নিষ্ঠুর ঘাতকের বলি মিতু: দুটি অবুঝ শিশুকে মায়ের বুক থেকে ছিনিয়ে নেওয়া এক নির্মম সকালপ্রসঙ্গ: মাহামুদা আক্তার মিতু হত্যা

5 Min Read

মো. কামাল উদ্দিন
আমরা প্রতিদিন অসংখ্য কথা বলি, অসংখ্য কথা লিখি। কিছু কথা মনের খোরাক, কিছু প্রয়োজনের প্রকাশ। কিছু লেখা জন্ম নেয় আবেগ থেকে, কিছু বিবেকের তাড়নায়, কিছু আবার জন্ম দেয় ব্যথা আর অসহায় কান্নার। আমি একজন অক্ষরজীবী, লেখাই আমার জীবন, লেখাই আমার প্রতিবাদ, আমার অস্তিত্বের হাতিয়ার। জীবনের অনেক মুহূর্তেই কলম ধরেছি হৃদয়ের রক্ত দিয়ে—যেমন ধরেছিলাম আমার ছোট ভাইয়ের নিখোঁজের খবর পেয়ে, যেমন ধরেছিলাম তনু, সীমা, ইয়াসমিনদের হত্যাকাণ্ডে, যেমন ধরেছিলাম আমার সন্তানের মুখের ব্যথা, মায়ের কান্না বা বোনের আর্তনাদ শুনে। তবে মাহামুদা আক্তার মিতুকে নিয়ে আজকের এই লেখা আমার হৃদয়ের গভীরতম এক ব্যথার বহিঃপ্রকাশ। লেখাটি যতবার লিখতে বসি, চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। কলম কাঁপে, বুক ভার হয়ে আসে।
২০১৬ সালের ৫ই জুন। দিনটি ছিল রমজান মাসের প্রথম দিন। ভোরে মা ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাচ্ছিলেন। সময়টা সকাল ৬টা ৩৫ মিনিট। চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ের কাছে, নিজ বাসার কাছেই মিতু খুন হলেন—তাঁর অবুঝ শিশুর সামনে। গুলি করে, ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে, রাস্তার ওপর রেখে ঘাতকেরা মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে গেল। পুরো ঘটনা যেন এক সিনেমার দৃশ্য, কিন্তু সেটি ছিল নির্মম বাস্তবতা। মিতু কে ছিলেন?মাহামুদা আক্তার মিতু ছিলেন একজন সাধারণ গৃহিণী, ধর্মপ্রাণ, বুদ্ধিমতী, বিনয়ী নারী। সমাজের চোখে তিনি পরিচিত ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী হিসেবে, কিন্তু তার নিজের জীবন ছিল নির্ভরতার প্রতীক। সংসার, সন্তান, স্বামী—সবকিছুই ছিল তাঁর জগৎ। তাঁর পবিত্রতা, শান্ত স্বভাব ও ধর্মানুভূতি ছিল মূর্ত এক মুসলিম নারীত্বের পরিচয়।
বাবুল আক্তার – এক সৎ অফিসার, এক পরাজিত স্বামী
বাবুল আক্তারকে আমি দীর্ঘদিন ধরে চিনতাম। কোতোয়ালি থানার এসি হিসেবে, হাটহাজারি সার্কেলের এসপি হিসেবে, কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনকালে ও পরবর্তীতে মিডিয়ায় সক্রিয়ভাবে সন্ত্রাস বিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী একজন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁকে শ্রদ্ধা করতাম। তিনি দেশপ্রেমিক ছিলেন, ছিলেন সৎ, নির্ভীক।
তাঁর বিরুদ্ধে জঙ্গিদের বহুবার রোষানলে পড়ার ইতিহাস রয়েছে। এমনকি শোনা যায়—তিনি এবং তাঁর পরিবার হুমকির মধ্যেও ছিলেন। কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—এই হুমকির বাস্তবতায় কেন তিনি নিজের পরিবারের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন না? কেন একটিমাত্র এসএমএসের ভিত্তিতে বাসা থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে গেলেন, স্ত্রী ও সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই?
একটি বুলেট, দুটি শোকবিধুর চোখ- ঘাতকেরা যখন গুলি করছিল, মিতুর ছোট সন্তান তাঁর পাশেই ছিল। সেই অবুঝ চোখে কি সে দৃশ্য এখনো জেগে ওঠে? কীভাবে ভুলে যাবে সে সকালটা? মা রক্তে ভেসে পড়লেন, আর সন্তানের জীবন থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মুখটি হারিয়ে গেলো। সন্তান দুটি আজ বড় হয়ে উঠছে, কিন্তু এই বেদনার স্মৃতি কি তাদের শৈশব থেকে মুছে দেওয়া সম্ভব?
একজন মাকে হারানোর যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একমাত্র মা-ই পারে তার সন্তানকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে। মিতু ছিলেন সেই মা—যিনি সন্তানদের শিক্ষিত, ভদ্র, ধর্মীয় অনুশাসনে গড়া মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছিলেন। সেই মা-ই যদি সন্তানের সামনে খুন হন, তাহলে আর কিছু বলার থাকে না।প্রশাসনের ব্যর্থতা ও আমাদের প্রশ্ন- মিতু হত্যাকাণ্ড এক গভীর প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর। একজন জঙ্গি বিরোধী কর্মকাণ্ডে নিবেদিত, প্রকাশ্য হুমকির শিকার পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী যদি নিজ এলাকায়, নিজের বাসার সামনেই নিরাপত্তাহীনতার বলি হন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? কারা ছিল এই হত্যার নেপথ্যে? কারা তাদের নির্দেশ দিয়েছে? কেন পুলিশ আগে থেকে ঘাতকদের গতিবিধি নজরে আনতে পারলো না? ঘটনার পর বহু নাটকীয়তা আমরা দেখেছি—প্রথমে বলা হলো, জঙ্গিরা খুন করেছে। পরে তদন্তের মোড় নিলো বাবুল আক্তারকেই সন্দেহভাজন করে। জিজ্ঞাসাবাদ, গ্রেপ্তার, আবার জামিন, আবার মামলা। এক সময় বাবুল আক্তার নিজেই স্ত্রী হত্যায় অভিযুক্ত হন! অথচ প্রথম থেকেই তিনিই ছিলেন বিচারপ্রার্থী। সত্য আজও ধোঁয়াশায় ঢাকা।
বিচার কি একদিন হবে?
আমরা বিশ্বাস করতে চাই—সত্য একদিন প্রকাশ পাবেই। ঘাতকরা ধরা পড়বে। বিচার হবে। কিন্তু তাতে কি মিতু ফিরে আসবে? তার সন্তানরা কি ফিরে পাবে মায়ের ভালোবাসা? না, কখনো না। এই ক্ষত কোনো রায়, কোনো শাস্তি পূরণ করতে পারে না। একজন লেখকের যন্ত্রণা ও অভিশাপ-এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমার কলম কাঁপছে। এ যেন কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা নয়—এ যেন আমাদের চারপাশের অসহায়ত্ব, হিংস্রতা, ন্যায়ের অভাব, এবং মানবিকতাহীন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমি জানি না কে অপরাধী, কে নির্দোষ। কিন্তু জানি—যে-ই হোক, এমন হত্যার বিচার হতেই হবে। নির্দোষ শিশুদের মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও এই হত্যাকাণ্ডের জবাব দিতে হবে রাষ্ট্রকে।
যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে—তারা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের ধরা পড়তেই হবে। আল্লাহর বিচার আছে, মানুষের বিবেক আছে। আমরা চুপ থাকবো না। আমরা লিখে যাবো, বলেই যাবো—যেন আর কোনো মিতুর রক্ত রাস্তায় ঝরে না পড়ে।
এই লেখাটি আমার বিবেকের, আমার সন্তানের প্রতি ভালোবাসার, আর একজন নারী হত্যার বিরুদ্ধে এক সোজাসাপ্টা অভ্যুত্থান। যদি এই লেখা কাউকে ভাবায়, কাউকে নাড়া দেয়, তবেই আমার কলমের দায়িত্ব পূর্ণ হলো।

Share This Article
Leave a Comment