-মো.কামাল উদ্দিনঃ
বর্মা কলোনির পরিচিত যুবনেতা, সেচ্ছাসেবক দলের নিবেদিত সাংগঠনিক কর্মী সবুজ—এক নির্মম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ছয় মাস কারাভোগের পর অবশেষে মুক্ত হয়েছেন। গতকাল বিকেলে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি এলাকায় ফিরতেই যেন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। ফুলের মালা, শ্লোগান, ব্যানার, আবেগ–সব মিলিয়ে এক বিশাল সমাবেশে বরণ করে নেয় তার কর্মী–সমর্থকরা। সবুজের মুক্তির দিনটি শুধুই একজন মানুষের স্বাধীনতা নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে প্রতিহিংসার শৃঙ্খল ভাঙার এক উপলব্ধি। তার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো স্থানীয় কুচক্রী মহল এবং প্রশাসনের একশ্রেণীর অসাধু পুলিশের ইন্ধনে সাজানো—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছিল তার পরিবার, সহযোগী নেতাকর্মী এবং এলাকাবাসী। সবুজের মুক্তির মধ্য দিয়ে সেই ষড়যন্ত্রের পর্দা আরও উন্মোচিত হলো বলে মনে করছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। মুক্তির পর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সবুজ বলেন, “মানুষের ভালোবাসা আমাকে সব সময় শক্তি দিয়েছে। আমি মিথ্যার কাছে কখনো মাথা নত করিনি। রাজনৈতিক জীবনে প্রতিশোধপরায়ণতা ও হয়রানির মুখোমুখি হয়েছি। আওয়ামী লীগের সময়েও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছি। আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিএনপিরই একজন কর্মী হয়েও একই নির্যাতনের মুখোমুখি হব—এটা ভাবিনি। তবুও সত্যের পথে থাকব, ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করে যাব।” তার এই বক্তব্য জনতার সামনে উচ্চারিত হলে现场 উপস্থিত কর্মীরা একযোগে শ্লোগান দেন—“সত্যের জয় হবে”, “সবুজ তুমি এগিয়ে যাও”, “দমে না দমে না”—এ যেন একটি প্রতিবাদী মনোভাবের প্রতিধ্বনি। সবুজ শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য নয়, মানুষের প্রতি তার আন্তরিকতা, দরিদ্রদের পাশে থাকা, অসহায় পরিবারে সাহায্যের হাত বাড়ানো—সব মিলিয়েই তিনি এলাকায় একজন নির্ভরযোগ্য মানবিক নেতা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সবুজের কাছে কোনো কর্মী নিরাশ হয়ে ফিরে আসেনি। দিন-রাত যোগাযোগ রাখতেন তাদের সাথে। তার ঘনিষ্ঠদের ভাষায় “সবুজকে না দেখলে বোঝা যায় না তার মানবিকতা কেমন। কাঁধে হাত রেখে কথা বলা, ছোট ভাইয়ের মতো পথ দেখানো—এসবই তাকে আলাদা করেছে।” কিন্তু সেই মানুষটিকেই লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে কিছু প্রভাবশালী মহল সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভিতরে জায়গা না দিতে ও স্থানীয় জনপ্রিয়তাকে দুর্বল করতে তার বিরুদ্ধে একটি সাজানো মামলার জাল বিস্তার করা হয়। অভিযোগ উঠেছে—কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা গোপনে সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হন। তদন্ত ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়; আদালতে নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার সুযোগও অস্বীকার করা হয়। অর্থাৎ সবুজ ছিলেন একটি উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রক্রিয়ার শিকার। সবুজ বলেন, “ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করলে নেতা হওয়া যায় না। আমাকে ভয় দেখানো হয়েছে, অপমান করা হয়েছে; কিন্তু আমার অন্তরের শক্তি কখনো দুর্বল হয়নি। আমি দলকে ভালোবাসি, নেতৃত্বকে সম্মান করি, মানুষের অধিকার রক্ষায় আমি আজীবন কাজ করে যাব।” তার মুক্তিতে বর্মা কলোনি, আশপাশের এলাকা, এমনকি শহরের কয়েকটি ওয়ার্ড থেকেও কর্মীরা ছুটে আসেন। সড়কজুড়ে ছিল ব্যানার, ফেস্টুন ও বিভিন্ন স্লোগান। অনেকেই তাকে চোখের পানি মুছতে মুছতে বুকে জড়িয়ে ধরেন। যেন দীর্ঘদিন হারিয়ে থাকা একজন আপনজন ফিরে এসেছে। একজন সিনিয়র কর্মী বলেন, “সবুজের বিরুদ্ধে মামলা হাস্যকর। এলাকার মানুষই জানে কে কী করেছে। কুচক্রী মহল যখন চেয়েছিল তাকে চুপ করাতে, তখনই তাদের পরিকল্পনা ব্যুমেরাং হলো। আজ মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়েছে।” সবুজকে বরণ শেষে এলাকায় ছোট