সিলেট নগরীতে আবারও শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী ‘ট্রাফিক সপ্তাহ-২০২৬’। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম চলবে আগামী ২০ জুন পর্যন্ত। যানজট নিরসন, অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে নগরবাসীর দাবি, প্রতি বছর ট্রাফিক সপ্তাহ আয়োজন করা হলেও বাস্তবে যানজট পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি দেখা যায় না। সিলেট নগরীর দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অবৈধ যানবাহন স্ট্যান্ড, ফুটপাত দখল, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং এবং তীব্র যানজট। বছরের শুরুতে সিটি করপোরেশনের অভিযানে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরলেও কোরবানির ঈদের পর থেকে আবারও নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা শুরু হয়েছে। এতে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং যানজট আরও বাড়ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, রিকাবীবাজার, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, লামাবাজার, বারুতখানা, জেল রোড, নয়াসড়ক, আম্বরখানা, সুবিদবাজার, মদিনা মার্কেট, শাহজালাল মাজার রোড, শিবগঞ্জ, টিলাগড়, উপশহর মোড়, কালীঘাট, লালদীঘিরপাড়সহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা অবৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ডও যানজটের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সুবিদবাজার, আম্বরখানা, বন্দরবাজার, দরগাহ গেট, পাঠানটুলা, শিবগঞ্জ, টিলাগড় ও মেজরটিলাসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার একাংশ দখল করে অসংখ্য যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক স্থানে নির্ধারিত সংখ্যার কয়েকগুণ বেশি সিএনজি অবস্থান করছে। এ ছাড়া যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অধিকাংশ মার্কেট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় সড়কের ওপরই যানবাহন রাখা হচ্ছে। এতে পথচারী ও যানবাহন চালকদের ভোগান্তি বাড়ছে। নগরবাসীর মতে, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টো পথে যান চলাচল, সিগন্যাল উপেক্ষা এবং লাইসেন্সবিহীন যানবাহন পরিচালনার প্রবণতাও যানজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বেপরোয়া মোটরসাইকেল চলাচল নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও অগোছালো করে তুলছে। এদিকে অবৈধ স্ট্যান্ড ও ফুটপাতের দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন সিএনজি অটোরিকশাচালক অভিযোগ করে জানান, বিভিন্ন স্থানে দাঁড়াতে হলে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। টাকা না দিলে তাদের গাড়ি দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। তবে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক ও ডিসি হেডকোয়ার্টার) সুদীপ্ত রায় বলেন, নগরীর যানজট কমাতে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ট্রাফিক সপ্তাহ উপলক্ষে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট ব্যবহারে সচেতন করা হচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা টোকেন বাণিজ্যের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন কর্মকাণ্ডে কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত থাকার সুযোগ নেই। তবুও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাসদ সিলেট জেলার আহ্বায়ক আবু জাফর বলেন, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার অভাবে বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে পার্কিং স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। শুধু ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন। অন্যদিকে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সদস্য ও সিলেট মহানগর আমির মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়ে যানজট ও অবৈধ দখল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছিল। তবে বর্তমানে সেই সমন্বয় আর দেখা যাচ্ছে না। ফলে আবারও ফুটপাত দখল ও অবৈধ স্ট্যান্ডের বিস্তার ঘটেছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, জাল নম্বরপ্লেট ব্যবহারকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যানজট অনেকটাই কমানো সম্ভব। তিনি জানান, অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদে সিটি করপোরেশন নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে এবং প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অবৈধ স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য মেট্রোপলিটন পুলিশের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। পুলিশের সামনেই কিছু এলাকায় অবৈধ স্ট্যান্ড পরিচালনার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে। নগরবাসীর অভিমত, সাময়িক অভিযান বা ট্রাফিক সপ্তাহ নয়, বরং অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই সিলেটের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে।