জামাল উদ্দিন-স্টাফ রিপোর্টার,
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ছেলে হত্যার ন্যায়বিচার চেয়ে এক মায়ের আর্তনাদ আজ নতুন মাত্রায় আলোড়ন তুলেছে। ছেলে হারানোর বেদনাবিধুর শোকে ভেঙে পড়া সেই মা— মোছাঃ ছেনোয়ারা বেগম (৫০)— এবার নিজেকে অসহায় দেখছেন সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেই, যাদের কাছে তিনি নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। গত ৩০ নভেম্বর ২০২৫, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন— নিরাপত্তার জন্য করা জিডি এখন তাঁর নতুন ভয়, নতুন আতঙ্ক, নতুন শাস্তিতে পরিণত হয়েছে। মোছাঃ ছেনোয়ারা বেগমের ছেলে মোঃ ফরিদ ২৭ সেপ্টেম্বর আকস্মিক মৃত্যু বরণ করেন। পরিবারের অভিযোগ— এই মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। এ কারণে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে শুরু হয় জবরদখলের পাঁয়তারা, আর পরিবারকে দেয়া হয় নানান হুমকি-ধমকি, গালিগালাজ ও ভয়ভীতি। এ অবস্থায় নিজের, পরিবারের ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা চেয়ে তিনি ২৩ নভেম্বর আনোয়ারা থানায় সাধারণ ডায়েরি নং— ১২৩১, ট্র্যাকিং কোড— UCPZ3M করেন। কিন্তু এখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনের আরেক দুঃস্বপ্ন। অভিযোগকারী জানিয়েছেন, জিডির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর এএসআই মোঃ নুরুল আফছার: দিনের পর দিন থানায় ডেকে রাখা হয়, অভিযোগের বিষয়ে কোনো সহায়তা না দিয়ে বরং প্রশ্ন করা হয় কেন মামলা করছেন। একজন সাধারণ নারী, ছেলেহারা মা—তাকে জোরপূর্বক ‘খালি কাগজে স্বাক্ষর’ করানো বাংলাদেশের আইন ও পুলিশ রুলসের চরম লঙ্ঘন। “কেন মামলা করতে চান?” “কেন পত্রিকায় সংবাদ দিয়েছেন?”তদন্ত কর্মকর্তার এমন প্রশ্নে বিস্মিত সাধারণ মানুষ। ফরিদকে উদ্ধারকারী সিএনজি চালক টিপু ঘোষকে প্রকাশ্যেই মারধর করা হয়। তাকে বলা হয়— “শাহাদাতদের নাম বললে উল্টো তোমার ওপর মামলা দেব।” টানা তিনদিন (২৭–২৯ নভেম্বর) উল্টোপাল্টা জিজ্ঞাসাবাদে হয়রানি। রাতে ১১টার সময় একজন নারীকে থানায় ডেকে চরম চাপ প্রয়োগ। এটি আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
ছেনোয়ারা বেগম অভিযোগে লিখেছেন— “আমার ছেলে মারা গেছে। আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। কিন্তু এএসআই আফছার আমাকে এমনভাবে চাপে রাখছেন যেন আমি আমার ছেলের হত্যার বিচারই চাই না।” তিনি বলেন— “যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি তারা হুমকি দিচ্ছে— আর থানায় গেলে পুলিশই আবার ভয় দেখায়!” এমন শারীরিক, মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনে তিনি এখন সম্পূর্ণভাবে রাত-দিন নিরাপত্তাহীনতায়। ফরিদের মৃত্যু নিয়ে আদালতে হত্যা মামলা দাখিল হয়েছে। মামলাটি এখন আদেশের অপেক্ষায়। আদালতের বাইরে পুলিশের এমন ‘গোপন তদন্তের চেষ্টা’ স্থানীয় আইনজীবীদের ভাষায়—
“এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, অসদাচরণ এবং মামলাকে বিভ্রান্ত করার স্পষ্ট প্রচেষ্টা।” ছেনোয়ারা বেগমের দৃঢ় বিশ্বাস—
“এএসআই আফছার বিবাদীদের পক্ষে কাজ করছেন।” তিনি পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন—
১. এএসআই নুরুল আফছারের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা। ২. তাকে তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহার। ৩. তার পরিবারের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত। ৪. জিডি তদন্তের জন্য নিরপেক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ। এ ঘটনা প্রকাশের পর এলাকায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মানুষ বলছে— “যাদের কাছে নিরাপত্তা চাইতে যায়, তারাই যখন ভয় দেখায়— তখন সাধারণ মানুষ বাঁচবে কোথায়?” মানবাধিকার কর্মীর ভাষায়— “একজন মায়ের আর্তনাদ যেন আবারও প্রমাণ করছে— বিচার চাইতে গেলে ভুক্তভোগীকেই হয়রানির শিকার হতে হয়।” আমাদের নিউজ হাউজ তাঁর বক্তব্য প্রকাশের জন্য উন্মুক্ত। তিনি চাইলে লিখিত বা মৌখিকভাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবেন। ছেলে হারানোর শোকে বিধ্বস্ত এক মা—আজ ন্যায়বিচারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দেখছেন পুলিশের একটি অংশকে। যে থানায় তিনি নিরাপত্তা চাইতে গিয়েছিলেন
সেই থানাই আজ তাঁর নতুন আতঙ্ক, নতুন প্রতিপক্ষ। চট্টগ্রাম জেলার মানুষ এখন তাকিয়ে আছে— পুলিশ সুপার কি এই মায়ের আর্তনাদ শুনবেন? দোষীকে শাস্তি দেবেন? নাকি আরেকটি মা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দীর্ঘশ্বাস নিয়ে পথের ধুলোয় হারিয়ে যাবে?