পরিসরে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তার সুস্বাস্থ্য, রাজনৈতিক সাফল্য এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য দোয়া করা হয়। বক্তারা বলেন, সবুজের নেতৃত্বেই এলাকার সংগঠন নতুন মাত্রায় পৌঁছাবে। তার ওপর মানুষের আস্থা আছে, ভালোবাসা আছে, সাহস আছে—যা একজন রাজনৈতিক কর্মীর মূল শক্তি। মুক্তির পর তিনি বলেন, “এলাকার মানুষ, পরিবার, দলে যারা পাশে ছিলেন তাদের কাছে আমি ঋণী। কারাগারে থেকেও আমি জানতাম—অন্যায় টিকবে না। আমার রাজনৈতিক সংগ্রাম ন্যায়বিচারের পথে থাকবে।” সবুজ আজ প্রমাণ করলেন—একজন সাধারণ কর্মীও মানুষের শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। তার ফিরে আসা যেমন কর্মীদের আনন্দ দিয়েছে, তেমনি কুচক্রী মহলের মুখোশ উন্মোচিত করেছে। সত্যের হাতে পরাস্ত হয়েছে মিথ্যার তৈরি বাঁধন। এখন শুধু পথ সামনে—সংগঠনের গতিশীল রাজনীতি, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং একটি নতুন আন্দোলনের সূচনা। সবুজের মুক্তি তাই শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নয়; বরং সামষ্টিক নৈতিকতার জয়। দীর্ঘ ছয় মাসের বন্দিজীবন শেষ করে যখন সবুজ কারাগারের অন্ধকার ঘর থেকে বের হলেন, তখন তার চোখে ছিল অবসন্ন যন্ত্রণা, আর কণ্ঠে জমাট বাধা ক্ষোভের দীর্ঘশ্বাস। মুক্তির পর সাদা কালো মাল্টিমিডিয়া নিউজ হাউজকে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি তুলে ধরলেন সেই অমানবিক মুহূর্তগুলোর কথা—যে মুহূর্তগুলো তাকে শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, ব্যক্তিগতভাবেও ক্ষতবিক্ষত করেছে। সবুজ বলেন, “আমি রাজনীতিতে এসেছি মানুষের জন্য। অথচ আমাকে এমনভাবে অভিযুক্ত করা হলো যেন আমি অপরাধী। কোনো তদন্ত নেই, কোনো যাচাই নেই—কেবল কাগজে নাম লিখেই আমাকে তুলে নিয়ে গেল। আমার পরিবার কেঁদেছে, আমার শিশুরা ভয় পেয়েছে, আর আমি দেখেছি কীভাবে ক্ষমতার ছায়া সাধারণ মানুষের ওপর ছায়া ফেলতে পারে।” তিনি জানালেন, কিছু কুচক্রী মহল ও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ায়। সবুজের দাবি, ওই মামলার কোনো ভৌত প্রমাণ নেই, নেই কোনো প্রত্যক্ষ অভিযোগকারী। শুধুই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে তৈরি করা একটি সজ্জিত মামলা। সবুজ বলেন, “যখন আমাকে থানায় নেওয়া হয়, তখন আমি ভাবছিলাম—কারা আমাকে অন্ধকারে নামিয়ে দিল? থানায় থাকা অবস্থায় আমাকে কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি নিজের কথা বলার। যখন কারাগারে পাঠানো হলো, তখনও কারও মুখ থেকে একটি শব্দ শুনিনি—তুমি নির্দোষ।’ ওই মুহূর্তে বুঝেছি, ন্যায়বিচার কখনো কখনো শুধু কাগজের ভাষা।”কারাগারে কাটানো দিনগুলো তার কাছে ছিল মনস্তাত্ত্বিক এক পরীক্ষা। সংকীর্ণ কক্ষ, লোহার দরজা আর নিরব, নির্দয় রাত—সবুজ জানান, মাঝেমধ্যে ভাবতেন, হয়তো তাকে সচেতনভাবে ভেঙে দিতে চাওয়া হয়েছে। “একটা সময় মনে হচ্ছিল আমাকেই যেন মানিয়ে নিতে হবে এই অন্যায়ের সঙ্গে। কিন্তু কারাগারে থাকা কয়েদিদের চোখে যখন আমি সম্মান দেখলাম, যখন তারা বললো—‘ভাই, আপনি অন্যায় করেননি’—তখন বুঝলাম আমি একা নই।”
এক পর্যায়ে তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, “কারাগার আমাকে ভয় দেখাতে পারেনি। বরং আমাকে শক্ত করে দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করেছে, যারা মিথ্যাকে ঢাল বানিয়েছে—তাদের চেহারাই আজ স্পষ্ট।” সবুজ বলেন, “আমি মুসলমান, আমি রাজনীতির কর্মী—আমি শপথ করি, আমি কাউকে প্রতিশোধ নেব না। আমি শুধু সত্যের পক্ষে দাঁড়াব। মানুষ আমার পাশে আছে বলেই আমি বেঁচে আছি। বাইরে এসে যখন দেখলাম কর্মীরা অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে—জানি, আমার মুক্তির মূল্য আছে।” সাদা কালো মাল্টিমিডিয়া নিউজ হাউজকে দেওয়া তার এই জবানবন্দির প্রতিটি বাক্য যেন একটি গোপন অধ্যায়ের পৃষ্ঠা। যেখানে রয়েছে ষড়যন্ত্রের রেখাচিত্র, অসহায়তার অন্তরাল, কারাগারের নিঃসঙ্গ বাতাস আর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নতুন যাত্রা শুরু করার প্রেরণা। এই জবানবন্দির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হলো সবুজের গল্প—একজন রাজনৈতিক কর্মীর বন্দিত্ব, প্রতিরোধ, নীরব কান্না এবং অবশেষে সত্যের পাশে দাঁড়িয়ে ফিরে আসা।