আন্দোলনের আগুনে রাষ্ট্রের শিরদাঁড়া: থানা–ফাঁড়ি পুড়িয়ে কোন ন্যায় প্রতিষ্ঠা?

0
186

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
সহিংসতার দিনগুলো আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—প্রতিবাদের নামে যদি থানা, ফাঁড়ি, পুলিশ লাইন, ট্রাফিক বক্স, তদন্তকক্ষ, রেকর্ডরুম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়; অস্ত্রাগার ভেঙে লুণ্ঠন করা হয়; দায়িত্বপালনরত পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয়—তবে সেটি কিসের আন্দোলন? গণতন্ত্রে আন্দোলন থাকবে, থাকবেই। কিন্তু গণতন্ত্রের ভাষা আগুন নয়, আইন; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়; ধ্বংস নয়, সংস্কার। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তর হাজারো নিহত পুলিশ সদস্যের তালিকা প্রকাশ করেছে। কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক—বিভিন্ন পদমর্যাদার মানুষ এই তালিকায়। তাদের কেউ ঢাকায়, কেউ সিরাজগঞ্জে, কেউ নোয়াখালী বা কুমিল্লায়—দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে এই শোকের মানচিত্র। সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি ৪৪টি পরিবারের ভেঙে পড়া আকাশ। থানা–ফাঁড়ি কেন রাষ্ট্রের শিরদাঁড়া একটি থানা শুধু একটি ভবন নয়। সেখানে থাকে সাধারণ ডায়েরি, মামলা রেকর্ড, নিখোঁজের তথ্য, জব্দ তালিকা, আদালতে পাঠানোর নথি, জবানবন্দি, ফরেনসিক নমুনা সংরক্ষণ, নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্ক, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা—অসংখ্য নাগরিক সেবার ধারাবাহিকতা। একটি ফাঁড়ি স্থানীয় বিরোধ মীমাংসার প্রথম দরজা। এগুলো পুড়িয়ে দিলে যে ক্ষতি হয়, তা কেবল ইট–সিমেন্টের নয়; তা ন্যায়বিচারের প্রমাণ নষ্ট হওয়া, নাগরিক নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি হওয়া, ভবিষ্যৎ অপরাধের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া।অস্ত্রাগার লুণ্ঠন আরও ভয়ংকর। লুণ্ঠিত অস্ত্র কার হাতে যায়—তার নিশ্চয়তা নেই। আজকের ক্ষোভ কাল অন্য কারও বুকে গুলি হয়ে ফিরতে পারে। তাই থানা–ফাঁড়ি জ্বালানো মানে নিজের পাড়ার নিরাপত্তাকেই আগুনে ছুড়ে দেওয়া। লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা—কোন বার্তা দেয়? সহিংসতার খবর এসেছে বিভিন্ন জেলা থেকে এনায়েতপুর, ঢাকা মহানগর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, হবিগঞ্জ, খুলনা, গাজীপুরসহ আরও এলাকা। কোথাও ভাঙচুর, কোথাও অগ্নিসংযোগ, কোথাও মারধর। এমনকি গর্ভবতী নারী পুলিশ সদস্যও রেহাই পাননি এই সংবাদ আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে: ইউনিফর্ম দেখেই কি মানুষকে শত্রু বানানো যায়? রাষ্ট্রের দায়িত্বপালনকারীকে টার্গেট করা কি ন্যায়সংগত?ইতিহাস সতর্ক করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন–এ ঘুমন্ত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ হয়েছিল—সেটি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের বেদনাময় অধ্যায়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চাই না; বরং চাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে দিলে শেষ পর্যন্ত নাগরিকই অসুরক্ষিত হন। “পুলিশের কি দোষ ছিল?”—প্রশ্নের জবাব পুলিশের কাজ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, মানুষের জানমালের হেফাজত, রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষা। তারা নিখুঁত নয়—কোনো প্রতিষ্ঠানই নয়। কোথাও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা আচরণগত বিচ্যুতি থাকলে তার জবাবদিহি অবশ্যই হবে। কিন্তু সেই জবাবদিহির পথ আদালত, তদন্ত, সংস্কার আগুন বা লাঠি নয়। ব্যক্তি অপরাধ করলে ব্যক্তির দায়; সমষ্টিগত শাস্তি গণতন্ত্রের ভাষা নয়। গণতন্ত্রের আন্দোলন কেমন হওয়া উচিত আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিক হলে শক্তিশালী হয়। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ সুস্পষ্ট দাবি আলোচনার প্রস্তাব আদালতে রিট গণস্বাক্ষর, মানববন্ধন, বিতর্ক এসব গণতান্ত্রিক পথ। সশস্ত্র সংঘর্ষ, থানায় হামলা, অস্ত্র লুণ্ঠন—এসব রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়; যা শেষ পর্যন্ত সমাজকেই ক্ষতবিক্ষত করে। তদন্ত ও ন্যায়বিচার—দুই দিকেই সহিংসতায় নিহত পুলিশ সদস্যদের ঘটনায় স্বচ্ছ, স্বাধীন ও দ্রুত তদন্ত জরুরি। কে উসকানি দিয়েছে, কারা পরিকল্পনা করেছে, কারা সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছে সবকিছু প্রমাণভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে, যদি কোথাও পুলিশি আচরণ নিয়ে অভিযোগ থাকে, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। ন্যায়বিচার একমুখী হলে আস্থা ফেরে না। পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায় হাজারো নিহত সদস্যের পরিবার আজ অনিশ্চয়তায়। ক্ষতিপূরণ, সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—এসব কেবল আর্থিক সহায়তা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়। শহীদ পরিবারের মর্যাদা রক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত। পুলিশ সংস্কার—সময়ের দাবি এই ট্র্যাজেডি আমাদের আরেকটি সত্য মনে করিয়ে দেয় পুলিশকে আরও আধুনিক, মানবিক ও কমিউনিটি-ভিত্তিক করতে হবে। ভিড় নিয়ন্ত্রণে উন্নত প্রশিক্ষণ বডি-ক্যামেরা ও প্রযুক্তি ব্যবহার মানবাধিকার শিক্ষার জোরদারকরণ কমিউনিটি পুলিশিং সম্প্রসারণ পুলিশ ও জনগণের আস্থা-সেতু যত মজবুত হবে, সহিংসতার ঝুঁকি তত কমবে। ঘৃণার ভাষা নয়, আইনের ভাষা সমষ্টিগতভাবে “পুলিশ”কে দোষী বা “আন্দোলনকারী”কে শত্রু বলা—দুই-ই বিপজ্জনক। ব্যক্তি অপরাধীর বিচার হবে; প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করা হবে; কিন্তু ঘৃণার রাজনীতি সমাজকে আরও বিভক্ত করে। আমাদের দরকার সংযত ভাষা, প্রমাণ ভিত্তিক আলোচনা, আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার। থানা–ফাঁড়ি জ্বালিয়ে, অস্ত্র লুণ্ঠন করে, দায়িত্বপালনরত সদস্যকে হত্যা করে কোনো ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয় না। এতে কেবল রাষ্ট্র দুর্বল হয়, নাগরিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। নিহত ৪৪ পুলিশ সদস্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা বলি—ন্যায়বিচার হোক আইনের পথে; সংস্কার হোক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে; আন্দোলন হোক শান্তিপূর্ণ ও যুক্তিনির্ভর। শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে যদি আমরা আইনের শাসনকে আরও দৃঢ় করতে পারি, তবে এই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি ধ্বংসে নয়—নির্মাণে। আজ সেই নির্মাণের অঙ্গীকারই হোক আমাদের সম্মিলিত পথ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here