-মো. কামাল উদ্দিনঃ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। চলে গেলেন এক মহীরুহ। চলে গেলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই চট্টগ্রামের মাটি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, রাজনীতির সততা এবং উন্নয়নের স্বপ্ন একসঙ্গে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আর নেই—এ সংবাদ যেন শুধু একটি মৃত্যুর সংবাদ নয়, এটি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বুক চিরে উঠে আসা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় ঢাকা পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন সেই থেকে তিনি অসুস্থ হয়েছিলেন, কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আজ ঢাকা স্কোয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন নির্মাতা, একজন সৎ ও আদর্শবান রাজনীতিবিদের জীবনের শেষ অধ্যায় এভাবে শেষ হবে—এ দৃশ্য মেনে নিতে কষ্ট হয়। এ যেন ইতিহাসের কাছে এক নীরব প্রশ্ন, বিবেকের কাছে এক অস্বস্তিকর দায়। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন সেই প্রজন্মের মানুষ, যারা রাজনীতিকে পেশা নয়—আদর্শ মনে করতেন। যারা দেশকে ভালোবাসতেন নিঃস্বার্থভাবে। যারা ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের জন্য রাজনীতি করতেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন সেক্টর-১ এর সাব-সেক্টর কমান্ডার। শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার যে সাহসী ইতিহাস, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। চট্টগ্রামকে রক্ষা করার সেই দুর্ধর্ষ অভিযানে তিনি ছিলেন এক নির্ভীক সংগঠক, এক সাহসী যোদ্ধা। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা সেই তরুণ পরে হয়ে উঠেছিলেন উন্নয়ন ও জনকল্যাণের এক নিরলস কারিগর। রাজনীতিতে তাঁর সততা ছিল কিংবদন্তির মতো। তিনি ছিলেন ভদ্র, মার্জিত, সংযত এবং নীতিতে অটল একজন মানুষ। ক্ষমতার পালাবদলে যখন অনেকেই নিজেদের অবস্থান বদলেছেন, সুবিধাবাদী রাজনীতির আশ্রয় নিয়েছেন, তখন মোশাররফ হোসেন ছিলেন এক অবিচল বৃক্ষের মতো। দলের দুঃসময়ে তিনি দল ছাড়েননি, আদর্শ বিক্রি করেননি, ব্যক্তিস্বার্থকে কখনও দেশের ওপরে স্থান দেননি। ছয়বার সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক—সব দায়িত্বই তিনি পালন করেছেন অসাধারণ দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে। উত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়ন, সড়ক, অবকাঠামো, জনপদ গঠন—সবখানেই তাঁর ছাপ আজও স্পষ্ট। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যাঁর কাছে সাধারণ মানুষ সহজে যেতে পারতো, নিজের কথা বলতে পারতো। ক্ষমতা তাঁকে অহংকারী করেনি; বরং আরও বিনয়ী করেছে। তাঁর পিতা এস. রহমান ছিলেন একজন দূরদর্শী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ। সেই পরিবারের উত্তরসূরি হয়েও মোশাররফ হোসেন নিজস্ব সততা ও কর্মদক্ষতায় আলাদা উচ্চতা তৈরি করেছিলেন। ‘হোটেল সায়মন’, ‘পেনিনসুলা’, ‘গ্যাসমিন লিমিটেড’—ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তাঁর সৃজনশীল চিন্তা, মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির আন্তরিক প্রয়াস। তিনি বুঝতেন, একটি দেশকে শুধু রাজনীতি দিয়ে নয়, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমেও এগিয়ে নিতে হয়। কিন্তু আজ সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় তাঁর মৃত্যুর প্রেক্ষাপট।
যে মানুষটি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, যিনি রাষ্ট্র গঠনে অবদান রেখেছেন, যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় জনগণের জন্য কাজ করেছেন—তাঁর শেষ দিনগুলো কেটেছে কারাগারে। এ দৃশ্য শুধু বেদনাদায়ক নয়, এটি জাতির জন্যও গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়। একজন মানুষ মৃত্যুর পর তাঁর পদ-পদবি থাকে না, থাকে শুধু তাঁর কর্ম ও মানবিকতা। সেই জায়গায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন উজ্জ্বল এক নাম। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—সততা নিয়ে রাজনীতি করা যায়, ভদ্রতা নিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া যায়, দেশপ্রেম নিয়েও দীর্ঘ পথ হাঁটা যায়। আজ চট্টগ্রাম শোকাহত। রাজনীতি শোকাহত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষ শোকাহত। চট্টগ্রামের অলিগলি, পাহাড়, নদী, জনপদ—সবখানে যেন আজ এক নিঃশব্দ বিষাদ। একজন অভিভাবক হারানোর বেদনা ছড়িয়ে আছে মানুষের চোখে, স্মৃতিতে, কথায়। মৃত্যু মানুষকে থামিয়ে দেয়, কিন্তু আদর্শকে থামাতে পারে না। মোশাররফ হোসেন হয়তো আজ পৃথিবীর আলো ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু তিনি রয়ে যাবেন বাংলাদেশের ইতিহাসে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবে, চট্টগ্রামের উন্নয়নের প্রতিটি স্তম্ভে এবং মানুষের ভালোবাসার গভীরে। ইতিহাস তাঁকে স্মরণ করবে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। রাজনীতি তাঁকে স্মরণ করবে একজন সৎ মানুষ হিসেবে। চট্টগ্রাম তাঁকে স্মরণ করবে একজন অভিভাবক হিসেবে। আর মানুষ মনে রাখবে— সব নেতা এক রকম হন না। কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা মৃত্যুর পরও আলোর মতো পথ দেখান। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, শুভানুধ্যায়ী ও সহযোদ্ধাদের প্রতি গভীর সমবেদনা। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আপনি হারিয়ে যাননি—আপনি ইতিহাস হয়ে গেছেন।