-মো.কামাল উদ্দিনঃ মানুষের জীবনে কিছু ভ্রমণ থাকে, যা শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার গল্প নয়; বরং নিজের ভেতরে আরেকটি নতুন পৃথিবী আবিষ্কারের সূচনা। কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, যাদের উপস্থিতি সময়ের সীমানা পেরিয়ে স্মৃতির গভীরে স্থায়ী হয়ে যায়। দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই মানুষগুলোর মুখ, কণ্ঠস্বর, আচরণ এবং কিছু নির্দোষ মুহূর্ত আজও হৃদয়ের পাতায় ঠিক ততটাই জীবন্ত, যতটা ছিল প্রথম দেখার দিনে। ২০০১ সাল। পৃথিবী তখন নতুন সহস্রাব্দকে স্বাগত জানিয়েছে। আমার জীবনেও তখন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আন্তর্জাতিক বিশ্ব যুব সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম আলজেরিয়ায়। একজন তরুণ লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে এই সফর আমার কাছে শুধু একটি বিদেশ ভ্রমণ ছিল না; এটি ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার, তাদের সংস্কৃতি জানার এবং নিজের দেশ বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার এক বিরল সুযোগ। যাত্রার দিন সকালে যখন ঢাকার বিমানবন্দরে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছিল। প্রিয় জন্মভূমিকে পেছনে রেখে হাজার হাজার মাইল দূরে অজানা এক দেশে যাত্রা—উচ্ছ্বাস, কৌতূহল আর অজানা আশঙ্কা মিলেমিশে এক অন্যরকম আবেগ সৃষ্টি করেছিল। ঢাকা থেকে দিল্লি। দিল্লির ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা। তারপর ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে চড়ে রওনা হলাম রাশিয়ার উদ্দেশ্যে। বিমানের জানালা দিয়ে নিচের পৃথিবীকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, মানুষ আসলে কত ক্ষুদ্র! পাহাড়, নদী, শহর, সমুদ্র—সব যেন খেলনার মতো ছোট হয়ে যাচ্ছে। অথচ সেই ছোট্ট মানুষই কত স্বপ্ন নিয়ে পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। দীর্ঘ আকাশযাত্রার পর বিমান যখন রাশিয়ার মাটিতে অবতরণ করল, তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে আমি যেন অন্য এক পৃথিবী দেখলাম।
চারদিকে সাদা বরফের বিস্তীর্ণ চাদর। গাছের ডালে জমে থাকা বরফ, রাস্তার দু'পাশে বরফের স্তূপ, মানুষের নিঃশ্বাস থেকেও ধোঁয়ার মতো সাদা বাষ্প বের হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে এমন দৃশ্য আমি আগে শুধু বইয়ে পড়েছি, সিনেমায় দেখেছি। বাস্তবে দাঁড়িয়ে সেই সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্য যতটা মোহময়, তার কঠোরতাও ততটাই নির্মম।
প্রথম দিন থেকেই প্রচণ্ড ঠান্ডা আমার শরীরকে দুর্বল করে দিতে শুরু করল। মোটা জ্যাকেট, গ্লাভস, টুপি—সবকিছু পরেও যেন শীত হাড়ের ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল। শরীর কাঁপছিল, গলা ব্যথা করছিল, জ্বর আসতে শুরু করল। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম বিশ্রাম নিলেই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরদিন অবস্থার আরও অবনতি হলো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, মাথা ভারী লাগছিল, শরীর সম্পূর্ণ অবসন্ন হয়ে পড়েছিল। আমার সঙ্গে থাকা কয়েকজন বিদেশি প্রতিনিধি বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্রুত আমাকে একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। সেদিন আমি জানতাম না, সেই হাসপাতালের দরজার ওপারেই আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় অপেক্ষা করছে। হাসপাতালের পরিবেশ ছিল নিঃশব্দ, পরিচ্ছন্ন এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। সাদা