**রূপনগর—ঢাকার নতুন রাসায়নিক বোমা!** **জনবসতি এলাকায় অবৈধ কেমিক্যাল মজুতের ভয়াবহতা**

0
209

পুরান ঢাকার নিমতলী ও চুড়িহাট্টার আগুন যেন ছিল সতর্কবার্তা—রাসায়নিকের অবৈধ গুদাম পুরো এলাকাকে রূপ দিয়েছে বিস্ফোরক বোমায়। এবার সেই একই ভয়াবহ চিত্র দেখা গেল মিরপুরের রূপনগরে, যেখানে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা শিয়ালবাড়িও পরিণত হলো “রাসায়নিক বোমায়”। মঙ্গলবারের অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের প্রাণহানিতে আবারও প্রকাশ পেল ঢাকার অব্যবস্থাপনার নির্মম সত্য। ২০১০ সালে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর শ্যামপুর ও মুন্সীগঞ্জে ‘কেমিক্যাল পল্লি’ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ১৫ বছরেও শেষ হয়নি সেই কাজ। এর মধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন আরও অনেকে। রূপনগরের ৩ নম্বর সড়কের দোতলা ভবনে গোপনে চালু ছিল ‘এম এস আলম ট্রেডিং’ নামে এক অবৈধ রাসায়নিক গুদাম। সেখান থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের পোশাক কারখানায়। নারীসহ ১৬ জন দগ্ধ হয়ে মারা যান, আর তিনজন এখনো বার্ন ইনস্টিটিউটে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। ফায়ার সার্ভিস জানায়, গুদামটি অবৈধ ছিল এবং সেটি উচ্ছেদের জন্য তিনবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয়নি। কর্মকর্তাদের মতে, সেখানে প্রাণঘাতী রাসায়নিকের মজুত ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ—রূপনগর ও আশপাশের এলাকায় কেমিক্যাল গুদাম বাড়ছে দ্রুত। ভবনের নিচতলা ভাড়া দিয়ে রাখা হচ্ছে রাসায়নিক, পেইন্ট ও প্লাস্টিক সামগ্রীর গুদাম হিসেবে, যেখানে নেই কোনো অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, বাতাস চলাচলের পথ, এমনকি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রও। স্থানীয় সাদ্দাম হোসেন বলেন, “আবাসিক এলাকায় এসব গুদাম আমাদের আতঙ্কে রাখে। সামান্য আগুনেই পুরো এলাকা শেষ হয়ে যেতে পারে—তার প্রমাণ তো দেখলাম।” ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে আগুন নেভানোর কাজ শুরু হয় এবং বুধবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণের পরও ধোঁয়ার সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাস বের হতে থাকে, এতে পাশের কারখানার শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত সরকারের সময় ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গুদাম উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও মিরপুরসহ অনেক এলাকা এখনো বিপজ্জনক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌহিদুল হক বলেন, “ঢাকায় মানুষ যেন এক বিশাল বোমার ওপর বসবাস করছে। প্রতিবার পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়, আর আমরা হারাই শ্রমজীবী মানুষকে।” শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ টাকা ও আহতদের ৫০ হাজার টাকা সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ অবৈধ কেমিক্যাল মজুতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের আহ্বান জানান। বিএনপি নিহত পরিবারের প্রতিটিকে ১ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিহতদের পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গভীর শোক জানিয়ে বলেছে, আগের তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যর্থতাই এ বিপর্যয়ের মূল কারণ। তারা আবাসিক এলাকায় দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ ও শ্রমজীবীদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। ঢাকা আবারও সতর্ক সংকেত পেয়েছে—রাসায়নিক বোমা সরাতে না পারলে শহর হয়তো একদিন নিজেই ছাই হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here