“গৌরবের ইতিহাসে প্রশ্নবিদ্ধ বর্তমান: কোন পথে আওয়ামী লীগ?”

6 Min Read

– মো. কামাল উদ্দিনঃ
আগামীকাল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন, পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে যে রাজনীতি বিকাশ লাভ করেছিলো ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে, কালের প্রবাহে সেটিই হয়ে ওঠে বাঙালির মুক্তির মশাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং শামসুল হকের মতো কিংবদন্তি নেতাদের হাতে গড়ে ওঠা দলটি ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে নেতৃত্ব দিয়েছে – ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত।
আজ, সেই দল—আওয়ামী লীগ—এক অভূতপূর্ব বাস্তবতার মুখোমুখি। ইতিহাসের এক জটিল বাঁকে এসে দলটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। একটি প্রাচীন, জনআবেগে বাঁধা, দেশের স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দলকে আজ গোপনে নিজেদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে হচ্ছে—এ দৃশ্য বেদনাদায়ক এবং আশঙ্কাজনক। তবে বাস্তবতাকে এড়িয়ে গেলে ইতিহাস বোঝা যায় না। ১৭ বছর ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যেভাবে দলটি পরিচালিত হয়েছে, তা অনেকাংশেই আওয়ামী লীগের মূল আদর্শ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত। দলীয় কর্মসূচিকে সরকারী কার্যক্রমে রূপান্তর,
একনায়কতান্ত্রিক আচরণ, ভিন্নমত দমন, দুর্নীতির জাল বিস্তার, এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ—এসবই আওয়ামী লীগকে একটি প্রশ্নবিদ্ধ, জবাবদিহিহীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। তৃণমূলের এক সময়ের সাহসী কর্মীরা আজ নিজেদের পরিচয় দিতে ভয় পান, বিব্রত হন। তারা জানেন, এখন আওয়ামী লীগ মানেই গায়ে “ক্ষমতা, দুর্নীতি আর দম্ভ”–এর তকমা লেগে যাওয়ার আশঙ্কা।
তবে আওয়ামী লীগের এই বর্তমান চিত্রই যে চিরন্তন, তা নয়। দলের ইতিহাসে রয়েছে সংগ্রামের স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদান, ৬ দফার আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী লড়াই—এসব কিছুতেই আওয়ামী লীগের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় অম্লান। তাই কোনো একক নেতৃত্বের ব্যর্থতা বা এক দল সুবিধাবাদী নেতার পদদলিত রাজনীতিকে পুরো আওয়ামী লীগের ইতিহাস বলে ভুল করা যাবে না।
সমালোচনা করতে হবে দল পরিচালনার ভুল সিদ্ধান্তের, অহংকারী নেতৃত্বের, গণতন্ত্র হরণকারী নীতির। কিন্তু সমালোচনায় ইতিহাসের অবদান ভুলে গেলে তা হবে অন্যায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দলটি একদিন আবার নিজেদের হারিয়ে ফেলা গণতান্ত্রিক চেতনা, ত্যাগের সংস্কৃতি এবং আদর্শিক দৃঢ়তা ফিরিয়ে আনতে পারবে—এই প্রত্যাশা করাই জনগণের দায়িত্ব।
আজকের আওয়ামী লীগের যে পতন, তা নিজেরাই ডেকে এনেছে। দলীয় নেতৃত্বের অন্ধ আনুগত্য, সত্যকে অস্বীকার করে তোষামোদে অভ্যস্ত হওয়া, এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করার চর্চা এ পতনের অন্যতম কারণ।
একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে যখন গণতন্ত্র বিলুপ্ত হয়, তখন তার জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবও বিলুপ্ত হয়। আর সেটাই হয়েছে আজকের আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে।
তবুও, যত ভুল হোক—আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। কারণ এই দলের নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে হাজারো শহীদের রক্ত, বাঙালির স্বাধীনতা, এবং বঙ্গবন্ধুর মতো একজন অনন্য রাষ্ট্রনায়কের স্বপ্ন। এই সত্য ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।
তাই আওয়ামী লীগের যেসব নেতা, কর্মী আজ হতাশ, নিঃসঙ্গ, মুখ নিচু করে নিজেদের পরিচয় দিতে দ্বিধায় পড়েন—তাদের উচিত আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের অতীত ফিরে দেখা। দলকে পুনরুদ্ধার করতে হলে আজকের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে, ভবিষ্যতের জন্য একটি মুক্ত, গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ নেতৃত্ব নির্মাণের পথে হাঁটতে হবে।
