মো.কামাল উদ্দিনঃ
বন্ধু মহসিন—জুমার নামাজে সিজদারত অবস্থায় প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন চিরনিদ্রায়।
এশার নামাজের পর, হাজারো হৃদয়ের হাহাকারে মুখরিত হল মসজিদ প্রাঙ্গণ।
শেষ জানাজা—আকাশভাঙা কান্নায় ভিজল বাতাস, ভিজল হৃদয়।
অশ্রুসিক্ত চোখে, ভালোবাসা আর প্রার্থনায় মোড়া এক শবযাত্রা শেষে,
নিজ পারিবারিক কবরস্থানে নিস্তব্ধ মাটির বুকে শোয়ানো হল তাঁকে—
চিরস্মৃতির, চিরবেদনার এক অবিনশ্বর অধ্যায় হয়ে। অশ্রুভেজা স্মৃতির পাতায়—বন্ধু মহসিন-: কি লিখবো- তোমাকে নিয়ে, তবুও আমি তোমাকে নিয়ে কিছু কথা লেখার জন্য
আজ কলম ধরেছি, কিন্তু শব্দেরা যেন বারবার কাঁপছে… চোখ ভিজে যাচ্ছে অজান্তেই। বন্ধু মহসিন, আমার হৃদয়ের এক অংশ, আজ নেই—এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া অসম্ভব এক যন্ত্রণা। বুকের গভীরে জমে আছে এক অপূরণীয় শূন্যতা, এক নিঃসীম হাহাকার। যে মানুষটা প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে হঠাৎ করেই এক অনন্য আলো হয়ে জ্বলে উঠত, আজ সেই আলো নিভে গেছে। মহসিন ছিল শুধু বন্ধু নয়, ছিল এক আত্মার সঙ্গী। তার কলম ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার, তার কণ্ঠ ছিল মানুষের কথা বলার সাহসী ভাষা। সেই বন্ধুর চলে যাওয়া যেন আমার হৃদয়ের একখণ্ড ছিঁড়ে নিয়ে গেল। আজ এই শোকের মুহূর্তে, চোখের জল আর বুক ভরা কান্না নিয়ে আমি লিখতে বসেছি—তাকে নিয়ে, আমাদের দিনগুলোর কথা নিয়ে, আর কিছু অপূর্ণ অপেক্ষার বেদনা নিয়ে। জুন মাসের ১৩ তারিখ পবিত্র শুক্রবার। এখনো শহরের অলিগলি তখন কোরবানির ব্যস্ততা রয়েছে । মানুষজন মসজিদে জুমার নামাজে শামিল হয়েছে,সেই জুমার নামাজেরত ঠিক এই সময়, যখন আকাশ প্রার্থনার শব্দে মুখর, মসজিদে একাগ্রতা ও নিবেদন ঝরে পড়ছে সেজদায়—আমার হৃদয়ের খুব কাছের মানুষ, বন্ধু, সহযোদ্ধা এবং সহমর্মী মঈনউদ্দীন মহসিন নামাজরত অবস্থায় পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে নীরবে, নিঃশব্দে, চিরতরে চলে গেলেন। জীবন থেমে যায় না। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু সময়ের বুকে এমন দাগ কেটে দেয়, যেখান থেকে ফেরা আর সম্ভব হয় না। মহসিনের মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি যেন মুহূর্তেই বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। কথা হচ্ছিল, হাস্যরসের মধ্যেও ছিল জীবনের গভীর বেদনার ভাগাভাগি। কে জানত সেই কথাই হবে শেষ কথা?
আমাদের সম্পর্ক ছিল আত্মার সম্পর্ক। আমরা দুজনেই জীবনে এমন এক যন্ত্রণা বয়ে বেড়িয়েছি যা শুধুমাত্র ভুক্তভোগীই বোঝে। মহসিন তার দুই ভাইকে মব জাস্টিসের নির্মমতায় হারিয়েছিল। আমি হারিয়েছি আমার ছোট ভাই আকতারকে—যার লাশও আমি পাইনি। আমাদের এই অদৃশ্য যন্ত্রণা এক অদ্ভুত বন্ধনের সৃষ্টি করেছিল। জীবনের সব বন্ধুত্বের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের এই সম্পর্ক—একান্ত, নির্মল, গভীর। মহসিনের একটি মিষ্টি স্বপ্ন ছিল। সে চেয়েছিল আমার মেয়েকে তার ছেলের বউ করে আনবে। আমাকে সে সবসময় ডাকত ‘বেয়াই’। এই ডাকের মধ্যে ছিল গভীর ভালোবাসা, আস্থা ও আত্মীয়তার এক অমলিন সুর। তার মুখে আমার নাম উচ্চারণে এক গর্ব অনুভব করতাম। যেখানে-সেখানে বলত—“এই কামাল ভাই আমার বন্ধু না, আত্মার আত্মীয়।”
আমাদের বন্ধুত্বের পরিধি চার দশকেরও বেশি। শুধু সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক নয়—সাহিত্য, সংস্কৃতি, আন্দোলন, সংগঠন—প্রতিটি জায়গায় আমরা ছিলাম পরস্পরের ছায়াসঙ্গী। চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলন থেকে শুরু করে নাগরিক ফোরামের রাজপথের প্রতিটি পদক্ষেপে মহসিন ছিল আমার সঙ্গে। সে ছিল প্রচণ্ড ভালো লেখক। অনেকেই তাকে রাজনীতিক মনে করত, কিন্তু আমি জানতাম—তার কলমেও ছিল বিপ্লব।
মহসিন তার লেখা দেখাত আমাকে। বলত, “বন্ধু, তুমি না দেখে দিলে তো শান্তি পাই না।” এই একান্ততা, এই নির্ভরতা, আজ আমার চারপাশে নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া বইটা—“গণমানুষ: গণতন্ত্রের প্রকৃত তত্ত্বাবধায়ক”—সে নিজ হাতে আমাকে দিয়েছিল। বলেছিল, “একটা আলোচনা লিখে দিও বন্ধু।” আমি কথা দিয়েছিলাম, কিন্তু আজ সে নেই। আজ আমি লিখছি, কিন্তু তাকে আর পড়ে শোনাতে পারব না।
