বেসরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিক বা মার্চেন্ট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম ও গ্রিড ব্যবহারের মাশুল নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার অবসান হয়েছে। গণশুনানি শেষে মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য ও জাতীয় গ্রিড ব্যবহারের মাশুল নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিতরণ সংস্থাগুলো মার্চেন্ট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৬ টাকা ৯৮ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৭ টাকা ১১ পয়সায় কিনবে। আগামী অক্টোবর থেকে এ হার কার্যকর হবে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিইআরসি। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মার্চেন্ট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে একক ক্রেতা হিসেবে বিদ্যুৎ কিনতে পারবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। ৩৩ কেভি সংযোগে প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ টাকা ৯৮ পয়সা এবং ১৩২ কেভি সংযোগে ৭ টাকা ১১ পয়সা। মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের (এমপিপি) উদ্যোক্তারা বড় গ্রাহকের কাছে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে উৎপাদক ও ক্রেতা নিজেদের মধ্যে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করবেন। তবে সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ব্যবহার করলে নির্ধারিত ‘ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ’ দিতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহকের সংযোগের ধরন অনুযায়ী এই মাশুল প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২২ পয়সা থেকে ১ টাকা ৯০ দশমিক ৯৭ পয়সা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র সরাসরি জাতীয় গ্রিডে এবং গ্রাহক সরকারি বিতরণ সংস্থার মাধ্যমে যুক্ত থাকলে সঞ্চালন ভোল্টেজ অনুযায়ী মাশুল দিতে হবে। ২৩০ কেভিতে প্রতি ইউনিটে মোট মাশুল ১ টাকা ৫৯ দশমিক ৮৯ পয়সা, ১৩২ কেভিতে ১ টাকা ৬০ দশমিক ২৫ পয়সা এবং ৩৩ কেভিতে ১ টাকা ৬০ দশমিক ৯৭ পয়সা। এই মাশুলের মধ্যে সঞ্চালন, বিতরণ, বিদ্যুতের হিসাব ব্যবস্থাপনা ও বিল নিষ্পত্তির খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সঞ্চালন মাশুল ২৩০ কেভিতে প্রতি ইউনিট ৩৭ দশমিক ৮৯ পয়সা, ১৩২ কেভিতে ৩৮ দশমিক ২৫ পয়সা এবং ৩৩ কেভিতে ৩৮ দশমিক ৯৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ গ্রহণের প্রান্তে বিতরণ মাশুল প্রতি ইউনিট ১ টাকা ১৭ পয়সা এবং হিসাব ব্যবস্থাপনা ও বিল নিষ্পত্তির জন্য আরও ৫ পয়সা দিতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহক সঞ্চালন ব্যবস্থার দুই প্রান্তে আলাদা বিতরণ সংস্থার আওতায় থাকলে অতিরিক্ত ৩০ পয়সা বিতরণ মাশুল দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে ২৩০ কেভিতে মোট মাশুল হবে ১ টাকা ৮৯ দশমিক ৮৯ পয়সা, ১৩২ কেভিতে ১ টাকা ৯০ দশমিক ২৫ পয়সা এবং ৩৩ কেভিতে ১ টাকা ৯০ দশমিক ৯৭ পয়সা। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহক একই বিতরণ সংস্থার আওতায় থাকলে অতিরিক্ত ৩০ পয়সা মাশুল দিতে হবে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রান্তে বিতরণ লসও আরোপ করা হবে না। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে এ হিসাবের ক্ষেত্রে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীন একটি সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে, একই বিতরণ সংস্থার আওতায় থেকে সঞ্চালন ব্যবস্থা ব্যবহার না করলে মোট মাশুল হবে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২২ পয়সা। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সঞ্চালন ও বিতরণ লসের হিসাবও প্রযোজ্য হবে। সঞ্চালন লসের জন্য পাওয়ার গ্রিডের প্রকাশিত মাসিক প্রকৃত গড় হার এবং বিতরণ লসের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভোল্টেজে সর্বশেষ সমাপ্ত অর্থবছরের অর্জিত হার কার্যকর হবে। বিতরণ সংস্থাভেদেও পৃথক মাশুল নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। পিডিবির জন্য প্রতি ইউনিট ৭০ পয়সা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের জন্য ১ টাকা ৪৩ পয়সা, ডিপিডিসির জন্য ৮৫ পয়সা, ডেসকোর জন্য ৯৯ পয়সা, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির জন্য ৮৭ পয়সা এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির জন্য ১ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। মার্চেন্ট কেন্দ্রের উৎপাদিত ও সরবরাহ করা বিদ্যুতের হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং বিল নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করবে পিডিবি। নির্ধারিত হারে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিল করার পর সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাকে তাদের প্রযোজ্য মাশুল অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করবে পিডিবি। ২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে মার্চেন্ট পাওয়ার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এর আওতায় এক এলাকায় স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্র সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ব্যবহার করে অন্য এলাকার বড় গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে। নীতিমালা অনুযায়ী, মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঘোষিত মাসিক উৎপাদনের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সরকারি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করা যাবে। বাকি বিদ্যুৎ বড় গ্রাহকদের কাছে সরাসরি বিক্রি করতে পারবেন উদ্যোক্তারা। এর আগে গত ২৩ আগস্ট মার্চেন্ট পাওয়ারের বিদ্যুতের দাম ও গ্রিড ব্যবহারের মাশুল নিয়ে গণশুনানি করে বিইআরসি। কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি সরকারি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করা সৌরবিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল। গণশুনানিতে বড় শিল্পগ্রাহক হারিয়ে রাজস্ব কমার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল পিডিবি ও কয়েকটি বিতরণ কোম্পানি। তাদের আশঙ্কা ছিল, শিল্পগ্রাহকেরা দিনে মার্চেন্ট সৌরবিদ্যুৎ কিনে রাতে আবার বিতরণ কোম্পানির বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন। অন্যদিকে উদ্যোক্তারা দাবি করেন, সঞ্চালন, বিতরণ ও অন্যান্য মাশুল বেশি হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।