“”ছোট্ট এক জীবন, হাজারো শিশুর মুক্তির স্বপ্ন: ইকবাল মাসিহ’র গল্প””

4 Min Read

মো.কামাল উদ্দিনঃ
আমাদের সময়ের সবচেয়ে অদেখা, অবহেলিত নায়কটির নাম—ইকবাল মাসিহ। যার শৈশব বলতে ছিল কেবল শেকল, শ্রম আর শোষণ। যার বয়স ছিল মাত্র আট, যখন তার বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর, সে মাত্র আট ডলার বা ৮০০ রুপিতে বিক্রি হয়ে যায় এক কার্পেট বয়ন কারখানায়। সেই বয়সে যেখানে শিশুরা স্কুলে যায়, খেলনা নিয়ে খেলে, সেখানে ইকবাল ঢুকে পড়ে অমানবিক পরিশ্রমের নরকে। সপ্তাহে ১২০ ঘণ্টা কাজ, দিনে প্রায় ১৭ ঘণ্টা—একটানা! যাতে পালাতে না পারে, তাই পায়ে পরানো হতো লোহার শিকল। একই পরিণতি ছিল আরও অনেক শিশুর। একটানা টানা-হেঁচড়ার জীবনে ইকবাল হয়ে উঠেছিল বন্দি, অথচ স্বপ্নদ্রষ্টা। দশ বছর বয়সে প্রথম সে পালিয়ে যায় সেই বন্দিদশা থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন তার ছায়াসঙ্গী। তিন দিনের মাথায় ধরা পড়ে আবার, এবার বিক্রি হয় ১০ ডলারে। বাড়ে কাজের ঘন্টা—সপ্তাহে ১৪০! কিন্তু এবার সে পালায় সিনেমার মতো রুদ্ধশ্বাস কায়দায়—মানববর্জ্য আর নর্দমার পথ বেয়ে। এইবার তার ঠিকানা হয় একটি এতিমখানা, যেখানে তত্ত্বাবধায়ক হাফেজ ইব্রাহীম তাকে ভর্তি করান স্থানীয় এক স্কুলে। ইকবাল ছিলেন বিস্ময়কর মেধাবী। পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন মাত্র দুই বছরে। কিন্তু শুধু লেখাপড়াই নয়, তার ভিতরে জন্ম নেয় আগুনের মতো এক শপথ—শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর, অন্য শিশুদের মুক্ত করার।
তাই সে যুক্ত হয় Bonded Labour Liberation Front (BLLF) নামে এক সংগঠনে। শুরু করে শিশুশ্রমে নিযুক্ত শিশুদের মুক্ত করার অভিযান। একে একে প্রায় তিন হাজার শিশু মুক্ত হয় তার সাহস, বুদ্ধি ও নেতৃত্বে।
১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে তাকে দেওয়া হয় Reebok Human Rights Award
তখন দাঁড়িয়ে ইকবাল বলেছিল—
“আমেরিকার আব্রাহাম লিংকন যেমন দাসত্ব বিলুপ্ত করেছেন, আমিও চাই, পৃথিবীর কোনও শিশুও যেন আর কারখানায় না থাকে। কেউ থাকবে স্কুলে, কেউ থাকবে শিকলে—এটা চলতে পারে না। আমি জানি ১৪০ ঘণ্টা কাজ করার যন্ত্রণা কেমন হয়। আমি করেছি, তাই বুঝি।” এ যেন আমাদের উপমহাদেশের এক Greta Thunberg—যিনি শিশু দাসত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলনের এক দীপ্ত নাম হয়ে ওঠেন। কিন্তু স্বপ্নবিরোধীরা তো কখনো ঘুমিয়ে থাকে না।
১৯৯৫ সালে বোস্টন থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পর, পাকিস্তানের লাহোর শহরের এক অলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় ইকবালের। মাত্র বারো বছর বয়সে—শুধু শিশুশ্রম বিরোধী আন্দোলনের কারণে।
এই মৃত্যু ছিল পরিকল্পিত, নির্মম এবং কাপুরুষোচিত।
কার্পেট মাফিয়ার ছোঁড়া গুলিতে থেমে যায় এক মহান বিপ্লবের সম্ভাবনা।
একজন শিশু যে তার মতো তিন হাজার শিশুকে মুক্ত করেছিল, সে যদি বেঁচে থাকত, আজ তার বয়স হতো চল্লিশের কাছাকাছি। হয়তো চল্লিশ লক্ষ শিশুর জীবন পাল্টে যেত। ২০০৯ সালে ইকবালের স্মরণে The Iqbal Masih Award প্রবর্তন করে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা তাকে কতটা মনে রাখি?
এক মিনিটের নাচ, এক গোল, এক ছক্কা ভাইরাল হয়, ট্রেন্ড হয়।
কারণ, বিনোদন এখন আন্তর্জাতিক খাবার। কিন্তু যে শিশু নিজের জীবন দিয়ে অন্য শিশুদের মুক্তির লড়াই করে, তার কথা থাকে প্রান্তিক, নির্বাক।
হাসিমুখে বলি—“বড়রা জানে, কে হিরো!”
কিন্তু আমরা ভুলে যাই, এই ছোট্ট শিশুটিও এক জীবন্ত হিরো।
ইকবাল আজ নেই। কিন্তু তার স্বপ্ন, তার সংগ্রাম, তার ত্যাগ—আমাদের চেতনায় আগুন জ্বালিয়ে রাখুক।
Hats off to you, The Little Hero…
তুমি ছিলে, তাই আমরা বুঝি—স্বপ্ন কখনো বয়স দেখে না। মুক্তি কখনো একা আসেও না, কেউ না কেউ তার জন্য জীবন দিয়ে যায়।

Share This Article
Leave a Comment