— মো. কামাল উদ্দিন
কিছু ছবি সময়কে থামিয়ে রাখে। কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। এই ছবিটির দিকে যতবার তাকাই, ততবার মনে হয়—আমি যেন ফিরে গেছি বহু বছরের পেছনে, আমার প্রাণের গ্রাম চরণদ্বীপে। সেই কিশোরটি আজও বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ চারপাশের পৃথিবী কত বদলে গেছে! সেই সাইকেলটি ছিল না কেবল দুটি চাকার একটি বাহন; সেটিই ছিল আমার কৈশোরের ডানা, স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ, সাহসের প্রথম পাঠ এবং জীবনকে চিনে নেওয়ার প্রথম সহযাত্রী। তার চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছে আমার শৈশব, আমার স্বপ্ন, আমার সীমাহীন আনন্দ। আমাদের ঐতিহ্যবাহী চরণদ্বীপের নজর মোহাম্মদ বাড়ি ছিল আমার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু। সেই বাড়ির উঠোনে বেড়ে উঠেছি, শতবর্ষী বৃক্ষের ছায়ায় বসে স্বপ্ন দেখেছি, পাখির ডাক শুনে ভোরের আলোকে স্বাগত জানিয়েছি। সেই বাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি উঠোন আজও আমার কাছে ইতিহাসের মতোই মূল্যবান। সেখানে শুধু আমার পরিবার নয়, আমার শিকড়, আমার পরিচয় এবং আমার অস্তিত্বের গভীরতম অনুভূতি লুকিয়ে আছে। ভোরের আলো ফুটতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, সবুজ ধানক্ষেত, কাশবনের দোল, তাল-খেজুরের সারি আর দূরে নীল আকাশের নিচে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদী—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজেই এক মহাকাব্য রচনা করেছিল। কর্ণফুলীর বুক থেকে ভেসে আসা বাতাস আমাদের মুখে এসে লাগত, আর মনে হতো পৃথিবীতে এর চেয়ে নির্মল সুখ আর কিছু নেই।
সেই সাইকেলেই কতবার যে বোয়ালখালীর পথে ছুটে গেছি! কখনো বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে হাসতে, কখনো নিঃসঙ্গ দুপুরে নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। আর কালুরঘাট সেতু—সে তো ছিল আমাদের কিশোর বয়সের বিস্ময়। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নিচে প্রবাহমান কর্ণফুলীর দিকে তাকিয়ে মনে হতো, নদী শুধু জল বহন করে না, মানুষের ইতিহাস, ভালোবাসা আর সময়ের গল্পও বহন করে নিয়ে চলে। আজও স্পষ্ট মনে আছে, একদিন আমরা কয়েকজন বন্ধু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—সাইকেল চালিয়ে আনোয়ারার হযরত মোহসীন আউলিয়ার মাজারে যাব। সেই দীর্ঘ পথযাত্রা ছিল আমাদের জীবনের এক অনন্য অভিযান। ক্লান্তি ছিল, কিন্তু ক্লান্তির চেয়ে আনন্দ ছিল অনেক বড়। পথের ধুলো আমাদের পোশাকে লেগেছিল, কিন্তু হৃদয়ে লেগেছিল অমলিন স্মৃতির রং। সেই সফর আমাদের শিখিয়েছিল—বন্ধুত্ব মানে একসঙ্গে পথ চলা, আর জীবন মানে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস।
পরে শহরের ব্যস্ত রাস্তায়ও বহু বছর সাইকেল চালিয়েছি। জীবনের প্রয়োজন মিটেছে, কর্মের গতি বেড়েছে; কিন্তু শহরের কংক্রিটের পথে কখনো খুঁজে পাইনি চরণদ্বীপের মাটির গন্ধ, কর্ণফুলীর বাতাসের স্পর্শ কিংবা কালুরঘাট সেতুর বুকজুড়ে দাঁড়িয়ে অনুভব করা সেই অনির্বচনীয় স্বাধীনতা।
আজকের শিশুরা পৃথিবীকে চেনে মোবাইলের পর্দায়, আর আমরা চিনেছিলাম সাইকেলের চাকায় ভর করে। আমাদের মানচিত্র ছিল গ্রামের পথ, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রকৃতি, আমাদের শিক্ষক ছিল নদী, মাঠ, আকাশ আর মানুষের জীবন। সময় অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। অনেক মুখ হারিয়ে গেছে, অনেক পথ বদলে গেছে, অনেক স্মৃতি ইতিহাস হয়ে গেছে। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে আজও অমলিন হয়ে আছে সেই পুরোনো সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি। মনে হয়, যদি আর একবার ফিরে যেতে পারতাম সেই চরণদ্বীপে, সেই নজর মোহাম্মদ বাড়ির উঠোনে, সেই কর্ণফুলীর পাড়ে, সেই কালুরঘাট সেতুর ওপর, তবে হয়তো আবারও শুনতে পেতাম কৈশোরের হাসি, অনুভব করতাম জীবনের সবচেয়ে নির্মল আনন্দ।
মানুষের জীবনে কিছু সম্পদ থাকে, যার মূল্য কোনো অর্থে মাপা যায় না। আমার কাছে সেই অমূল্য সম্পদ হলো—একটি পুরোনো সাইকেল, একটি নদী, একটি গ্রাম, একটি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি এবং স্মৃতির আলোয় চিরসবুজ হয়ে থাকা এক স্বর্ণালি শৈশব। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন এই স্মৃতিগুলোই আমার হৃদয়ের আকাশে জ্বলতে থাকবে ধ্রুবতারার মতো।