বইটি পড়তে গিয়ে বারবার বিস্মিত হয়েছি। এই বই যেন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক লেখকের লেখা নয়—এ যেন এক গণমানুষের হৃদয় থেকে লেখা, সাহস, যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ, ইতিহাসের অজানা অলিগলি থেকে তুলে আনা এক একটি সত্য।
বইটির সূচিপত্রেই তার চিন্তার গভীরতা স্পষ্ট: পূর্বকথন,অনপেক্ষ সময় ও নদীস্রোত,বঙ্গবন্ধু: হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি,বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেনারেল জিয়ার উত্থান,জাতির জনক ও জিয়া কি সমকক্ষ?এরশাদের আবির্ভাব,হাত ধরাধরি করে এলো গণতন্ত্র ও তত্ত্বাবধায়ক
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা,প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা,বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনে নারী,আমাদের গণতন্ত্র: স্বপ্ন ও বাস্তবতা,খোলা চিঠি: জননেত্রী শেখ হাসিনাকে,মহসিন বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে এই বইটি রচনা করলেও, এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘গণমানুষ’। সেই মানুষ, যারা প্রতিনিয়ত রাজনীতির খেলায় নিপীড়িত হয়, বঞ্চিত হয়, ব্যবহৃত হয়। বইটিতে ১৯৭১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও সাফল্যের বিশ্লেষণ রয়েছে অসাধারণ সাবলীলতায়। মহসিনের জন্ম ১৮ আগস্ট ১৯৬৫ সালে। তার বাবা এম. এ. সবুর ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহচর ও চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। রাজনীতি যেন তার রক্তে ছিল। কিন্তু সে রাজনীতিকে বেছে নেয়নি—রাজনীতি তাকে বেছে নিয়েছিল। সে বিশ্বাস করত, রাজনীতি রুটি-ভাতের মতোই প্রয়োজনীয়। তার রাজনীতি ছিল নিঃস্বার্থ, নিঃশব্দ, কিন্তু প্রগাঢ়।
তার আগের দুইটি কাব্যগ্রন্থ—“মুক্তির মিছিলে” (২০০১) ও “ডেথলাইন বাংলাদেশ: যখন সন্ত্রাস এলো” (২০০৭)—সুধীমহলে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এই সাম্প্রতিক গ্রন্থ ছিল তার ভাবনার শুদ্ধতম সঞ্চয়ন। তাকে বলা হতো “প্রতিবাদী কবি”—কারণ সে প্রতিবাদ করত হৃদয়ের অন্তর থেকে, কলমের শক্তিতে। সে ভয় পেত না, চুপ থাকত না, নত মাথা করত না। যখন সবাই চুপ করে থাকত, তখনও সে বলত—“এই দেশটা আমাদের, এই গণতন্ত্রটা আমাদের।” আজ মহসিন নেই। এই নেই বলেই যেন চারপাশটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা মনে হয়। আজ আমি আছি, কাল হয়তো আমিও থাকব না। কিন্তু এই বন্ধুর স্মৃতি, তার লেখা, তার ভাবনা—সবই থেকে যাবে আমার হৃদয়ের অমলিন এক কোণে। তার এই বই একদিন পাঠ্যসূচিতে জায়গা করে নেবে কিনা জানি না। তবে ইতিহাস তাকে খুঁজে নেবে। তার লেখা, তার বিশ্বাস, তার সাহসিকতা ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবে। আমরা যারা মহসিনকে কাছ থেকে দেখেছি, জানি—সে ছিল বড় মনের মানুষ। কোনো সংকীর্ণতা ছিল না তার চিন্তায়। সে ভালোবাসতে জানত, সম্মান করতে জানত, এবং বিশ্বাস করতে জানত। তার বন্ধুদের নিয়েই সে গর্ব করত। আমাকে নিয়েও করত, যতটা গর্ব করে কোনো বড় ভাই তার ছোট ভাইয়ের অর্জনে করে। আজ আমি বসে আছি, চোখের কোনে জমে থাকা অশ্রু নিয়ে লিখছি এই বন্ধুর জন্য। মহসিন, তুই ছিলি শুধু বন্ধু না—তুই ছিলি আত্মার সঙ্গী। তোকে হারিয়ে আমি শুধু একজন মানুষ হারাইনি—হারিয়েছি আমার জীবনের এক অধ্যায়। তুই যেইভাবে বিদায় নিলি—নামাজরত অবস্থায়, পবিত্র এক শুক্রবারে—তা শুধু তোর ঈমানের গুণকেই নয়, তোর জীবনের সারল্য আর সততার প্রতীক হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
আমার বুকের গভীর থেকে শুধু এইটুকু বলতে পারি— ভালো থেকো বন্ধু,
ভালো থেকো মহসিন।
তোর স্বপ্নগুলো আমি বয়ে নিয়ে যাবো যতদিন বাঁচি।
তোর লেখা আমি ছড়িয়ে দেবো যতদূর যেতে পারি।
তুই নেই,
কিন্তু তোর কথাগুলো এখনও বাতাসে ভেসে বেড়ায়—
“এই দেশটা আমাদের, এই গণতন্ত্রটা আমাদের।