-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের রাউজানে একটি ভিপি তালিকাভুক্ত সরকারি জমিকে ঘিরে চলমান একটি রিভিশন মামলা আপাতদৃষ্টিতে ভূমি প্রশাসনের নিয়মিত একটি বিরোধ মনে হতে পারে। কিন্তু নথির পাতার বাইরে তাকালে দেখা যায়—এটি আসলে ভূমিহীন, দরিদ্র ও পর্দানশীল নারীদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় বনাম কাগুজে ক্ষমতার সংঘর্ষ। এই জমিতে যারা বসবাস করছেন, তারা কোনো প্রভাবশালী মহল নন। তারা নদীভাঙনের শিকার। একসময় ঘর ছিল, ভিটে ছিল—নদী সব কেড়ে নিয়েছে। এরপর রাষ্ট্রের ভিপি তালিকাভুক্ত খালি জমিতে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ ছিল না। নদীভাঙন থেকে ভিপি জমি—একটি পরিচিত গল্প-বাংলাদেশে নদীভাঙনের গল্প নতুন নয়। রাউজানও এর ব্যতিক্রম নয়। বেগম মিনুয়ারা বেগমসহ কয়েকজন নারী নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন একটি সরকারি ভিপি জমিতে। সেই দখল ছিল প্রকাশ্য। রাতের আঁধারে নয়, দিনের আলোয়। তারা সেখানে ঘর তুলেছেন, গাছ লাগিয়েছেন, সন্তান বড় করেছেন। বছরের পর বছর ধরে সেই জমিই ছিল তাদের জীবন। তদন্তে উঠে আসে অন্য বাস্তবতা-
এই জমির ৩.৫০ একর অংশ ইজারা দেওয়া হয় শেখ জাহেদুল ইসলাম গং-এর নামে। কিন্তু পরে প্রশাসনিক তদন্তে যে তথ্য উঠে আসে, তা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সরেজমিনে সার্ভেয়ার ও কানুনগোর তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়—ইজারাকৃত ৩.৫০ একরের মধ্যে ১.৬৫ একর জমি দখলে রয়েছে ভূমিহীন নারীদের,আর প্রতিপক্ষের দখলে রয়েছে মাত্র ১.৮৫ একর। এই বাস্তবতার ভিত্তিতে ২০২১ সালের ৪ মার্চ সহকারী কমিশনার (ভূমি), রাউজান একটি সিদ্ধান্ত দেন—ইজারা চুক্তির শর্ত ভঙ্গের দায়ে প্রতিপক্ষের ইজারা আংশিক বাতিল করে ভূমিহীন নারীদের পক্ষে ইজারা প্রদানের নির্দেশ। কৃষিজমিতে কংক্রিট, কাগজে কৃষি
ইজারা চুক্তিতে জমির শ্রেণি ছিল কৃষি। অথচ অভিযোগ উঠে—বিনা অনুমতিতে শতাধিক পুরনো গাছ কাটা হয়েছে,সরকারি জমিতে সেমিপাকা ঘর নির্মাণের চেষ্টা হয়েছে। এমনকি নির্মাণ কাজ বন্ধ করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সরেজমিনে যেতে হয়। গাছ জব্দ হয়, কাজ বন্ধ হয়। প্রশ্ন হলো—এগুলো কি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ নয়? মজার বিষয় হলো, আপীল শুনানিতে প্রতিপক্ষ পক্ষ নিজেই স্বীকার করেছে—“বিনা অনুমতিতে কিছু গাছ কাটা হয়েছে।” কিন্তু সেই স্বীকারোক্তির আইনগত ও নৈতিক গুরুত্ব কোথায় হারিয়ে গেল? কারণহীন আপীল আদেশ- সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় আসে ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), চট্টগ্রাম সহকারী কমিশনারের আদেশ বাতিল করে আপীল মঞ্জুর করেন। কিন্তু সেই আদেশে নেই দখল প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ, চুক্তি ভঙ্গের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা, কিংবা ভূমিহীন নারীদের বাস্তব অবস্থার কোনো উল্লেখ। আইনের ভাষায় যাকে বলা হয়—Without finding, without reasoning।১১৩ বর্গফুটে সেমিপাকা ঘর?-আরও একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বলা হয়েছে, প্রতিপক্ষরা নাকি নিজেদের জমিতেই সেমিপাকা ঘর তুলেছেন। অথচ রেকর্ড বলছে—তাদের নিজস্ব জমির পরিমাণ মাত্র ১১৩ বর্গফুট।এই জায়গায় দুই চালা বিশিষ্ট সেমিপাকা ঘর—বাস্তবসম্মত কি? নাকি নির্মাণ হয়েছে সরকারি ভিপি জমিতেই? নিজেদের স্বীকারোক্তির মূল্য কোথায়?-আপীলের আর্জিতেই প্রতিপক্ষ স্বীকার করেছে—তাদের অনুমতিক্রমে ভূমিহীন নারীরা জমিতে দখলে আছেন। আইন অনুযায়ী এটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি। Evidence Act-এর Section 115 অনুযায়ী এখানে Estoppel কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু সেই আইন কোথায়? জমি নয়, প্রশ্নটা মানুষের- এই মামলার কেন্দ্রে ১.৬৫ একর জমি থাকলেও মূল প্রশ্ন জমির নয়। প্রশ্নটা হলো— রাষ্ট্র কি কেবল কাগজে শক্তিশালী পক্ষকে দেখে, নাকি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের বাস্তবতাকেও দেখে? ভূমিহীনদের জন্য যদি ভিপি জমি না থাকে, তবে সেই জমি কার? একজন সাংবাদিকের দায়-একজন সাংবাদিক হিসেবে এই মামলার নথি, প্রতিবেদন ও বাস্তবতা দেখার পর একটি প্রশ্নই সামনে আসে—আইন কি কেবল ফাইলে ন্যায়বিচার করে, নাকি মানুষের জীবনের প্রতিও তার দায় আছে? এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে—এই রাষ্ট্র আসলে কাদের জন্য।