দেয়াল, ঝকঝকে করিডোর, ব্যস্ত চিকিৎসক ও নার্সদের চলাফেরা—সবকিছুতেই ছিল পেশাদারিত্বের ছাপ। আমাকে একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে একজন তরুণী চিকিৎসক ভেতরে প্রবেশ করলেন। তাঁর পরনে ছিল সাদা অ্যাপ্রন। গলায় স্টেথোস্কোপ। শান্ত নীলাভ চোখে ছিল এক অদ্ভুত মমতা। মুখে ছিল আন্তরিক হাসি। তিনি নিজের পরিচয় দিলেন— "আমি ড. আনাস্তাসিয়া ভলকোভা।" আমি দুর্বল কণ্ঠে বললাম, "আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।" তিনি মৃদু হেসে বললেন, "বাংলাদেশ... খুব সুন্দর একটি দেশের নাম।" সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম—মানুষের ভাষা আলাদা হতে পারে, সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু আন্তরিক হাসির কোনো অনুবাদ লাগে না। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে আমার শারীরিক পরীক্ষা করলেন। জ্বরের মাত্রা দেখলেন, ফুসফুস পরীক্ষা করলেন, কয়েকটি রক্ত পরীক্ষা ও এক্স-রের ব্যবস্থা করলেন। পরীক্ষা শেষে তিনি বললেন, "আপনি অতিরিক্ত ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়েছেন। কয়েক দিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ হবে।" আমি সম্মতি দিলাম।
সেই মুহূর্তে জানতাম না, এই তিন দিনের চিকিৎসাই আমার জীবনের এক অনন্য স্মৃতির সূচনা হয়ে থাকবে। রাশিয়ার সেই হাসপাতালের জানালার বাইরে অবিরাম তুষার পড়ছিল। আর ভেতরে শুরু হচ্ছিল দুই ভিন্ন দেশের, দুই ভিন্ন সংস্কৃতির, অথচ একই মানবিক অনুভূতির দুই মানুষের এক নিঃশব্দ পরিচয়ের গল্প। সেদিন আমি ছিলাম একজন রোগী। আর তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিচয় কেবল চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে তা রূপ নিয়েছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাহিত্যপ্রেম, জ্ঞানচর্চা এবং গভীর মানবিক বন্ধনের এক অনন্য যাত্রায়। রাশিয়ার সেই হাসপাতালের তৃতীয় তলার কক্ষটির জানালার পাশে বসে আমি প্রায়ই বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। জানালার ওপারে সাদা তুষারের আস্তরণে ঢেকে থাকা শহরটিকে দেখে মনে হতো, যেন প্রকৃতি সাদা ক্যানভাসে নতুন পৃথিবী এঁকেছে। বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে এই দৃশ্যের কোনো মিল ছিল না, কিন্তু তার মধ্যেও ছিল এক অপার্থিব সৌন্দর্য। প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেন ড. আনাস্তাসিয়া ভলকোভা। মুখে সেই চিরচেনা শান্ত হাসি, হাতে রোগীর নথি। তিনি শুধু চিকিৎসক হিসেবে আমার শারীরিক অবস্থাই পর্যবেক্ষণ করতেন না, খোঁজ নিতেন আমার মন কেমন আছে, একা লাগছে কি না, দেশের জন্য মন কাঁদছে কি না। তিনি একদিন মৃদু হেসে বললেন, "আপনার চোখে সব সময় যেন গল্প লুকিয়ে থাকে।" আমি হেসে উত্তর দিয়েছিলাম, "সম্ভবত একজন লেখকের চোখ এমনই হয়।" তিনি অবাক হয়ে বললেন, "আপনি লেখক?" আমি বললাম, "লেখালেখি করি, পাশাপাশি সাংবাদিকতাও করি।" কথাটি শুনে তাঁর চোখে অন্যরকম উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল। তিনি বললেন, "রাশিয়ায় লেখকদের আমরা খুব সম্মান করি। আমাদের দেশে বই শুধু পড়া হয় না, বইকে ভালোবাসা হয়।" সেই মুহূর্ত থেকেই যেন আমাদের আলাপের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। প্রতিদিন চিকিৎসা শেষে তিনি কিছুক্ষণ বসে থাকতেন। কখনও জানতে চাইতেন বাংলাদেশের নদী, কখনও গ্রামের জীবন, কখনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, কখনও আবার বাংলা ভাষার গল্প। আমি তাঁকে বলতাম, তাকে বল্লাম তোমার রাশিয়া আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতার করেছিলেন তাতে আমারা তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ- আমাদের বাংলাদেশ শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; এটি নদীর দেশ, সবুজের দেশ, সংগ্রামের দেশ, ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া মানুষের দেশ। তিনি বিস্ময়ে শুনতেন। একদিন বললেন, "আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী আসে, বিশেষ করে মেডিকেলের ছাত্রী। তারা খুব পরিশ্রমী।" তাঁর কথায় বাংলাদেশের প্রতি এক ধরনের আন্তরিক শ্রদ্ধা অনুভব করেছিলাম।
এরপর একদিন তিনি হাসপাতালের ছোট্ট লাইব্রেরি থেকে কয়েকটি বই নিয়ে এলেন। বললেন, "আপনি যেহেতু লেখক, তাই ভাবলাম এই বইগুলো আপনার ভালো লাগবে।" বইগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সেখানে ছিল কার্ল মার্কসের অর্থনৈতিক দর্শন, ভ্লাদিমির লেনিনের জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তা, ম্যাক্সিম গোর্কির 'মা', এবং নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির অমর উপন্যাস 'ইস্পাত কীভাবে গড়া হলো'। আমি বইগুলো হাতে নিয়ে বললাম, "এগুলো আমার অত্যন্ত প্রিয়।" তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি পড়েছেন?" আমি মৃদু হেসে বললাম, "শুধু পড়িনি, বহুবার পড়েছি।" এরপর শুরু হলো আমাদের দীর্ঘ সাহিত্য-আলোচনা। আমি বলছিলাম কীভাবে মার্কস অর্থনীতির ভেতরে সমাজের কাঠামো বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে লেনিন বিপ্লবকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেন, কীভাবে ম্যাক্সিম গোর্কি সাধারণ মানুষের সংগ্রামকে সাহিত্যে অমর করেছেন, আর কীভাবে অস্ত্রোভস্কি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে এক অনন্য শিল্পে রূপ দিয়েছেন। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতেন। কখনও দ্বিমত পোষণ করতেন। আবার কখনও বলতেন, "আজ মনে হচ্ছে আমি রোগীর চিকিৎসা করতে এসে নিজেই নতুন শিক্ষা নিয়ে ফিরছি।" সেই মুহূর্তে অনুভব করলাম, জ্ঞানের কোনো জাতীয়তা নেই। বই মানুষের হৃদয়ের ভাষা। হাসপাতালের তিনটি দিন যেন খুব দ্রুত কেটে গেল। আমার শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে ভালো হয়ে উঠল। কিন্তু আমাদের আলাপের গভীরতা বাড়তেই থাকল। একদিন তিনি বললেন, "আপনি সুস্থ হয়ে চলে গেলে এই কক্ষটি খুব নির্জন লাগবে।" আমি মৃদু হেসে বললাম,
"পৃথিবী খুব ছোট। হয়তো আবার কোথাও দেখা হবে।" তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে জানালার বাইরে পড়তে থাকা তুষারের দিকে তাকিয়ে বললেন, "হয়তো সত্যিই হবে।" হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার দিন তিনি নিজের হাতে আমার জন্য কয়েকটি বই প্যাকেট করে দিলেন। বইগুলোর প্রথম পাতায় তিনি ইংরেজিতে ছোট্ট একটি বাক্য লিখেছিলেন— "Books build bridges where borders cannot." "যেখানে সীমান্ত ব্যর্থ হয়, সেখানে বই সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।" আমি দীর্ঘক্ষণ বইগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বিদায়ের মুহূর্তে তিনি হাত বাড়িয়ে বললেন, "বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে লিখবেন। পৃথিবীকে জানাবেন, মানুষ আসলে একে অপরের কাছেই সবচেয়ে বড় আশ্রয়।" আমি তাঁর হাত ধরে বলেছিলাম, "আপনার এই মানবিকতা আমি কোনোদিন ভুলব না।" হাসপাতালের দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। তুষার তখনও ঝরছে। কিন্তু সেই শীতের মধ্যেও আমার মনে হচ্ছিল, মানুষের ভালোবাসার উষ্ণতার কাছে পৃথিবীর সব বরফ একদিন গলে যেতে পারে। আমি জানতাম না, আমাদের গল্প এখানেই শেষ নয়। সামনে