সমালোচনা দলের জন্য, দল ধ্বংসের জন্য নয়। আওয়ামী লীগ দলটি নয়, বরং কয়েকজন নেতার স্বার্থপর নেতৃত্ব দলকে আজ এই পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
তবে আওয়ামী লীগের আজকের এই সঙ্কটমূলক অবস্থার জন্য দায়ী শুধুমাত্র বিরোধী দল নয়, কোনো ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী নয়—বরং দায়ী দলটির ভেতরকার ক্ষমতালিপ্সু, জনবিচ্ছিন্ন, দুর্নীতিপরায়ণ নেতৃত্বই। গত ১৭ বছরে যেভাবে একচ্ছত্র শাসনের নামে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে, জনগণের অভিব্যক্তিকে অপমান করা হয়েছে, দেশের সম্পদ লুট করে কিছু সুবিধাবাদী নেতৃত্ব নিজেদের ভাগ্য গড়েছেন—তা ক্ষমাশীল নয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি যে ‘এককেন্দ্রিক স্বৈরতন্ত্রে’ পরিণত হয়েছে, তা আর গোপন নয়। দলীয় সিদ্ধান্তগুলো দলীয় কাউন্সিল বা কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে নয়, বরং কিছু চাটুকার এবং দুর্নীতিবাজ আমলাদের পরামর্শে গৃহীত হয়। এরা সরকার চালায়, দল নয়। সংসদ আর সংসদ নেই, বিরোধী দলের অস্তিত্ব কাগজে-কলমে, সংবাদপত্রে নেই স্বাধীন মতপ্রকাশ, সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো ভয়ঙ্কর আইনের মাধ্যমে। এত সবের পেছনে যারা ছিলেন—তারা কারা? তারা হলো গত ১৭ বছরে দল এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু মন্ত্রি, উপদেষ্টা, জেলা-উপজেলার ক্ষমতাসীন নেতা এবং আমলারা, যারা জনগণের দুঃখ-কষ্ট নয়, বরং নিজেদের ‘মুনাফার’ হিসাব কষতেই ব্যস্ত থেকেছেন। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল—দেশের প্রতিটি অঞ্চলে দেখা যায়, দুর্নীতি, দলীয় কোন্দল, ক্যাডার নির্ভরতা আর গোষ্ঠীবাজি দলকে তিলে তিলে ধ্বংস করেছে।এক সময় যে আওয়ামী লীগ ছিল শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-জনতার দল, আজ সেই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে ঠিকাদার-প্রকল্প-কমিশনের দল। একদিকে ‘উন্নয়ন উন্নয়ন’ বলে মুখে ফেনা তুলছে, অন্যদিকে সেই উন্নয়ন যে জনগণের উপর কত বড় বোঝা তৈরি করেছে, তার দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। স্কুল-কলেজে নিয়োগ বাণিজ্য, মেডিকেলে ভর্তি দুর্নীতি, ব্যাংক খাতের লুটপাট, এবং বেপরোয়া ঋণের বোঝা—সবই হয়েছে এই দীর্ঘকালীন শাসনের সময়। যে আওয়ামী লীগ একসময় মানুষকে আশ্রয় দিত, আজ তারা জনগণের ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ চুপ, ভয়ভীত। নির্বাচন মানেই এখন প্রহসন। একতরফা, ভোটারবিহীন ‘নির্বাচনী নাটক’ দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে। এ দায় কোনো সাধারণ কর্মীর নয়—এ দায় নেতৃত্বের। তারা চাইলেই সুস্থ সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পারতেন। কিন্তু তারা নিরাপদ ছিল অন্ধ আনুগত্য, দুর্নীতির ভাগ এবং মতপ্রকাশ দমনের চর্চায়।
আওয়ামী লীগের এই আত্মধ্বংসী পথ থেকে ফিরে আসা এখনও সম্ভব, তবে এর জন্য চাই—চোখে চোখ রেখে সত্য বলা, আত্মসমালোচনার সাহস, এবং পুরনো দিনের আদর্শিক নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া। দল বাঁচাতে হলে এখনই সময়—আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে ভাবার।
আওয়ামী লীগ প্রশ্নবিদ্ধ—কারণ তারা নিজেদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তারা ইতিহাস রচনা করেছিল, এখন নিজেরাই সেই ইতিহাস মুছে ফেলতে বসেছে। তবে ইতিহাস যেমন ন্যায় বিচারে নিরপেক্ষ, তেমনি নির্মমও। কেউ ইতিহাসকে মুছে ফেলতে পারে না, ইতিহাসই ঠিক করবে—কে রইবে শ্রদ্ধায়, আর কে থাকবে কলঙ্কে। তাই দল রক্ষা করতে হলে নেতা বেছে নিতে হবে, আবার আদর্শে ফিরে যেতে হবে।
আওয়ামী লীগ প্রশ্নবিদ্ধ—এটা সত্য। তবে ইতিহাসের প্রশ্নে তার অগ্রগণ্য ভূমিকাও অমোচনীয়—এটাও চিরন্তন সত্য।

Share This Article
Leave a Comment