--মো. কামাল উদ্দিনঃ
৭ই নভেম্বর, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। এটি শুধু একটি তারিখ নয়, বরং আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায়। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সৈনিকদের কতটুকু আস্তাবাজন ও প্রাণপ্রীয় অফিসার ছিল তা একটু ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর এর জিয়াউর রহমানকে সৈনিকদের উদ্ধারের অংশের কিছু কথা শুনার দরকার -- টু-ফিল্ডে রেজিমেন্ট আর্টিলারির এ রকম একটি দল মেজর মহিউদ্দিন, মোস্তফা ও সুবেদার মেজর আনিসুল হক কিছু সৈনিক নিয়ে প্রস্তুত থাকে। রাত বারোটায় সেপাই বিদ্রোহ শুরু হওয়ার সাথে সাথে এই গ্রুপটিই প্রথম জিয়ার বাসভবনের গেটে গিয়ে হাজির হয়। এই একটি মাত্র গ্রুপেই অফিসার থাকায় তারা তারা অন্যদের টেক্কা দিয়ে তড়িৎ প্ল্যান অনুযায়ী কাজ করতে পারে, বাকিরা পৌঁছুবার আগেই। তারা জিয়ার বাসভবনের গার্ডদের বুঝিয়ে বলল, সেপাই সেপাই-ভাই ভাই। এখন থেকে সেপাই বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। আমরা সবাই জিয়াকে মুক্ত করতে এসেছি। তোমরা গেট খুলে দাও। ততক্ষণে আশে পাশে বেশকিছু সৈনিক শ্লোগান তুলতে শুরু করেছে। বিপ্লবী ভাইদের ডাকে সাধারণ সৈনিকরাও ব্যারাক ছেড়ে ছুটে আসছে রাস্তায়। 'সেপাই সেপাই-ভাই ভাই! জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ।' মেজর মহিউদ্দিন, সুবেদার মেজর আনিস এবং টু-ফিল্ডের কিছু সৈনিক যখন জিয়ার বাসার গেটে পৌঁছে যায়, তখন চতুর্দিকে ভীষণ ফায়ারিং চলছে। ফার্স্ট বেঙ্গলের গার্ডরা যারা তাকে বন্দী করে রেখেছিল, প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করে শূন্যে ফায়ার করতে করতে পেছন দিকে পালিয়ে গেল। মহিউদ্দিনের লোকজন জিয়ার বাসার ছাদ লক্ষ্য করে কয়েকবার অটোমেটিক ব্রাশ ফায়ার করলো। ভেতর থেকে গার্ডরা আর কোন জবাব দিল না। তখন তারা রাইফেলের বাট দিয়ে ঠেলে গেট ভেঙে ফেলে ভেতরে ঢোকে। এই সময় জিয়ার ড্রাইভার বেরিয়ে আসে। সে শ্লোগানমুখর সৈনিকদের জিয়ার বাসার পশ্চিম পাশে কিচেন রুমের দিকে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তারা দরজা খোলার জন্য চিৎকার দিতে থাকে। জিয়া এবং বেগম জিয়া তখন করিডোরে বেরিয়ে আসেন। এই সময় বাসার চারিদিকে ফায়ারিং চলছিল। বহু সৈনিক চিৎকার দিতে দিতে বাসায় ঢুকে পড়লো। উত্তেজনায় ভরপুর প্রতিটি মুহুর্ত। মহিউদ্দিন বললোঃ 'স্যার আমরা আপনাকে নিতে এসেছি। আপনি আসুন।' জিয়া বললেন দেখ, 'আমি এখন রিটায়ার করেছি। আমি কিছুর মধ্যে নাই। আমি কোথাও যাব না। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।' চারট 'স্যার আমরা আপনাকে নিতে এসেছি। আমরা নিয়েই যাব। আপনাকে আমরা আবার চীফ বানাতে চাই। দোহাই আল্লাহর। আপনি আসুন।' মহিউদ্দিনের দৃঢ় আহ্বান। বেগম জিয়া পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এরকম গোলাগুলি ও গণ্ডগোলের মধ্যে স্বামীকে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তিনিও বললেন, 'দেখুন ভাই, আমরা রিটায়ার করেছি। আমাদের নিয়ে টানাটানি করবেন না। দয়া করে আমাদের ছেড়ে দিন।' মহিউদ্দিন বলল, 'স্যার আপনাকে যেতেই হবে। আপনি আসুন।' বলেই মহিউদ্দিন, আনিস ও অন্যান্য সেপাইরা তাকে একেবারে চ্যাংদোলা করে কাঁধে উঠিয়ে অপেক্ষমান জীপে নিয়ে তুলে ফেলল। চতুর্দিকে শ্লোগান উঠলো। আল্লাহু আকবার। 'জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ।''সেপাই সেপাই ভাই ভাই।' বেগম খালেদা জিয়া তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে অতীব উৎকণ্ঠা ও আনন্দের সাথে অপূর্ব দৃশ্য অবলোকন করে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইলেন। ততক্ষণে আরো বহু সৈনিক, বহু বিপ্লবী এদিক সেদিক থেকে ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে গেছে। জিয়াকে মুক্ত দেখে সবার আনন্দের সীমা নাই। চতুর্দিকে মুহুর্মুহু শ্লোগান। 'জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ।' তারা সবাই জীপ ঠেলে নিয়ে চলল টু-ফিল্ড লাইনের দিকে। আর্টিলারির সৈনিকরা তাকে বিপুলভাবে ঘেরাও করে রেখেছে। তারাই প্রথম তাকে বের করে এনেছে। বেঙ্গল রেজিমেন্টকে টপকে যান্ত্রিক ইউনিটরা আবারো একটি গৌরব ছিনিয়ে নিল। অবশ্য গোলন্দাজদের লাইনে জিয়াকে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই পাশের ইউনিট ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল আমিনুল হক টু-ফিল্ডে হাজির হন। তাকে দেখে জিয়া খুব খুশি হন। ৪র্থ বেঙ্গল খালেদ মোশাররফকে মদদ দিচ্ছিল। এবার কর্ণেল আমিন বেশ কিছু সৈন্য নিয়ে জিয়ার পাশে এসে দাঁড়ালো। তার এ্যাডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন মুনীরও এলো। বেঙ্গল রেজিমেন্টও পাশে রয়েছে দেখে তিনি আশ্বস্ত হলেন। তখন সেই মৃত্যুর পথ থেকে মুক্ত হয়ে সেনাবাহিনী ও জাতির উদ্দেশ্য তিনি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা নিরিখে ভাষন দিয়েছেন,এই দিনটি নিয়ে কথা লিখতে গেলে লেখা শেষ হবেনা তবুও- ১৯৭৫ সালের এই দিনটি ছিল এমন একটি মুহূর্ত যখন সেনাবাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই দিনটি মূলত স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণের প্রতীক, যেখানে জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার তাগিদে মানুষ সকল বাধা পেরিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের সেই সময়কাল ছিল এক অস্থির এবং সংকটময় অধ্যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ছিল বিভ্রান্ত, নেতৃত্ব ছিল বিভাজিত, আর সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল হতাশা। এমন এক দুঃসময়ে জনগণ আর সেনাবাহিনীর মধ্যে যে সমন্বিত প্রয়াসের সূচনা ঘটে, তা হয়ে ওঠে নতুন এক বিপ্লবের সূচনা। রাষ্ট্রের স্থিতি এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে নতুন করে দেশকে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা সেদিন দেশের প্রতিটি কোণায় প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। ৭ই নভেম্বর বিপ্লব দিবসের মূল লক্ষ্য ছিল সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের ক্ষমতায়ন। জনগণের ইচ্ছা এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থনে গঠিত সেই ঐক্য ছিল দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই বিপ্লব একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করেছিল—সকল সংকটের মধ্যেও জাতি ঐক্যবদ্ধ থেকে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। বিপ্লব দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দেশের জন্য সত্যিকার পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন জনগণ ও নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমর্থন থাকে। এই দিনটি আমাদের দায়িত্ববোধ, সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের প্রতীক, যা আজও প্রেরণা যোগায় সকল সংগ্রামী চেতনার জন্য। বিপ্লব দিবসের শিক্ষা হলো, স্বাধীনতা এবং ন্যায়ের সংগ্রামে ঐক্য এবং সততা সর্বোপরি। দেশপ্রেমের এই দিনটি উদযাপন শুধু অতীত স্মরণের জন্য নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য আমাদের সকলকে উজ্জীবিত করতে।৭ই নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা "জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস" হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের এই দিনটিতে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চিত্রকে আমূল বদলে দিয়েছিল। ৭ই নভেম্বরের পটভূমি আসলে ১৫ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয় এবং দেশ এক গভীর সংকটের মধ্যে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। এই অস্থিরতার মধ্যেই ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতা দখল নিয়ে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশে বিভক্তি সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং গণ-অসন্তোষ চরমে পৌঁছায়। সেনাবাহিনীতে একটি শক্তিশালী সেক্টর মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়। তাদের দাবি ছিল যে সেনাবাহিনীর হাল ফিরিয়ে আনতে নেতৃত্বে একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার প্রয়োজন। সেনাবাহিনীর একটি গোষ্ঠী বিশ্বাস করতো যে, দেশকে এই অস্থিরতা থেকে বের করে আনার জন্য শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রয়োজন, এবং তাদের কাছে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান একজন উপযুক্ত নেতা ছিলেন।
