জামাল উদ্দিন জাহিদঃ
ইতিহাস কখনো কখনো নীরবে এসে দাঁড়ায় মানুষের ভেতরে—শব্দ হয়ে, স্মৃতি হয়ে, কবিতা হয়ে। উর্দু-ফারসি সাহিত্যের অমর কবি, মরমী চিন্তার দীপশিখা মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁ গালিব তেমনই এক নাম, যাঁর কবিতা সময়কে অতিক্রম করে আজও মানুষের অন্তরে আলো জ্বালায়। সেই চিরপ্রাসঙ্গিক কবির ১৫৭তম ওফাত বার্ষিকীতে চট্টগ্রাম নগরী হয়ে উঠেছিল স্মরণ, শ্রদ্ধা ও সাহিত্যিক আবেগে পরিপূর্ণ। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটের লেকচার হলে দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ (ইতিহাসের পাঠশালা)-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘শায়েরে আ’লা মির্জা গালিব স্মরণ সন্ধ্যা’। গম্ভীর অথচ স্নিগ্ধ এই আয়োজন যেন এক সন্ধ্যার জন্য চট্টগ্রামকে নিয়ে গিয়েছিল উনিশ শতকের দিল্লির সেই বিষণ্ন, ভাবুক গলিতে—যেখানে গালিব শব্দে শব্দে নিজের আত্মা রেখে গেছেন। অনুষ্ঠানজুড়ে কবিতা পাঠ, সংগীত, গবেষণাপত্র উপস্থাপন, আলোচনা ও স্মৃতিচারণে উঠে আসে গালিবের প্রেম, বেদনা, আত্মসংঘাত, দর্শন ও মানবতাবাদী চেতনার বহুবর্ণিল রূপ। বক্তাদের কণ্ঠে, পাঠকের মনে এবং শ্রোতার অনুভবে গালিব যেন বারবার ফিরে আসছিল—কখনো প্রেমিক, কখনো দার্শনিক, কখনো নিঃসঙ্গ এক মানুষ হিসেবে। দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশের সম্পাদক ও পরিচালক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ-দীনের সুশৃঙ্খল ও আবেগময় পরিচালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ ড. মুহাম্মদ সানাউল্লাহ। মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রবীণ কবি চৌধুরী গোলাম রাব্বানী, যিনি গালিবকে আখ্যায়িত করেন “ভাষার ভেতর দিয়ে আত্মার অনুসন্ধানকারী এক অনন্য কবি” হিসেবে। গালিব-গবেষণায় মননশীল উচ্চারণ অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল মির্জা গালিবের জীবন ও সাহিত্যকর্মের ওপর গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন। এই প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা মো. কামাল উদ্দিন। তাঁর গবেষণায় উঠে আসে গালিবের ব্যক্তিজীবনের আর্থিক দুঃখ, উপনিবেশিক শাসনের চাপ, বিশ্বাস ও সংশয়ের দ্বন্দ্ব এবং কবিতায় আত্মজিজ্ঞাসার গভীর সুর। প্রবন্ধটি শুধু তথ্যভিত্তিক নয়—ছিল চিন্তাশীল, বিশ্লেষণধর্মী ও সাহিত্যিক আবেগে ঋদ্ধ। আলোচনায় অংশ নেন কবি অধ্যক্ষ সিহাব উদ্দিন চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক সাইফুদ্দিন, লেখক লায়ন দুলাল কান্তি বড়ুয়া, প্রবীণ গবেষক আহমদ হোসেন, কবি ও শিক্ষাবিদ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার, বাচিক শিল্পী মেজবাহ চৌধুরী, মোহাম্মদ মুদ্দাসিসর হাসান, মির্জা মোহাম্মদ আরিফিন উদ্দিন, দেলোয়ার হোসেন মানিকসহ আরও অনেকে। তাঁদের বক্তব্যে গালিব ধরা দেন কখনো সময়ের সাক্ষী, কখনো ভবিষ্যতের দিশারি হিসেবে। বক্তারা অভিন্ন কণ্ঠে বলেন, মির্জা গালিব কেবল উর্দু-ফারসি কবিতার শ্রেষ্ঠ প্রতিভা নন—তিনি বিশ্বমানবতার কবি। তাঁর কবিতায় প্রেম ও বিরহের পাশাপাশি রয়েছে দর্শন, আত্মজিজ্ঞাসা, ঈশ্বরভাবনা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন—যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সাহিত্যের সম্মানে গালিবের নামে পুরস্কার অনুষ্ঠানের আবেগঘন এক মুহূর্তে গালিব সাহিত্য ও গবেষণায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মো. কামাল উদ্দিন এবং শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদ অধ্যক্ষ ড. মুহাম্মদ সানাউল্লাহ-কে ‘মির্জা গালিব সাহিত্য সম্মান পুরস্কার–২০২৬’ প্রদান করা হয়। এই সম্মাননা শুধু ব্যক্তি অর্জনের স্বীকৃতি নয়—বরং গালিবচর্চা ও মননশীল সাহিত্যচর্চার প্রতি এক প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধা। পুরস্কার প্রদানকালে বক্তারা বলেন, কামাল উদ্দিনের গবেষণামূলক সাহিত্যকর্ম এবং ড. সানাউল্লাহর ইতিহাসভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান নতুন প্রজন্মকে চিন্তাশীল পাঠে উদ্বুদ্ধ করবে এবং গালিবের মতো মননশীল কবিদের পাঠ আরও বিস্তৃত করবে। সাহিত্যপ্রেমী, গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো আয়োজনটি পরিণত হয় এক স্মরণীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়—যেখানে গালিব ছিলেন কেন্দ্রবিন্দুতে, আর শব্দ ছিল সেতু। এই স্মরণ সন্ধ্যা প্রমাণ করে—মির্জা গালিব শুধু ইতিহাসের কবি নন, তিনি আজও জীবিত মানুষের চিন্তা ও অনুভবের ভেতর।