প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ৬, ২০২৬, ১১:৩০ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ২৭, ২০২৬, ৯:৫৫ এ.এম
ভুলের ভেলায় ভেসে জীবন লিখতে বসে করি ভুল

মো. কামাল উদ্দিন প্রিয় গোলাপ ফুল, হারাইলাম তিনকুল—এখন যেন খালকুল! লিখতে বসে করি ভুল। জীবনে কত ভুল করেছি, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ভুলের খাতা খুলে বসলে হয়তো আরেকটি জীবনও কম পড়ে যাবে। তবু একটি কথা দৃঢ়ভাবে বলা যায়—সবকিছুতে ভুল করা চললেও, ভুলকে শুদ্ধ বানান হিসেবে লেখা কখনোই চলবে না। সেটাই হবে সবচেয়ে বড় ভুল।
ছোটবেলায় ম্যাট্রিক পরীক্ষার টেস্ট পেপারের বাংলা ব্যাকরণ অংশে একটি বাক্য বারবার চোখে পড়ত—“ভুল বানান, কিন্তু ভুল করিও না।” আজও সেই কথাটি মনে গেঁথে আছে। কারণ, ভুলে যাওয়া আর ভুল করা এক জিনিস নয়। মানুষ ভুলে যায় স্মৃতির কারণে, আর ভুল করে অসাবধানতায়। আমরা কত বিচিত্র ভুলই না করি! কখনো চিঠির ঠিকানা ভুল লিখি, আবার সেই ভুল ঠিকানার চিঠিটাই ডাকবাক্সে ফেলতে ভুলে যাই। মনে পড়ে, এইচ. জি. ওয়েলসের একটি কথার কথা—মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো একটি ভালো রকমের ভুল করা। হয়তো সে কারণেই অনেক ব্যবসায়ী ইচ্ছা করেই সাইনবোর্ডে বানান ভুল রাখেন। মানুষ দোকানের নাম ভুলে যায়, কিন্তু সেই অদ্ভুত ভুলটি ভুলতে পারে না। ভাবুন তো, যদি কোনো ঘিয়ের দোকানে লেখা থাকে—“এখানে বিষুদ্ধ ঘৃত পাওয়া য়ায়।” বানান দেখে হাসি পেলেও দোকানটির কথা কিন্তু মনে থেকে যায়! ভুল নিয়ে বাংলা সাহিত্যের রসিক সম্রাট শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পগুলো আজও অমলিন। এক ভদ্রলোকের পায়ে দুই রঙের দুই মোজা। একজন বন্ধু বললেন, “মোজা দুটো তো আলাদা!” ভদ্রলোক নির্বিকার উত্তর দিলেন, “এ আর নতুন কী! বাসায় আরেক জোড়া আছে—সেটাও একটা লাল, একটা কালো!”
এই ধরনের ভুলের ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে যুক্তিও কখনো হেরে যায়। আর আছে ছাপাখানার সেই অদৃশ্য বাসিন্দা—‘প্রিন্টার্স ডেভিল’। বাংলায় যাকে অনেকে মুদ্রণভূত বলেন। তাকে কেউ কখনো দেখেনি, কিন্তু তার কীর্তিকলাপ সবাই দেখেছে। একটি অক্ষরের ভুলে অর্থের কী ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে, তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। একজন খ্যাতিমান আইনজীবী নিজের লেখা মামলার কাগজ বহুবার প্রুফ দেখে সংশোধন করলেন। প্রথমবার চল্লিশটি ভুল, দ্বিতীয়বার প্রায় একশো ডলারের ভুল, তৃতীয়বারও এগারোটি ভুল ধরা পড়ল! তখন তিনি বুঝলেন—মুদ্রণপ্রমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা মানে মরুভূমিতে বালুকণা গোনা। আসলে ভুল মানুষের চিরন্তন সঙ্গী। পৃথিবীর কত বিখ্যাত বই বানান বা মুদ্রণপ্রমাদ নিয়েও বেস্টসেলার হয়েছে। এমনকি প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর নামও একবার ভুল ছাপা হয়েছিল। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সংবাদপত্রও রাজপ্রাসাদের নাম ছাপতে গিয়ে এমন ভুল করেছিল, যা আজও মুদ্রণপ্রমাদের ইতিহাসে হাস্যরসের উদাহরণ হয়ে আছে। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “আমাদের ভুল আর ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই আমরা সব জানতে পারি।” সত্যিই তো—ভুল না করলে মানুষ শেখে কীভাবে? এক জরিপে মানুষকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কী? কেউ বললেন, “অতিরিক্ত বই পড়ে চোখ নষ্ট করেছি।” আরেকজন বললেন, “পড়াশোনা না করাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।” কেউ আফসোস করলেন—“খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছি।” অন্যজনের দীর্ঘশ্বাস—“অনেক দেরিতে বিয়ে করেছি।” কেউ বললেন—বাবার কথা না শোনা ভুল। কেউ বললেন—টাকা উপার্জনের চেষ্টা না করা ভুল। কেউ বললেন—টাকা জমাতে না পারা ভুল। কেউ বললেন—নির্বাচনে দাঁড়ানোই ভুল। অর্থাৎ, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল—মানুষভেদে একেক রকম। আমারও মনে হয়, প্রত্যেক মানুষের বুকের ভেতরে একটি অদৃশ্য তালিকা থাকে, যেখানে লেখা থাকে—“যদি আবার জীবন শুরু করতে পারতাম...” ভুলের মজার গল্পও কম নয়। এক ভদ্রমহিলা স্বামীর সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খেয়ে বেরিয়ে হঠাৎ মনে করলেন, তাঁর রুমালটি টেবিলে ফেলে এসেছেন। তিনি দ্রুত ফিরে গিয়ে টেবিলের নিচে উঁকি মারতেই বেয়ারা ভদ্রভাবে বলল— “ম্যাডাম, আপনি ভুল করছেন। আপনার স্বামী এখানে নন, বাইরে ফুটপাথে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন!” ভুলেরও যে ভুল বোঝাবুঝি আছে, তা এই ঘটনাই প্রমাণ করে। জীবনকেও অনেক সময় আমার ভুলভুলাইয়ার মতো মনে হয়। সামনে যত পথ, সব যেন একই রকম। কোনটি সঠিক, কোনটি ভুল—বুঝে ওঠার আগেই মানুষ ভুল দরজায় কড়া নাড়ে। তারপর আবার ফিরে আসে, আবার চেষ্টা করে। এই চলার নামই হয়তো জীবন। শেষ করি একটি ছোট্ট অথচ গভীর গল্প দিয়ে। শীতের ট্রেনে পাশাপাশি দুদিন ভ্রমণ করলেন একজন অধ্যাপক ও একজন সাধারণ পিয়ন। গন্তব্যে পৌঁছে অধ্যাপক দেখলেন তাঁর বালাপোশ নেই। সন্দেহ গেল দরিদ্র সহযাত্রীর ওপর। তল্লাশি হলো, বিছানা খোলা হলো। শেষে দেখা গেল বালাপোশটি ট্রেনের বার্থের নিচেই পড়ে আছে।
অধ্যাপক লজ্জিত হয়ে বললেন—
“ক্ষমা করবেন, আমি ভুল করেছিলাম।”
পিয়ন মৃদু হেসে উত্তর দিলেন—
“আমিও ভুল করেছিলাম।”
অধ্যাপক বিস্মিত—“আপনি আবার কী ভুল করলেন?”
পিয়নের শান্ত উত্তর—
“আপনি আমাকে চোর ভেবেছিলেন। আর আমি আপনাকে ভদ্রলোক ভেবেছিলাম।” সত্যিই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভুল অনেক সময় বানানে নয়—মানুষ চেনায়। তাই ভুল হবেই। ভুল মানুষ করবে, মানুষই শিখবে। কিন্তু একটি ভুল যেন না করি—কাউকে না জেনে, না বুঝে বিচার করার ভুল। কারণ, সেই ভুলের কোনো সংশোধনী থাকে না।
Copyright © 2026 দৈনিক ভোরের আওয়াজ. All rights reserved.