প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২৫, ২০২৬, ৫:৫৪ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ১৬, ২০২৬, ৬:৫৮ এ.এম
মায়ের নীরব কান্না, ক্ষুধার্ত শৈশবের আর্তনাদ একটি ছবি, হাজারো প্রশ্ন, লক্ষ কোটি বিবেকের কাছে জবাবদিহি

- মো. কামাল উদ্দিন রাত গভীর। চারদিকে কৃত্রিম আলোর ঝলকানি। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে। মানুষ ফিরে যাচ্ছে নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে, আরামদায়ক বিছানায়, পরিবারের উষ্ণ সান্নিধ্যে। কিন্তু এই রাত সবার জন্য এক রকম নয়। এই ছবিটির দিকে তাকান। একজন মা মাথা নিচু করে বসে আছেন। মুখ দেখা যাচ্ছে না। হয়তো তিনি নিজের কান্না লুকাতে চাইছেন। হয়তো সন্তানদের সামনে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে লজ্জা পাচ্ছেন। অথবা হয়তো তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টাকে প্রশ্ন করছেন—"আমার সন্তানদের মুখে একমুঠো খাবার দেওয়ার সামর্থ্য কেন দিলে না?" তার সামনে প্লাস্টিকের ওপর ঘুমিয়ে আছে দুটি শিশু। না, এ ঘুম কোনো শান্তির ঘুম নয়। এ ঘুম ক্ষুধার কাছে পরাজিত শরীরের ঘুম। এ ঘুম ক্লান্তির কাছে আত্মসমর্পণ করা জীবনের ঘুম। সন্তান দুটি হয়তো অনেকক্ষণ বলেছিল—"মা, খিদে পেয়েছে।" মা হয়তো বলেছিলেন—"আর একটু অপেক্ষা করো বাবা।" কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয়নি। খাবার আসেনি। এসেছে শুধু রাত।
অবশেষে ক্ষুধা আর ক্লান্তি একসঙ্গে তাদের চোখ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু একজন মা কি ঘুমাতে পারেন? না, মা ঘুমাননি। তিনি বসে আছেন। মাথা নিচু করে। বুকের ভেতর হাজারো ঝড় নিয়ে। একজন মায়ের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্ট নিজের সন্তানের ক্ষুধা দেখা। নিজের না খেয়ে থাকা সহজ, কিন্তু সন্তানের না খেয়ে থাকা সহ্য করা অসম্ভব। অথচ পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাকে সেই অসহ্য দৃশ্য প্রতিদিন দেখতে বাধ্য করছে। আজ এই ছবিটি শুধু একটি পরিবারের নয়। এটি বাংলাদেশের হাজার হাজার অসহায় মা ও শিশুর প্রতিচ্ছবি। আমরা উন্নয়নের গল্প শুনি। উঁচু উঁচু ভবন দেখি। নতুন নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন দেখি। কোটি কোটি টাকার হিসাব দেখি। কিন্তু এই শিশুদের জন্য কোথায় সেই উন্নয়ন? কেন একটি শিশু খোলা আকাশের নিচে ক্ষুধার্ত পেটে ঘুমাবে? কেন একজন মা সন্তানকে খাবার দিতে না পেরে মাথা লুকিয়ে কাঁদবেন? কেন মানুষের মৌলিক অধিকার আজও অনেকের কাছে স্বপ্ন? এই প্রশ্ন শুধু রাষ্ট্রের কাছে নয়, আমাদের প্রত্যেকের কাছে। কারণ সমাজ শুধু সরকার দিয়ে গড়ে ওঠে না। সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের মানবিকতা দিয়ে। আমরা যদি পাশের ক্ষুধার্ত শিশুটিকে না দেখি, যদি অসহায় মায়ের কান্না না শুনি, তাহলে আমাদের শিক্ষার, সম্পদের, সভ্যতার মূল্য কোথায়? আজ এই ছবিটি দেখে যদি আমাদের চোখে জল না আসে, তাহলে হয়তো আমাদের হৃদয়ই শুকিয়ে গেছে। একদিকে অপচয়ের উৎসব, অন্যদিকে অনাহারের রাত। একদিকে বিলাসিতার আয়োজন, অন্যদিকে ক্ষুধায় কাতর শৈশব।
এ কেমন সমাজ?
এ কেমন সভ্যতা?
এ কেমন মানবতা?
এই শিশুদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়—তারা কি শুধু একমুঠো ভাত চেয়েছিল? তারা কি একটি নিরাপদ ঘুমের জায়গা চেয়েছিল? তারা কি একটু ভালোবাসা চেয়েছিল? তাদের চাওয়া এত সামান্য, অথচ আমাদের ব্যর্থতা এত বিশাল। আজ এই মায়ের নীরব কান্না বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই কান্না আকাশ ছুঁয়েছে, কিন্তু আমাদের বিবেক কি ছুঁয়েছে? আসুন, এই ছবিটিকে শুধু একটি ছবি হিসেবে না দেখি। এটি একটি আয়না। যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে আমাদের সমাজের নির্মম বাস্তবতা। বিবেকের কাছে কিছু প্রশ্ন— যে দেশে একটি শিশুও ক্ষুধার্ত থাকে, সেই উন্নয়ন কি সত্যিকারের উন্নয়ন? যে সমাজে একজন মা সন্তানকে না খাইয়ে রাত কাটান, সেই সমাজ কতটা মানবিক? আমরা কি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলব, নাকি বাস্তবে কিছু করব? আমাদের চারপাশের অসহায় মানুষের প্রতি কি আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই? এই শিশুদের ভবিষ্যৎ কে গড়বে? আজকের এই ছবিটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়— ক্ষুধা শুধু পেটের যন্ত্রণা নয়, ক্ষুধা একটি জাতির বিবেকের পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় আমরা কি সত্যিই উত্তীর্ণ হতে পেরেছি? নাকি প্রতিদিন একটু একটু করে মানবতার কাছে পরাজিত হচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রত্যেককেই দিতে হবে। আজ নয়তো কাল, নিজের বিবেকের আদালতে।
Copyright © 2026 দৈনিক ভোরের আওয়াজ. All rights reserved.