প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ৩:৫৫ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ১২:১৭ পি.এম

কলম থেকে কারখানা, রাজপথ থেকে টেলিভিশন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন আন্দোলন থেকে বিশ্বভ্রমণ—পরিচয় বদলেছে বারবার, কিন্তু মানুষটি রয়ে গেছে একই ছবিটি ২০০৬ সালের। সময়টা ছিল আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের। তখন আমি চট্টগ্রাম বেকারি মালিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ছবিতে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছি—পেছনে সহযোদ্ধারা, সামনে বেকারি শিল্পের মালিকেরা। এটি নিছক কোনো পুরোনো ছবি নয়; আমার কাছে এটি একটি সময়ের দলিল, একটি আন্দোলনের স্মারক এবং আমার জীবনের ভিন্ন এক পরিচয়ের সাক্ষ্য।
আমি তখন শুধু বক্তৃতা করিনি—বেকারি শিল্পের মালিকদের অধিকার, মর্যাদা, ন্যায্য দাবি ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। আমার নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বেকারি শিল্পের সঙ্গে জড়িত বহু মালিক ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। সেই সময়ের আন্দোলন ছিল আমার কাছে কোনো ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের লড়াই নয়; বরং একটি সম্ভাবনাময় শিল্পখাতকে সংগঠিত, শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা। আজ বাংলাদেশের বেকারি শিল্প অনেক দূর এগিয়েছে। এই অগ্রযাত্রার পেছনে অসংখ্য উদ্যোক্তা, শ্রমিক, কারিগর ও শিল্পসংগঠকের অবদান রয়েছে। তবে সেই সময়ের আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে আমি মনে করি, চট্টগ্রামের বেকারি শিল্পের সংগঠিত আন্দোলনের ইতিহাসে আমারও একটি ছোট্ট অধ্যায় আছে। সেই কারণেই হয়তো কেউ ভালোবেসে, কেউ স্মৃতি থেকে, কেউবা মজা করে আমাকে আজও বলেন—‘বেকারি কামাল’। এই নামটি শুনে আমি কখনো বিরক্ত হই না। বরং হাসি। কারণ একটি নাম কখনো কখনো একটি ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত রূপ হয়ে যায়। কলম দিয়ে শুরু, শিল্পের ভেতর দিয়ে নতুন অধ্যায় আমার জীবনের মূল পরিচয় কিন্তু বেকারি ব্যবসায়ী নয়। আমার হাতে প্রথম উঠেছিল কলম।
১৯৮৭ সাল থেকে নিয়মিত লেখালেখি এবং ১৯৮৮ সাল থেকে সাংবাদিকতার জগতে পথচলা। ম্যাগাজিনে দিনের পর দিন লিখেছি। সংবাদপত্রে লিখেছি। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, চট্টগ্রামের উন্নয়ন, মানুষের অধিকার—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখেছি। সেই কলমের পথচলা আজও থামেনি।
কিন্তু সাংবাদিকতার পাশাপাশি জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য একসময় নেমে পড়লাম শিল্প ও ব্যবসার জগতে। ২০০৫ সালে ডিপ্লোমা ফুড প্রোডাক্ট ও বেকারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হলাম।
সাংবাদিকের কলম থেকে শিল্প উদ্যোক্তার জীবনে প্রবেশ—সহজ ছিল না। কারখানা, শ্রমিক, উৎপাদন, বাজার, কাঁচামাল, বিদ্যুৎ, পরিবহন, হিসাব—সবকিছু নতুন করে শিখতে হয়েছে।
আর সেই পথের সবচেয়ে বড় শিক্ষা?
ব্যবসায় সবসময় লাভ হয় না। কিন্তু সংগ্রামের মূল্য কখনো কখনো টাকার অঙ্কে মাপা যায় না।
বেকারি শিল্পে আমার প্রায় ৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
অনেকে হয়তো বলবেন—এ তো বিরাট ব্যর্থতা!
