প্রাচীন গ্রীসে নারী চিকিৎসক হওয়ার সংগ্রাম ও অ্যাগনোডিসের পথপ্রদর্শক

By admin
5 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ

আজকের পৃথিবীতে চিকিৎসা ব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না নারী চিকিৎসক ছাড়া। হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ কিংবা গবেষণাগারে নারীরা এখন পুরুষদের সমানতালে কাজ করছেন। মাতৃসেবা থেকে শুরু করে হৃদরোগ, ক্যান্সার কিংবা সার্জারির মতো জটিল ক্ষেত্রেও নারী চিকিৎসকরা অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এমন একটি সময় ছিল যখন নারীদের চিকিৎসক হওয়া তো দূরের কথা—চিকিৎসা বিদ্যা শেখারও অনুমতি ছিল না। প্রাচীন গ্রিসে (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী নাগাদ) নারীদের চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন ছিল নিষিদ্ধ। চিকিৎসা বিদ্যা তখন মূলত পুরুষদের একচেটিয়া পেশা হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এথেন্সের সমাজব্যবস্থায় নারীরা ঘরের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকতেন, তাদের শিক্ষালাভ বা পেশাজীবনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ ছিল না। অথচ সেই একই সমাজেই পুরুষ চিকিৎসকদের অবদানকে কেন্দ্র করে চিকিৎসাশাস্ত্রের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল—যার নাম আজ আমরা জানি হিপোক্রেটিক মেডিসিন।অতএব, আজকের দিনে যেখানে নারী চিকিৎসক ছাড়া আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা অচল, সেখানে প্রাচীন গ্রিসে নারীদের এই পেশা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ইতিহাস একদিকে যেমন নারীর সংগ্রামের সাক্ষী, অন্যদিকে মানবসভ্যতার বিকাশমান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণও বটে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারীর অবস্থান কখনোই সমান মর্যাদার ছিল না। জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান, শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই নারীকে বারবার বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। চিকিৎসাশাস্ত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রাচীন গ্রীস, যাকে বলা হয় পাশ্চাত্য সভ্যতার সূতিকাগার, সেখানেও নারীদের চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ ছিল না। বরং আইনের মাধ্যমে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কেন প্রাচীন গ্রীসে নারীরা চিকিৎসক হতে পারতেন না?১. সামাজিক ধ্যানধারণা ও লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন: প্রাচীন গ্রিসের সমাজে নারীকে প্রধানত গৃহকেন্দ্রিক মনে করা হতো। তাদের দায়িত্ব ছিল সন্তান জন্ম দেওয়া, পরিবার সামলানো ও ঘরোয়া কাজ করা। জ্ঞানচর্চা বা চিকিৎসার মতো উচ্চতর বিদ্যা পুরুষের জন্য সংরক্ষিত ছিল। ২. নৈতিকতা ও শুদ্ধতার ধারণা: গ্রিসে বিশ্বাস করা হতো যে কোনো নারী চিকিৎসা বিদ্যা শিখলে, বিশেষত পুরুষ রোগীর চিকিৎসা করলে, সমাজের নৈতিক কাঠামো ভেঙে যাবে। নারীর সঙ্গে পুরুষ রোগীর সংস্পর্শকে অশোভন ও অনৈতিক মনে করা হতো। আইনি নিষেধাজ্ঞা: প্রাচীন এথেন্সে সরাসরি আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল যে নারী চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে পারবে না। এ আইন ভঙ্গ করলে শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। অ্যাগনোডিসের সাহসিকতা খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালে জন্ম নেওয়া অ্যাগনোডিস ছিলেন সেই প্রাচীর ভাঙার প্রথম সাহসিনী। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। সমাজের বাধা এড়িয়ে তিনি পুরুষ বেশে আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন। ডাক্তারি পেশায় প্রবেশের পর তিনি নারীদের আস্থা অর্জন করতে শুরু করেন, কারণ নারীরা পুরুষ চিকিৎসকদের কাছে যেতে চাইতেন না। তবে তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে পুরুষ চিকিৎসকরা ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে অভিযুক্ত করেন এবং মৃত্যুদণ্ড দিতে উদ্যত হন। শেষমেশ নারীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের মুখে আইন পরিবর্তিত হয়। তখন থেকে নারীরা চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে পারতেন, তবে শর্ত ছিল তারা শুধুমাত্র নারীদের চিকিৎসা করবেন। অন্যান্য সভ্যতায় নারীদের চিকিৎসাশাস্ত্রে মিশর: প্রাচীন মিশরে নারী চিকিৎসকদের কিছুটা স্বীকৃতি ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ সালের কাছাকাছি সময়ে মেরিট-পতাহ নামে এক নারী চিকিৎসকের উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি ইতিহাসের প্রথম নথিভুক্ত নারী চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। ভারত: আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে নারীদের নাম খুব বেশি পাওয়া যায় না, তবে ধাত্রী ও প্রসূতিবিদ্যায় তারা দীর্ঘকাল সক্রিয় ছিলেন। রোম: প্রাচীন রোমেও নারী চিকিৎসক (মেডিকা) ছিলেন, যারা বিশেষত প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ নিয়ে কাজ করতেন। তবে সামাজিকভাবে তাঁদের গুরুত্ব খুব সীমিত ছিল। ইউরোপে নারী চিকিৎসক হওয়ার অনুমতি-প্রাচীন গ্রিস ও রোমের পর ইউরোপে নারীদের চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রবেশ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। মধ্যযুগে খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রভাবের কারণে নারীদের চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ প্রায় শূন্য ছিল। তবে কিছু ব্যতিক্রম ছিল—ইতালির ট্রটুলা অব স্যালার্নো (১১শ শতক) ছিলেন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, যিনি নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে প্রথম বই লেখেন। মধ্যযুগ জুড়ে নারীরা মূলত ধাত্রী বা ভেষজবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিক চিকিৎসাশাস্ত্রে তাদের প্রবেশাধিকার ছিল না। আধুনিক যুগে পরিবর্তনন১৯শ শতক: ইউরোপ ও আমেরিকায় নারীদের জন্য চিকিৎসাশাস্ত্রের দরজা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করে। এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েল (১৮৪৯): যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম নারী যিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্রিটেনে সোফিয়া জেক্স-ব্লেক: নারীদের জন্য মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলন করেন। অ্যাগনোডিস ছিলেন সেই সাহসিনী যিনি প্রাচীন গ্রীসে নারীর চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রবেশের পথ তৈরি করেছিলেন। তাঁর সংগ্রাম প্রমাণ করে—নারীর অগ্রযাত্রা কখনোই সমাজ স্বেচ্ছায় দেয়নি, বরং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অর্জন করতে হয়েছে। মিশরের মেরিট-পতাহ থেকে গ্রীসের অ্যাগনোডিস, আবার আধুনিক যুগের এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েল—সবাই মিলে নারী জাতির জন্য ইতিহাস গড়েছেন। আজকের দিনে নারী চিকিৎসকদের নেতৃত্ব ও সাফল্য তাদেরই ত্যাগ ও সংগ্রামের ফল। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীর প্রতিটি অর্জন এসেছে অগণিত বাঁধা অতিক্রম করে, দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের আলোকে

Share This Article
Leave a Comment