেমুখে ঝলমল করছিলো দৃঢ়তা। ছিলেন অধ্যাপিকা সাহেদা মোরশেদ, যিনি শিক্ষা-অভিজ্ঞতার আলোকে সমাজের গভীর সমস্যা তুলে ধরতে জানেন। সাথে ছিলেন প্রাণবন্ত মিথিলা আর মমতাময়ী স্বভাবের সৈয়দা শিরিন মোস্তফা। অল্প কিছু আলাপচারিতাতেই বুঝতে পারলাম, তাদের এই সংগঠন কেবল কথার খেলা নয়। একাকিত্বের কঠিন সময়ে, মনের গভীর হতাশা আর শূন্যতায় তারা খুঁজে পেয়েছেন নতুন ভরসা। জীবন যত জটিল হয়েছে, সম্পর্ক যত ভঙ্গুর হয়েছে, তারা ততই বিশ্বাস করেছেন—কথা বিনিময়, মন খোলা আলোচনা, আর মানবিক সহচর্যই হতে পারে বাঁচার একমাত্র ভরসা। নারীরা শুরু করলেও সংগঠনে পুরুষদের অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই। বরং এই খোলা হাওয়া এমন এক পরিসর, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মনের যন্ত্রণাকে বাতাসে উড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের জীবনের এক অমোঘ সত্য হলো—আমরা সবাই কোনো না কোনো সময়ে একা হয়ে যাই। পাশে মানুষ থাকলেও ভেতরের একাকিত্ব ঘিরে ধরে। হয়তো সংসারে ব্যস্ত স্বজনেরা সময় দেয় না, হয়তো বন্ধুরা হারিয়ে যায় নিজেদের জগতে, কিংবা হয়তো সমাজের প্রতিযোগিতা আমাদের আলাদা করে ফেলে। এই একাকিত্ব ভয়ংকর। নিঃসঙ্গতার দেয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে মানুষ ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে যায়। তখন কারও সাথে মনের কথা ভাগাভাগি করা হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। খোলা হওয়া তাই এক অর্থে একটি “বন্ধু সংগ্রহ আন্দোলন।” এখানে মানুষ খুঁজে পায় শ্রোতা, খুঁজে পায় সহমর্মিতা, খুঁজে পায় এক স্নিগ্ধ বাতাস—যা জীবনের ভার কমিয়ে আনে। আজকে সভাঘরে বসে আমার চোখে ভেসে উঠেছিলো ভিন্ন এক দৃশ্য। মঞ্চের সামনে লালচে আলোয় যেন জন্ম নিচ্ছিলো এক অঘোষিত বোঝাপড়া। সবাই আলোচনা করছিলেন, কিন্তু কিছু মানুষের চোখে ছিলো নীরব সংকেত—যা কেবল অনুভব করা যায়, বলা যায় না। আমার সামনে বসা সেই সুহাসিনী নারীর চোখে আমি দেখেছিলাম অবিশ্বাস আর আত্মসমর্পণের মিশ্রণ, আর আশেপাশে থাকা মানুষদের মাঝেই যেন গড়ে উঠছিলো এক গোপন জগত। মনে হচ্ছিল, এই সভা শেষ হলে হয়তো আমাদের পথ আলাদা হয়ে যাবে, কিন্তু এই মুহূর্তের বিনিময় চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। হয়তো এই কারণেই খোলা হওয়া সংগঠনের জন্ম। মানুষ বুঝতে পেরেছে, অল্প সময়ের এক দৃষ্টিবিনিময় কিংবা কয়েকটি আন্তরিক কথোপকথনও জীবন বদলে দিতে পারে। আগামী ৪ অক্টোবর থিয়েটার হলে এই সংগঠন আয়োজন করতে যাচ্ছে এক “খোলামেলা আলোচনা।” সেখানে শুধু সামাজিক অস্থিরতা বা পারিবারিক সংকটের কথা নয়, বরং মানুষ তাদের একাকিত্ব, বেদনা, ভালোবাসা আর স্বপ্ন ভাগাভাগি করবে। আমাকে তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ভাবলাম, কর্ণফুলীর জলরেখা থেকে শুরু হওয়া আমার কথা হয়তো খোলা হাওয়ার এই আলোচনায় নতুন মাত্রা পাবে। আমি মুখোমুখি বসবো সেইসব মানুষের সাথে, যারা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লেও হাসিমুখে বেঁচে থাকে, যারা জানে—খোলা হওয়া ছাড়া মুক্তি নেই। আমাদের সমাজে হাজারো সংগঠন আছে—অধিকার আদায়ের, আন্দোলনের, অথবা রাজনীতির। কিন্তু খোলা হওয়া আলাদা। এটি মানুষের নিঃশ্বাসের সংগঠন, মনের বোঝা নামানোর সংগঠন। এখানে রাজনীতি নেই, নেই ক্ষমতার লড়াই। আছে কেবল মানবিকতার উন্মুক্ত বাতাস। কর্ণফুলীর নদী যেমন তার বুকে জমে থাকা দূষণকে ঝেড়ে ফেলে আবার নতুন স্রোতে বাঁচতে চায়, তেমনি আমাদের হৃদয়ও চায় মুক্তির হাওয়া। খোলা হওয়া সেই মুক্তিরই এক রূপ—যেখানে একাকিত্ব ভাঙে, যেখানে আলো-আঁধারের গোপন কথা মিশে যায় মানবিকতার স্রোতে।

Share This Article
Leave a Comment