আমি বলব—হ্যাঁ, ব্যবসায়িক হিসাবে এটি বড় লোকসান। কিন্তু জীবন ও ইতিহাসের হিসাবে এটি আমার কাছে একটি মূল্যবান অভিজ্ঞতা।
কারণ আমি শুধু টাকা হারাইনি; আমি একটি শিল্পকে কাছ থেকে দেখেছি, শ্রমিকের ঘাম দেখেছি, উদ্যোক্তার সংগ্রাম দেখেছি, শিল্পের সমস্যা দেখেছি এবং সেই শিল্পের মানুষের জন্য রাজপথে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।
৭ কোটি টাকা হয়তো ফেরত আসবে না; কিন্তু সেই সময়ের স্মৃতি, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের ইতিহাস আর কোনোদিন হারাবে না।
‘বেকারি কামাল’—তাই আমার কাছে অপমান নয়, সম্মানের স্মৃতি
আজ কেউ যখন আমাকে ‘বেকারি কামাল’ বলেন, আমি তাদের ধন্যবাদ দিই।
কারণ তারা হয়তো জানেন না—এই একটি শব্দের সঙ্গে আমার জীবনের কতটা শ্রম, কতটা স্বপ্ন এবং কতটা আর্থিক ক্ষতি জড়িয়ে আছে।
ইতিহাস যখন বেকারি শিল্পের আন্দোলনের কথা বলবে, তখন শুধু কারখানার উৎপাদন, বিস্কুট-পাউরুটি কিংবা বাজারের পরিসংখ্যান দিয়ে সেই ইতিহাস পূর্ণ হবে না। সেখানে থাকবে সংগঠন, আন্দোলন, নেতৃত্ব, ঐক্য ও অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।
আর সেই ইতিহাসের কোথাও যদি লেখা হয়—‘বেকারি শিল্পের আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক কামাল উদ্দিন’, তাহলে সেটিই আমার জন্য বড় অর্জন।
মাটির কাছেও আমার আরেক পরিচয়
শুধু বেকারি নয়—আমার আরেকটি বড় জগৎ হলো কৃষি।
আমার একটি বড় কৃষি খামারও রয়েছে। কৃষির সঙ্গে আমার সম্পর্ক ব্যবসার হিসাবের চেয়েও বেশি আবেগের। মাটিতে বীজ বোনা, গাছের বেড়ে ওঠা, ফসলের অপেক্ষা—এসবের মধ্যে আমি অন্যরকম আনন্দ খুঁজে পাই।
কেউ যদি আমাকে ‘কৃষি কামাল’ বলতেন, সত্যি বলতে হয়তো আরও খুশি হতাম।
কারণ কৃষি শুধু উৎপাদন নয়—কৃষি জীবন, কৃষি মাটি, কৃষি মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত।
‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কামাল’—হয়তো এই পরিচয়টিও আমার ভালো লাগত
চট্টগ্রামের উন্নয়ন আন্দোলনের সঙ্গেও আমার সম্পর্ক আজকের নয়। ১৯৮৮ সাল থেকে চট্টগ্রামের উন্নয়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আছি।
এই শহরের জলাবদ্ধতা, যানজট, পরিবেশ, যোগাযোগ, অবকাঠামো, নদী-খাল, উন্নয়ন পরিকল্পনা, নাগরিক অধিকার—চট্টগ্রামের নানা সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন কথা বলেছি, লিখেছি, আন্দোলন করেছি।
অনেকে আমাকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের সংগঠক বলেন।
কেউ যদি ভালোবেসে ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কামাল’ বলতেন, সেটিও আমার কাছে আনন্দের পরিচয় হতো।
কারণ আমি বিশ্বাস করি—একজন মানুষ তার শহরের জন্য যতটা করতে পারে, সেটাই তার নাগরিক জীবনের অন্যতম বড় পরিচয়।
তারপর এলো বই—কলমের আরেক দীর্ঘ যাত্রা
বছরের পর বছর লিখতে লিখতে আমার নিজের বইয়ের সংখ্যা এখন ৩২টি।
প্রতিটি বই আমার জীবনের একটি সময়, একটি চিন্তা, একটি গবেষণা, একটি অভিজ্ঞতার দলিল। লেখালেখি আমার কাছে কখনো শুধু পেশা ছিল না; এটি ছিল আমার চিন্তার স্বাধীনতা এবং সমাজকে দেখার নিজস্ব জানালা।
বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ লেখক সংগঠন PEN International-এর সদস্য হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখক, সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ আমার দৃষ্টিকে আরও বিস্তৃত করেছে।
সেখান থেকেই কেউ কেউ আমাকে বলেন—‘লেখক কামাল’।
এই পরিচয়টিও আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
টেলিভিশনের পর্দায় আরেক কামাল
কলমের পাশাপাশি মাইক্রোফোনও আমার জীবনের সঙ্গী হয়েছে।
বাংলা টিভিসহ বিভিন্ন টেলিভিশনে দীর্ঘ বছর টকশো, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আলোচনামূলক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছি।
‘সচিত্র চট্টগ্রাম’, ‘কিছু কথা কিছু গান’সহ নানা অনুষ্ঠানে উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছি।
ফলে অনেকের কাছে আমি ‘টেলিভিশন উপস্থাপক কামাল’।
