চট্টগ্রাম উন্নয়নের দুই অগ্রপথিক:এস এম জামাল উদ্দিন স্মরণসভা ও আব্দুল্লাহ আল নোমানকে সম্মাননা দিতে না পারার এক অপূর্ণ বেদনা””

3 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
সময় দ্রুত বদলে যায়, কিন্তু কিছু মুহূর্ত স্মৃতিতে অমলিন থেকে যায় চিরদিন। ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই, এমনই এক স্মরণীয় দিন ছিল চট্টগ্রামবাসীর জন্য। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল এক হৃদয়ছোঁয়া আলোচনা সভা—বিষয় ছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন এবং প্রয়াত চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম জামাল উদ্দিনকে নিয়ে স্মরণসভা। এই অনুষ্ঠানে শুধু তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা হয়নি, চট্টগ্রামের উন্নয়নে যাঁরা নিরলস ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে থেকে কয়েকজন কৃতী ব্যক্তিকে ‘এস এম জামাল উদ্দিন স্মৃতি পদক’ দিয়ে সম্মানিত করার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছিল। চট্টগ্রামের উন্নয়নের শ্রেষ্ঠ নায়ক হিসেবে তখন সর্বসম্মতভাবে যাঁকে সম্মান জানানো ঠিক করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী, পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক আব্দুল্লাহ আল নোমান। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সততা, সাহসিকতা ও চট্টগ্রামের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে এনে দিয়েছিল এক অনন্য মর্যাদা।
আমাদের পরিকল্পনা ছিল, নোমান সাহেবকে প্রধান অতিথি করেই সম্মাননা স্মারকটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে। তিনি সে অনুযায়ী ঢাকার বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তাঁর পথ রুদ্ধ করে দেয়। সেদিন আদালতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় হয়, যা সারা দেশের রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করে। দলের সিদ্ধান্তে নোমান সাহেবকে ফিরে যেতে হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে—তিনি সেখানে রায়ের প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন। আমরা বুঝতে পারি, দলীয় দায়বদ্ধতা তাঁকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। তিনি তখন আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন—“আবার কোনো দিন এস এম জামাল উদ্দিনের স্মরণসভা হলে আমি অবশ্যই আসব, তখনই পদকটি নিই।” আমরা আশায় ছিলাম, হয়তো পরবর্তী অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মানিত করতে পারব।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, সময় সব কিছু কেড়ে নেয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নোমান ভাই আমার উপস্থাপনায় বাংলা টিভির একাধিক টকশোতে “নির্বাচন ভাবনা” আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন, চট্টগ্রামের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু তখনও স্মৃতি পদকটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
এরপর দেখতে দেখতে সময় পেরিয়ে গেছে। আর আমরা কখনো ভাবিনি, একদিন তিনি থাকবেন না—চট্টগ্রামপ্রেমী, সংগ্রামী, সৎ রাজনীতিক আব্দুল্লাহ আল নোমান আমাদের মাঝে আর ফিরবেন না।
আজ তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। তাঁর আর কোনো অপেক্ষা নেই, কোনো প্রতীক্ষা নেই।
আজ ২৩ জুলাই—আমাদের প্রিয় এস এম জামাল উদ্দিনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সেই দিনের স্মরণসভা মনে পড়ে। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের সকল রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন, তখন রাজনীতিতে আজকের মতো তিক্ত বিভাজন ছিল না।
সবাই মিলেই চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতেন, একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন।
তখনও নীতি, আদর্শ আর উন্নয়ন ছিল রাজনীতির চালিকা শক্তি।
আজ আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সেই দুই চট্টগ্রাম প্রেমী মহান মানুষকে—এস এম জামাল উদ্দিন এবং আব্দুল্লাহ আল নোমান। একজন ছিলেন আন্দোলনের নেতা—নিরলসভাবে চট্টগ্রামের স্বার্থে সংগ্রাম করে গেছেন, অন্যজন ছিলেন সরকারে থেকে চট্টগ্রামের উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।
তাঁদের পথ আলাদা হলেও লক্ষ্য ছিল এক—চট্টগ্রামের অগ্রগতি, উন্নয়ন ও মর্যাদা।
আমার মনে হয়, আজ এই দিনে আমাদের উচিত, এই দুইজনকে যুগপৎভাবে চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে সম্মান জানানো।
যাঁরা আর জীবিত নেই, কিন্তু যাঁদের কর্মে, চিন্তায় ও স্বপ্নে এখনো আমরা অনুপ্রাণিত হই। আমার লেখাটি তাঁদের সেই অবদান আর অসমাপ্ত স্মৃতির প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য।

Share This Article
Leave a Comment