মো.কামাল উদ্দিনঃ
এই সমাজে এখনো নারীর পথ সহজ নয়। কাগজে-কলমে সমানাধিকারের বুলি যতই শোনা যাক, বাস্তবতা আজো গড়ে ওঠেনি এক নির্মল, নির্ভার পথচলার চিত্র। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায়, যেখানে প্রতিদিন মাঠে নামতে হয়, প্রশ্ন ছুড়তে হয়, সত্যের খোঁজে ছুটে বেড়াতে হয়— সেখানে একজন নারীর দৃপ্ত পদচারণা আজও অনেকের কাছে বিস্ময়ের। আর সেই বিস্ময়কে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন চট্টগ্রামের গর্ব, দীপ্ত টিভির চট্টগ্রামে দায়িত্বরত নারী সাংবাদিক রুনা আনসারী। রুনা আনসারী— একা নন, তিনি এক অনুপ্রেরণা, এক আন্দোলন, এক স্বপ্নের দিশারী। দীপ্ত টিভির হয়ে চট্টগ্রামের রাজপথে, প্রশাসনিক কার্যালয়ে, অচেনা গ্রামে কিংবা আলো-অন্ধকারে ঘেরা অপরাধজগতের কোণে ছুটে চলা তার দৃঢ় কণ্ঠ আর সাহসী দৃষ্টিতে আমরা দেখতে পাই— নারীর অদম্য শক্তি। তিনি কেবল একজন সংবাদকর্মী নন, বরং চট্টগ্রামের নারী সাংবাদিকতার এক উদ্ভাসিত মুখ, যে মুখ থেকে উঠে আসে সাহসের গল্প, সংগ্রামের কথা, আর প্রেরণার ছায়াপাত।
চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে যদি ফিরে তাকাই— নব্বই দশকের মাঝামাঝি কিংবা তারও আগে— নারী সাংবাদিক বলতে বোঝাত কিছু মুখ, যারা পত্রিকার ডেস্কে সীমিত জায়গায় কাজ করতেন। মাঠে নামা, সংবাদ সংগ্রহ করা কিংবা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে রিপোর্টিং করাটা তখন নারীদের জন্য একপ্রকার অচিন কল্পনা ছিল। অনেকটা অসম্ভবের মতো শোনালেও, সময়ের বাঁক বদলে এনেছে যে কয়টি সাহসী নারী— তাদের মধ্যে রুনা আনসারী একজন প্রধান নাম।
টেলিভিশন চ্যানেল যখন দেশের গণমাধ্যম জগতে নতুন মাত্রা এনে দিল, তখনও চট্টগ্রাম ছিল পিছিয়ে। ঢাকায় কিছু নারী রিপোর্টার মাঠে নামলেও চট্টগ্রামের নারীরা তখনো দ্বিধাগ্রস্ত, ভয় আর সমাজের ছায়াতলে বন্দি। সেই ভয় কাটিয়ে, সেই ছায়া ফুঁড়ে এগিয়ে এসেছেন রুনা। দৃপ্ত পদক্ষেপে, আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ উচ্চারণে, তিনি মাঠের ভিড়ে দাঁড়িয়ে বলেছেন— “আমি পারি”।
তার কথায়, তার রিপোর্টে, তার চোখে ফুটে ওঠে সমাজের বাস্তবতা। একজন নারী হয়ে দুর্নীতির গভীরে ঢুকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা, অপরাধের খবর সংগ্রহ করা কিংবা রাজনীতির চোরাগলি থেকে তথ্য টেনে আনা— এসব কাজ করতে গিয়ে রুনা প্রতিনিয়তই লড়েছেন। কখনো সামাজিক কটূক্তি, কখনো প্রশাসনিক বাধা, কখনো সহকর্মীদের অবহেলা— কিন্তু কোথাও থেমে থাকেননি তিনি। বরং প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা তার জন্য হয়ে উঠেছে চ্যালেঞ্জ, যেটাকে জয় করেই তিনি আজকের অবস্থানে।
রুনা আনসারীর এই সংগ্রাম ও সাফল্য আমাদের নারীদের চোখে এক নতুন স্বপ্নের ছবি এঁকে দেয়। আজ অনেক তরুণী, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা পড়ে বের হচ্ছে, তারা রুনার পথ অনুসরণ করছে। তারা বিশ্বাস করছে— এই পেশায় নারীর উপস্থিতি শুধু সম্ভবই নয়, বরং অপরিহার্য। কারণ, নারীর কণ্ঠে সত্যের উচ্চারণ হয় আরও সংবেদনশীল, আরও মানবিক, আরও হৃদয়ছোঁয়া। নারী সাংবাদিকেরা যখন অপরাধ, দুর্নীতি বা মানবপাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেন বা মাইক্রোফোনে কথা বলেন, তখন সেটি হয়ে ওঠে সমাজের বিবেক।
রুনার চট্টগ্রামে অবদান এখানেই সীমিত নয়। তিনি প্রমাণ করেছেন— সাংবাদিকতা মানেই শুধু খবর দেয়া নয়, এটি সমাজ গঠনের এক মহান দায়িত্ব। আর সে দায়িত্ব নারীরাও সমানভাবে নিতে পারে, যদি থাকে সাহস, নিষ্ঠা ও প্রস্তুতি। আমরা যারা বিয়ে বা সরকারি চাকরির অপেক্ষায় সময় হারাচ্ছি, তাদের রুনার জীবনের দিকে তাকানো দরকার। কারণ, রুনার জীবন বলে— অপেক্ষা নয়, এগিয়ে যাওয়ার সময় এখন।
আমি বহু দেশ ঘুরে দেখেছি— নিউ ইয়র্ক থেকে টোকিও, লন্ডন থেকে কায়রো— নারী সাংবাদিকেরা প্রথম সারিতে কাজ করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে, অভিবাসী শিবিরে, পার্লামেন্ট ভবনের সামনে, বা আদালতের প্রাঙ্গণে— তারা তাদের সৎ প্রশ্ন আর তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ দিয়ে সমাজ বদলাচ্ছে। আমাদের দেশে কেন পারবে না? পারবে— যদি আমরা রুনা আনসারীদের মতো পথচলার সাহস রাখি।
সবশেষে বলবো, রুনা আনসারী এক আলো— যিনি নিজে জ্বলছেন, আবার অন্যদের আলোকিত করে চলেছেন। তার কাজ, তার অবস্থান, তার সংগ্রাম আমাদের জানিয়ে দেয়— নারী সাংবাদিকতা কেবল অলংকার নয়, এটি এখন সমাজ বদলের এক প্রভাবশালী অস্ত্র। চট্টগ্রামের প্রতিটি সাহসী মেয়ে যদি এই আলোকবর্তিকা থেকে প্রেরণা নেয়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ হবে আরও বেশি উদ্ভাসিত, আরও বেশি সুবিচারভিত্তিক, এবং অবশ্যই— আরও বেশি মানবিক।
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।