একজন মানুষের জীবনে একই সঙ্গে সাংবাদিক, লেখক, সংগঠক, উদ্যোক্তা ও উপস্থাপক—এই বহুমাত্রিক পথচলা হয়তো সহজ ছিল না। কিন্তু আমি কখনো নিজেকে একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখিনি।
বিশ্বভ্রমণ আমাকে দিয়েছে ‘পরিব্রাজক’ পরিচয়
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে পড়াশোনা, অনুসন্ধান ও গবেষণার প্রয়োজনে এবং নিজের কৌতূহল থেকে পৃথিবীর অসংখ্য দেশ ভ্রমণ করেছি।
নতুন দেশ, নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন সমাজব্যবস্থা—সবকিছু আমাকে শিখিয়েছে পৃথিবীকে একটু বড় করে দেখতে।
তাই কেউ আমাকে বলেন পর্যটক, কেউ বলেন পরিব্রাজক, কেউ বলেন গবেষক।
আমি সব পরিচয়কেই ভালোবাসি।
কারণ প্রতিটি পরিচয়ের পেছনে রয়েছে আমার জীবনের আলাদা একটি গল্প।
বক্তৃতার মঞ্চেও ছিল দীর্ঘ পথচলা
দেশ-বিদেশে শত শত সভা, সেমিনার, সম্মেলন ও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ হয়েছে।
কখনো নাগরিক অধিকার নিয়ে, কখনো চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিয়ে, কখনো সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম নিয়ে, কখনো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছি।
অনেকে সেই কারণে আমাকে ‘সেরা বক্তা’ বলেছেন। বিভিন্ন সময়ে বক্তব্যের জন্য পুরস্কারও পেয়েছি।
কিন্তু আমি মনে করি, একজন বক্তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো—তার কথা শেষ হওয়ার পরও মানুষ যদি তার কথা মনে রাখে।
অভিযোগের তকমাও কম জোটেনি
জীবনের পথে সম্মানের পাশাপাশি অপবাদও পেয়েছি।
পুলিশের অনেক কর্মকর্তা ও সদস্যের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক থাকায় কেউ কেউ আমাকে ‘পুলিশের দালাল’ বলেছেন।
আবার অপরাধ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি কিংবা নানা অনিয়মের বিষয়ে কথা বলা ও লেখালেখির কারণে উল্টো কেউ কেউ আমাকে ‘মাফিয়া ডন’, ‘সন্ত্রাসীদের গডফাদার’ কিংবা ‘সন্ত্রাসীদের পীর’ বলেও অভিহিত করেছেন।
এই বৈপরীত্য আমাকে কখনো খুব বেশি বিচলিত করেনি।
কারণ মানুষের দেওয়া তকমা দিয়ে একজন মানুষের সম্পূর্ণ জীবনকে বিচার করা যায় না।
আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হোক তথ্য, প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে। প্রশংসা যদি সত্য হয়, সেটিও থাকুক ইতিহাসের কাছে।
শেষ পর্যন্ত সব পরিচয়ের ওপরে—একজন মানুষ
আজ পেছনে ফিরে তাকালে দেখি—
কেউ আমাকে বেকারি কামাল বলেছেন,
কেউ সাংবাদিক কামাল,
কেউ লেখক কামাল,
কেউ উপস্থাপক কামাল,
কেউ গবেষক কামাল,
কেউ পরিব্রাজক কামাল,
কেউ চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের সংগঠক কামাল,
কেউ আবার দিয়েছেন আরও কঠিন ও বিতর্কিত কিছু তকমা।
কিন্তু এতসব নামের ভিড়ে আমার নিজের কাছে সবচেয়ে প্রিয় পরিচয়টি খুব সাধারণ—
আমি একজন মানুষ।
একজন মানুষ, যে স্বপ্ন দেখেছে।
ভুল করেছে।
ব্যর্থ হয়েছে।
আবার উঠে দাঁড়িয়েছে।
লাভ করেছে, লোকসানও করেছে।
প্রশংসা পেয়েছে, অপমানও সহ্য করেছে।
কলম ধরেছে, মাইক্রোফোন ধরেছে, রাজপথে দাঁড়িয়েছে, শিল্প করেছে, কৃষি করেছে, দেশ-বিদেশ ঘুরেছে, গবেষণা করেছে এবং সবচেয়ে বড় কথা—মানুষের সঙ্গে থেকেছে।
২০০৬ সালের এই ছবিটির দিকে তাকালে তাই শুধু একজন বক্তাকে দেখি না।
আমি দেখি আমার জীবনের একটি অধ্যায়কে।
দেখি সেই সময়ের উত্তাল বেকারি শিল্পের আন্দোলনকে। দেখি ঐক্যবদ্ধ উদ্যোক্তাদের মুখ। দেখি একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা। আর দেখি একজন মানুষকে—যে তখনও জানত না সামনে তার জীবনে আরও কত পরিচয় অপেক্ষা করছে।
আজও কেউ যদি আমাকে ‘বেকারি কামাল’ বলেন, আমি তাকে থামাব না।
বরং বলব—
ধন্যবাদ।
কারণ আমার জীবনের প্রায় ৭ কোটি টাকার লোকসান হয়তো আমার ব্যাংক হিসাবকে ছোট করেছে, কিন্তু বেকারি শিল্পের আন্দোলনে আমার ভূমিকার স্মৃতিকে ছোট করতে পারেনি।
আর ইতিহাসের কাছে সেটিই আমার সবচেয়ে বড় লাভ।
‘নাম বদলেছে বহুবার, পরিচয় হয়েছে অনেক; কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়—আমি একজন মানুষ, আর আমার জীবনের প্রতিটি পরিচয়ের পেছনে রয়েছে সংগ্রামের একটি করে গল্প।’