“মেয়ে শুধু মেয়ে নয়—কখনো মা হয়, কখনো জীবনদাত্রী বোন, কখনো আল্লাহ রহমত হয়ে ফিরে আসে”

4 Min Read

মো.কামাল উদ্দিনঃ
ইতিহাস মাঝে মাঝে এমন কিছু কাহিনি রচনা করে, যা শুধু ইতিহাসের পৃষ্ঠায় থেকে যায় না, বরং ছুঁয়ে যায় কোটি হৃদয়।
তেমনই এক সত্য গল্প ঘটে গিয়েছিল বহু শতাব্দী আগে, ইতালির রোম নগরীতে।
সেই গল্পের নায়ক একজন বৃদ্ধ—সিমন। আর গল্পের সবচেয়ে বড় আশ্চর্য চরিত্র, তার কন্যা পেরো। একদিন শহরের প্রহরীরা বৃদ্ধ সিমনকে গ্রেফতার করে রুটি চুরির অভিযোগে। তার দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অসহায়তা কিছুই বিবেচনায় আনা হয়নি। কঠোর রায় ঘোষিত হয়:
“তাঁকে অনাহারে মৃত্যুর অপেক্ষায় কারারুদ্ধ রাখা হবে।”
এ যেন কেবল দণ্ড নয়, এক নিষ্ঠুর মৃত্যুদান। সিমনের মেয়ে পেরো, সদ্য মা হয়েছেন। নিজের শিশুর দুধে তার স্তনভর্তি। হৃদয়ে বাবার জন্য সীমাহীন ভালোবাসা। তিনি পোশাকের নিচে লুকিয়ে খাবার নিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যান। কিন্তু কারারক্ষীরা তল্লাশি করে খাবার কেড়ে নেয়। তাকে হুমকি দেওয়া হয়—পুনরায় এমন করলে বাবার সঙ্গে দেখা করার অধিকারও থাকবে না।
তবুও পেরো থেমে যাননি।
বাবাকে দেখেন বন্দিশালায়, হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, শীর্ণ মুখে মৃত্যুর ছায়া। এক সন্তানসম মা তার বাবার মুখে তুলে দেন নিজের বুকের দুধ।
সেই দুধই হয়ে ওঠে সিমনের জীবনরস।
দিনের পর দিন এমনই চলে। কেউ টেরও পায় না, বাবার ক্ষীণ দেহে কীভাবে বেঁচে আছে প্রাণ। অবশেষে ধরা পড়ে যায় পেরো। পূর্বানুমানমাফিক পেরোর বিরুদ্ধে শাস্তির দাবিতে বিচার বসে। কিন্তু বিচারকগণ যখন জানলেন সত্য ঘটনা, তাঁরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
এ কেমন কন্যা! কী বিস্ময় তার ভালোবাসায়! নিজ সন্তানের খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন পিতা—এ যেন পিতৃভক্তির সীমা ছাড়িয়ে ঈশ্বরের আশীর্বাদস্বরূপ মাতৃত্ব।
এই ঘটনার পর পেরো ও তার বাবাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
সেই থেকে যুগে যুগে উচ্চারিত হয়:
“কন্যাসন্তান কেবল জন্ম দিয়ে চলে না—সে ধারণ করে, পালন করে, স্নেহে রাখে, ভালোবাসায় বাঁচায়। মা না হয়েও মা হয়।”
এই গল্পটি আজও মানুষের হৃদয়ে জেগে থাকে, কিন্তু আমি জানি—এটা শুধু রোমের কোনো দুর্গম জেলখানার গল্প নয়। এটা আমার নিজের জীবনেরও গল্প।
আমি একজন বাবা।
আমার দুটি মেয়ে আছে। তারা আমার জীবনের আলো। কিন্তু আজ আমি ফিরে যেতে চাই সেই শৈশবে, যখন আমার জীবনটা দুলছিল জন্ম-মৃত্যুর মাঝের এক সূক্ষ্ম সুতায়। আমার জন্মের সময় আমার মায়ের বয়স ছিল অনেকটাই বেশি।
আমি তার অষ্টম সন্তান।
সাত কন্যার পর আমার আগমন।
ততদিনে দুটি বড় বোন বিবাহিত, আমার মা ক্লান্ত, শীর্ণ, দুর্বল এক নারীর দেহে নতুন প্রাণ ধারণ করে ছিলেন কেবল কর্তব্যবোধে। কিন্তু সন্তানকে দুধ পান করাতে পারেননি। তার শরীরে তখন সেই শক্তি ছিল না। আমাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তখন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন আমার বড় বোন।
তিনি তখন সদ্য মা হয়েছেন।
নিজ সন্তানের সঙ্গে আমাকেও নিজের বুকে টেনে নিয়েছিলেন তিনি।
তার বুকের দুধেই আমি বেঁচে গিয়েছিলাম।
আজ আমি জানি, মা শুধু একজন নয়—কখনো কখনো বোনও মা হয়।
আমার সেই বড় বোন, আমার জীবনদাত্রী।
আমার মা, আমার অস্তিত্বের উৎস।
দুজনেই আজ প্রয়াত।
তাদের অদেখা স্নেহ, গভীর ভালোবাসা, আমার রক্তে বয়ে চলে।
তাই আমি যখন আমার নিজের মেয়েদের চোখে তাকাই, তখন শুধু সন্তান দেখি না—আমি দেখি সম্ভাবনা।
দেখি আগামী দিনের মা, আগামী দিনের জীবনদাত্রী। পেরোর মতো, আমার বোনের মতো, আমার মেয়েরাও হয়তো একদিন কারও জন্য বুকের ভিতরে আশ্রয় বয়ে আনবে। মেয়ে কখনো শুধু কন্যা নয়—
সে স্নেহময়ী, সে আশীর্বাদময়ী, সে কোনো এক ঈশ্বরী শক্তির নিঃশব্দ রূপ।
আমার এই লেখা একদিকে ইতিহাসের শ্রদ্ধাঞ্জলি, অন্যদিকে আমার জীবনের মমতার রোজনামা।
যে ভালোবাসায় আমি বেঁচে আছি, সে ভালোবাসার নাম হয়তো একদিন কেউ মনে রাখবে না।
কিন্তু আমি জানি, মা ও বোনের বুকের দুধে বেঁচে ওঠা জীবন কখনো অকৃতজ্ঞ হয় না।
আর আমি—সে জীবন।

Share This Article
Leave a Comment