-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের গণমাধ্যম অঙ্গনে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, বিভাজন ও দখলদারিত্বের বিতর্কের মধ্যেই এক বিরল ঐক্যের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করল নগরবাসী। প্রায় সাত শতাধিক পেশাদার সাংবাদিকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত দোয়া ও ইফতার মাহফিল যেন পরিণত হলো চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের এক ঐতিহাসিক মিলনমেলায়। অনেকের মতে, এই আয়োজন শুধু একটি ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত শক্তি ও পেশাগত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। শনিবার (১৪ মার্চ ২০২৬) নগরীর অন্যতম বৃহৎ কনভেনশন ভেন্যু আইসিসি (ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার)-এ চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) এবং চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সর্বশেষ নির্বাচিত কার্যকরী কমিটির যৌথ উদ্যোগে এই দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের প্রিন্ট, টেলিভিশন, অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া গণমাধ্যমের নবীন-প্রবীণ সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে পুরো অনুষ্ঠানস্থল যেন এক অনন্য সাংবাদিক সম্মেলনে পরিণত হয়। প্রেসক্লাব দখল ইস্যুর প্রেক্ষাপট গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব দখলকে কেন্দ্র করে নগরীর সাংবাদিক সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি গণমাধ্যম অঙ্গনে বিভাজনের আবহ তৈরি করে। অনেক পেশাদার সাংবাদিক প্রেসক্লাব কার্যক্রম থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবের নির্বাচিত কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত ইফতার মাহফিলকে অনেকেই দেখছেন সাংবাদিক সমাজকে আবারও একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে। আয়োজকদের মতে, এটি ছিল পেশাদার সাংবাদিকদের মিলন ও ঐক্যের প্রতীকী সমাবেশ। সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে কঠোর নিরাপত্তা অনুষ্ঠানকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা গুঞ্জন ও অপপ্রচার ছড়াতে থাকে। অভিযোগ ওঠে, প্রেসক্লাব দখলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মহল সামাজিক মাধ্যমে এই ইফতার মাহফিলকে ঘিরে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করে এবং আয়োজনটি রুখে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসন সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজের সার্বিক তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশ এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও সতর্ক রাখা হয়। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিকেল তিনটার দিকে কথিত একটি ছাত্রগোষ্ঠী কয়েকটি গাড়িতে করে অনুষ্ঠানস্থলের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। তবে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানের কারণে তারা আর এগোতে পারেনি। ফলে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা কাটিয়ে অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা আবু সুফিয়ান। অনুষ্ঠানে তাকে স্বাগত জানান চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের চারটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার সম্পাদক— দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক, দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. ম. রমিজ উদ্দিন চৌধুরী, নয়াবাংলা সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ হিরু এবং চট্টগ্রাম মঞ্চ সম্পাদক সৈয়দ ওমর ফারুক। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি শহীদ উল আলম, যুগ্ম সম্পাদক মহসীন কাজী, নির্বাহী সদস্য আজহার মাহমুদসহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম, আবুল হাসেম বক্কর, সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের স্বপন মজুমদার, গণসংহতি আন্দোলনের হাসান মারুফ রুমি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। ঐক্যের বার্তা-প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি আবু সুফিয়ান বলেন, “চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের মধ্যে যে সংকট বিরাজ করছে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। সাংবাদিকরা সবসময় গণতন্ত্র ও জনস্বার্থের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা চাই এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হোক।” বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, “রমজান আমাদের সংযম ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। সাংবাদিক সমাজের মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. ম. রমিজ উদ্দিন বলেন, “আজকের এই মিলনমেলা সাংবাদিকদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতিফলন। এই ঐক্য চট্টগ্রামের গণমাধ্যমকে আরও শক্তিশালী করবে।” সংগঠকদের বক্তব্য- চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি সালাউদ্দিন মোহাম্মদ রেজা সভাপতির বক্তব্যে বলেন,“গণমাধ্যম কোনোভাবেই দখলদারিত্বের বিষয় হতে পারে না। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতভেদ যেন বিভাজনের কারণ না হয়।” চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী স্বাগতিক বক্তব্যে উপস্থিত সকল সম্পাদক, সাংবাদিক, সংগঠনের নেতা এবং অতিথিদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “আজকের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে পেশাদার সাংবাদিকরা এখনও একসাথে আছেন। এই ঐক্যই আমাদের গণমাধ্যমের মুক্তির পথ।” আবেগঘন পুনর্মিলন প্রায় দেড় বছর ধরে চলমান সংকটের মধ্যে অনেক সাংবাদিক একে অপরের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সুযোগ পাননি। ফলে ইফতার মাহফিলটি অনেকের কাছে আবেগঘন পুনর্মিলনে পরিণত হয়। অনেককে দেখা যায় পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে আলিঙ্গন করতে, খোঁজখবর নিতে এবং স্মৃতিচারণ করতে। ইফতার শেষে চা আড্ডায় জমে ওঠে প্রাণবন্ত আলাপচারিতা। সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসা এই আয়োজন সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক সাড়া ফেলে। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সাংবাদিকরাও এই ঐক্যকে স্বাগত জানান। একজন সিনিয়র সাংবাদিক লিখেছেন— “সেই সন্ধ্যায় এক জায়গায় জড়ো হয়েছিলেন প্রায় সাত শত সাংবাদিক। প্রিন্ট, টিভি ও অনলাইন—সব মাধ্যমের মানুষ। মনে হচ্ছিল আমরা আবারও একসাথে দাঁড়িয়েছি।” প্রয়াত সাংবাদিকদের স্মরণ,অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে প্রয়াত সাংবাদিক সাবের আহমেদ আজগরী, নিজাম উদ্দিন আহমেদ ও আয়ুব আলীসহ সাংবাদিক সমাজের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে দেশ, জাতি ও সাংবাদিক সমাজের কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া করা হয়। সফল সমাপ্তি- সাংবাদিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, আয়োজকদের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজের নেতৃত্বে পুলিশের সার্বিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণ ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়। অনেকের মতে, এই ইফতার মাহফিল শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের ঐক্যের এক শক্তিশালী প্রতীক, যা ভবিষ্যতে গণমাধ্যম অঙ্গনের সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।