অপেক্ষা করছে আলজেরিয়ার বিশ্ব যুব সম্মেলন, ফেরার পথে আবার রাশিয়ায় পাঁচ দিনের পুনর্মিলন, আর কয়েক বছর পর কাতারের শেরাটন হোটেলে এক অবিশ্বাস্য কাকতালীয় সাক্ষাৎ—যা আমাদের স্মৃতিকে আরও গভীর, আরও অর্থবহ করে তুলবে। "কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় কয়েকটি দিনের জন্য, কিন্তু তাদের স্মৃতি থেকে যায় আজীবন। সময় দূরত্ব বাড়ায়, কিন্তু সত্যিকারের মানবিক সম্পর্ককে কখনো মুছে দিতে পারে না।" হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বেরিয়ে আসার পর আমার সামনে ছিল দীর্ঘ সফর। রাশিয়া থেকে তিউনিসিয়া, তারপর ট্রেনে আলজেরিয়ার রাজধানী। সেখানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব যুব সম্মেলনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয়, মতবিনিময়, আলোচনা—সবকিছুই ছিল নতুন অভিজ্ঞতায় ভরা। তবুও সম্মেলনের ব্যস্ততার মাঝেও বারবার মনে পড়ছিল রাশিয়ার সেই হাসপাতালের কথা। মনে পড়ছিল এক তরুণী চিকিৎসকের আন্তরিক হাসি, তাঁর অদ্ভুত মানবিকতা, আর বই নিয়ে আমাদের দীর্ঘ আলোচনা। আমি বুঝতে পারছিলাম, কিছু মানুষকে খুব অল্প সময়ে চিনেও আপন মনে হয়। সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার পথে আবারও কয়েক দিনের জন্য রাশিয়ায় অবস্থানের সুযোগ হলো। এবার আর আমি অসুস্থ রোগী নই। এবার আমি সুস্থ একজন মানুষ, যার মনে একটিই ইচ্ছা—একবার দেখা হবে কি সেই মানুষটির সঙ্গে? হাসপাতালে পৌঁছাতেই একজন নার্স আমার নাম শুনে মুচকি হেসে বললেন, "ডক্টর আনাস্তাসিয়া আপনার কথা প্রায়ই বলতেন।" কিছুক্ষণ পর করিডোরের শেষ প্রান্তে তাঁকে দেখতে পেলাম। আমাকে দেখেই তিনি বিস্ময়ে থেমে গেলেন। তারপর সেই চিরচেনা হাসি নিয়ে এগিয়ে এলেন। "আমি জানতাম, আপনি ফিরে আসবেন।" আমি বললাম, "কিছু মানুষের কাছে না ফিরে উপায় থাকে না।" সেদিন তাঁর চোখে আনন্দের ঝিলিক স্পষ্ট ছিল। সেই পাঁচটি দিন যেন আর হাসপাতালের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। আমরা রাশিয়ার বরফে ঢাকা পার্কে হাঁটলাম, পুরোনো বইয়ের দোকানে গেলাম, ছোট্ট কফিশপে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করলাম। আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল পৃথিবী, মানুষ, সাহিত্য, সমাজ, সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, ইতিহাস, যুদ্ধ, শান্তি এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তিনি বলেছিলেন, "একজন চিকিৎসক মানুষের শরীরের ক্ষত সারিয়ে তোলেন, আর একজন লেখক মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলেন।" আমি উত্তর দিয়েছিলাম, "দুজনের কাজই মানুষের জীবনকে সুন্দর করা।"
তিনি হাসলেন। সেই হাসির মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না; ছিল গভীর শ্রদ্ধা। বিদায়ের আগের সন্ধ্যায় তিনি আমাকে একটি ছোট বাক্স উপহার দিলেন। ভেতরে ছিল তিনজন রুশ সাহিত্যিকের বই।
তিনি বললেন, "এই বইগুলো তোমার জন্য। যখনই পড়বে, রাশিয়াকে মনে পড়বে।" আমি কিছুক্ষণ নীরব রইলাম। তারপর বললাম, "মানুষকে মনে রাখার জন্য কখনো কোনো উপহারের দরকার হয় না। কিন্তু এই বইগুলো আমার কাছে তোমার স্মৃতির প্রতীক হয়ে থাকবে।" তিনি মৃদুস্বরে বললেন, "আমাদের বন্ধুত্ব যেন কখনো শেষ না হয়।" রাশিয়া ছেড়ে দেশে ফিরে এলাম। কিন্তু সম্পর্কের সমাপ্তি হলো না। শুরু হলো চিঠির আদান-প্রদান। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আমরা একে অপরকে চিঠি লিখেছি। তিনি রাশিয়া থেকে নতুন নতুন বই পাঠাতেন। আমি বাংলাদেশ থেকে পাঠিয়েছিলাম আমার লেখা তিনটি বই— "নারী কথা", যেখানে নারীর জীবনসংগ্রাম, সম্মান ও আত্মমর্যাদার কথা লিখেছিলাম। "তাহাদের কথা", যেখানে সমাজের অবহেলিত যৌনকর্মীদের জীবনের অজানা বাস্তবতা তুলে ধরেছিলাম। এবং আমার প্রথম উপন্যাস "নির্মম নিয়তি"। কয়েক মাস পরে তাঁর একটি চিঠি এল। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন— "তোমার বই পড়ে বুঝলাম, একজন লেখক শুধু গল্প লেখেন না; তিনি মানুষের অদেখা কান্নাকে শব্দ দেন।" সেই কয়েকটি বাক্য আমার লেখকজীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হয়ে আছে। তারপর কেটে গেল চারটি বছর। সময় আমাদের ভৌগোলিক দূরত্ব বাড়িয়ে দিল, কিন্তু স্মৃতির দূরত্ব বাড়াতে পারেনি। ২০০৫ সালে আমি দুবাই থেকে কাতারের শেরাটন হোটেলে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, কবি—সবাই সেখানে উপস্থিত। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের বিকেলে হঠাৎ দূর থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। "বাংলাদেশ!" পেছনে ফিরে তাকাতেই আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। তিনি। ড. আনাস্তাসিয়া ভলকোভা। চার বছর পরও তিনি আমাকে এক মুহূর্তে চিনে ফেলেছেন। আমরা দুজনই কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারিনি। কখনো কখনো নীরবতাও অনেক কথা বলে। সেই সম্মেলনের নয়টি দিন আবার আমাদের নতুন করে কাছাকাছি নিয়ে এলো। আমরা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছি। বিশ্বরাজনীতি নিয়ে বিতর্ক করেছি। বাংলাদেশের পরিবর্তনের গল্প বলেছি। তিনি রাশিয়ার নতুন প্রজন্মের কথা বলেছেন। আমি তাঁকে আমার নতুন লেখার পরিকল্পনা শুনিয়েছি। তিনি বলেছিলেন, "তুমি লিখে যাও। পৃথিবী একদিন তোমার লেখা পড়বে।" আমি বলেছিলাম, "তুমিও চিকিৎসা করে যাও। মানুষের জীবনে সুস্থতা ফিরিয়ে দেওয়ার চেয়ে বড় সাহিত্য আর কিছু নেই।" সম্মেলনের শেষ দিন আবার বিদায়ের সময় এল। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "জীবনের সব গল্পের শেষ অধ্যায় থাকে না। কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকলেই সবচেয়ে সুন্দর হয়।" আমি উত্তর দিয়েছিলাম, —"অসমাপ্ত গল্পই হয়তো মানুষকে সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।"
আজ সেই ঘটনারও দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে। অনেক দেশ দেখেছি। অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার সেই শীতের সকাল, হাসপাতালের সেই সাদা করিডোর, একজন মানবিক চিকিৎসকের আন্তরিক হাসি এবং বইয়ের পাতায় জন্ম নেওয়া এক নির্মল সম্পর্কএসব আজও আমার স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি। আমি আজও বিশ্বাস করি, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কগুলো স্বার্থের ওপর দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিকতা, জ্ঞানচর্চা এবং আন্তরিকতার ওপর। ড. আনাস্তাসিয়া আমার জীবনে প্রেমের প্রচলিত সংজ্ঞা নন; তিনি একজন মানুষ, যিনি আমাকে শিখিয়েছেন—ভাষা ভিন্ন হতে পারে, দেশ ভিন্ন হতে পারে, ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু হৃদয়ের ভাষা এক। আজও যখন কোনো রুশ সাহিত্যিকের বই হাতে নিই, কিংবা তুষারপাতের ছবি দেখি, তখন মনে হয়—পৃথিবীর কোথাও না কোথাও হয়তো সেই মানুষটি এখনো কোনো রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, যেমন একদিন দাঁড়িয়েছিলেন এক বাংলাদেশি তরুণ লেখক-সাংবাদিকের পাশে। আর আমি নিঃশব্দে প্রার্থনা করি— মানবতার এই পৃথিবীতে মানুষ যেন মানুষকেই ভালোবাসতে শেখে। কারণ সীমান্ত দেশকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু একটি সত্যিকারের মানবিক সম্পর্ককে কখনো আলাদা করতে পারে না।
—সমাপ্ত—