মো. জামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল ইসলামকে আদালতের নির্দেশে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল আট মাস আগে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তিনি এখনো একই থানায় বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ—তিনি থানার প্রভাব খাটিয়ে শুধু নিজের বদলি ঠেকিয়ে রাখেননি, বরং ভূমিদস্যু ও নারী পাচারচক্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজেকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন। সম্প্রতি পশ্চিম শহীদ নগর এলাকার বাসিন্দা মরিয়ম বেগম (স্বামী: মরহুম ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মাহফুজুল হক) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। সেই অভিযোগে তিনি এসআই নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধ দখলচেষ্টা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জাল দলিল প্রক্রিয়ায় সহায়তা, এবং আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে হয়রানি—এই চারটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। অভিযোগের বিবরণ -অভিযোগে বলা হয়েছে, মরিয়ম বেগমের স্বামী ১৯৯৩ সালে বি.এস. খতিয়ান নং ৪৮৬/৩ এর অধীনে পশ্চিম শহীদ নগর এলাকায় একটি জমি ক্রয় করেন। সেই জমিতে সীমানা প্রাচীর ও দুটি টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করে পরিবারটি দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। পরবর্তীতে স্বামীর মৃত্যুর পর মরিয়ম বেগম ও তাঁর সন্তানরা জমির বৈধ মালিক হিসেবে নামজারি ও কর-খাজনা প্রদান করে ভোগদখল বজায় রাখেন। তিনি ঐ স্থানে ‘মরিয়ম টি স্টল ও কুলিং কর্ণার’ নামে একটি ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যার বৈধ ই-ট্রেড লাইসেন্স নম্বর TRAD/CHTG/028270/2024। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি আবুল হাশেম এবং তাঁর মেয়ে শারমিন আক্তার, যাদের বিরুদ্ধে মাদক, নারী পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তারা জমিটি দখলের পাঁয়তারা করছে। এই চেষ্টায় তাদের প্রত্যক্ষ সহায়তা দিচ্ছেন এসআই নুরুল ইসলাম, এমনটাই দাবি অভিযোগকারীর। ভয়ভীতি ও হুমকির অভিযোগ- মরিয়ম বেগম অভিযোগে লিখেছেন— “আমি যখন তাদের অবৈধ দখলের প্রতিবাদ করি, তখন এসআই নুরুল ইসলাম নিজেই আমাকে হুমকি দেন যে, আমি ও আমার সন্তানরা যদি আর কথা বলি, তাহলে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে মামলা দিয়ে সর্বনাশ করে দেবেন। এমনকি ভাড়াটে সন্ত্রাসী দ্বারা অপহরণ বা হত্যা করে গুম করে ফেলবেন বলেও হুমকি দেন।” তিনি আরও বলেন, “তাঁর (এসআই নুরুল) মতো একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ অমানবিক। থানায় গেলে তিনি ভূমিদস্যুদের পক্ষ নিয়ে উল্টো আমাকে অপমান করেন।” বদলির পরও বহাল তবিয়তে! চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, এসআই নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে বদলির আদেশ জারি হয়। কিন্তু অজানা কারণে তিনি এখনো বায়েজিদ থানায় অবস্থান করছেন। অভিযোগকারীর দাবি, “তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে বদলি ঠেকিয়ে রেখেছেন। কারণ, এখানেই তাঁর ‘স্বার্থের ক্ষেত্র’। এখানে থাকলেই তিনি ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে সুবিধা নিতে পারেন।” স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে তিনি জমি দখল, জবরদখল মামলায় অর্থের বিনিময়ে পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন।অভিযোগ আদালতে গড়িয়েছে-বিষয়টি আদালতের নজরে আসার পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (৩য় আদালত) এ মরিয়ম বেগম সি.আর. মামলা নং—/২০২৫ দায়ের করেন। আদালত মামলার তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে আবুল হাশেম ও শারমিন আক্তারসহ আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসআই নুরুল ইসলাম আদালতের নির্দেশ অমান্য করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর না করে বরং আসামীদের সঙ্গে মিলে মামলাকারীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন। জনমনে ক্ষোভ-পশ্চিম শহীদ নগর এলাকার অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এসআই নুরুল ইসলাম থানায় যোগদানের পর থেকেই এলাকার চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও নারী পাচারচক্রের আস্ফালন বেড়েছে। এক স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা দেখেছি, তিনি প্রায়ই কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসীর সঙ্গে ওঠাবসা করেন। তাঁর মতো অফিসারদের জন্যই পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।” তফসিলভুক্ত জমির বিবরণ মৌজা: পাঁচলাইশ │ থানা: পাঁচলাইশ │ জেলা: চট্টগ্রাম
খতিয়ান নং: ৪৮৬/৩ ও ১২৩৪৬ │ দাগ নং: ৭৩৪৬ ও ৭৩৪৭ │ আয়তন: ০.০৪৬২ একর │ তদস্থিত: সেমিপাকা দোকানঘর ও গোডাউন। পুলিশ কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ-চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মরিয়ম বেগম তাঁর আবেদনে বলেন, “আমাকে এবং আমার পরিবারকে নিরাপত্তা প্রদানসহ বিবাদীদের অন্যায় দখলচেষ্টা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হোক। এসআই নুরুল ইসলামের ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।” চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমিদস্যু ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে সাধারণ নাগরিকদের হয়রানি বেড়েছে—এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে। এই ঘটনাটি সেই দীর্ঘ তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, পুলিশ কমিশনার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এসআই নুরুল ইসলামকে প্রত্যাহার ও অভিযুক্ত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা আরও ক্ষুণ্ণ হবে। প্রতিবেদকের মতামত:অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও, অভিযুক্ত এসআই নুরুল ইসলামের বক্তব্য জানার জন্য বারবার চেষ্টা করেও তাকে মোবাইলে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবু ঘটনাটি পুলিশ প্রশাসনের নজরে এনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।