৭ নভেম্বরের রাতে সিপাহী-জনতা মিলিত হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং তারা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে এবং বাইরে গুলি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সেদিন সৈন্যদের কাছে একটি মাত্র দাবি ছিল - দেশের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নতুন নেতৃত্ব। তাদের এই আন্দোলনের মাধ্যমে তারা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন এবং তাকে নেতৃত্বে নিয়ে আসেন।
৭ই নভেম্বরের ঘটনার পর জিয়াউর রহমান দেশকে শান্ত ও স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনরায় সংগঠিত করেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এছাড়াও, ১৯৭৮ সালে তিনি একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে পরিচিত হয়। এই দিনটি "জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস" হিসেবে উদযাপিত হয়, কারণ এই দিনটি দেশের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর সংহতির প্রতীক। ৭ই নভেম্বর শুধু জিয়াউর রহমানের পুনরুত্থান নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে, যেখানে দেশবাসী জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল।১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের ১ থেকে ৭ তারিখের মধ্যকার ঘটনাবলি বাংলাদেশে অন্যতম অস্থির ও রাজনৈতিকভাবে জটিল একটি সময়। এ সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তৎকালীন সেনাবাহিনী এবং বিশেষভাবে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর এই সময়েই দেশ ব্যাপক রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়ে এবং ক্ষমতার পরিবর্তন এবং বিভিন্ন অভ্যুত্থান হয়, যার বেশিরভাগই ছিল সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত। ঘটনার ক্রমঃ ১ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বরের সময়কালে দেশের অভ্যন্তরে সামরিক অভ্যুত্থান, ষড়যন্ত্র, এবং ক্ষমতার জন্য দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থান ঘটে, যার ফলে ৩ নভেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। এই সময়েই জেনারেল খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু সামরিক বাহিনীর একটি অংশ, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কিছু মুক্তিযোদ্ধা, খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বকে মেনে নিতে পারেননি। ৭ নভেম্বরের ভোরে সংঘটিত হয় "সিপাহী-জনতার বিপ্লব" বা "মুক্তি দিবস" নামে খ্যাত একটি উলট-পালট। সৈনিকদের মধ্যে জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল এবং ক্ষমতার দখলের জন্য সৈনিকেরা প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। কর্নেল তাহেরের সক্রিয় সমর্থনে সৈনিকদের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয় এবং দেশের রাজনীতিতে নতুন মোড় আসে। ঐ দিনেই জেনারেল খালেদ মোশাররফ নিহত হন এবং ক্ষমতায় পূর্ণরূপে অধিষ্ঠিত হন জিয়াউর রহমান।এসময়কার ঘটনাগুলির প্রধান নায়ক ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যিনি সিপাহী-জনতার মাধ্যমে মুক্তি লাভ করে পুনরায় দেশের সামরিক শক্তির অধিপতি হন। তবে কর্নেল তাহের এই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং উদ্দীপনাদাতা ছিলেন, যিনি সৈনিকদের উত্থানে উৎসাহিত করেছিলেন। ঘটনার দায় বিভিন্নভাবে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল শাফায়াত জামিল, এবং কর্নেল তাহেরের উপর বর্তায়, যেহেতু তাদের সকলেরই ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা ছিল। পরিশেষে জিয়াউর রহমানের অবদানঃ ৭ নভেম্বরের ঘটনার পর জিয়াউর রহমান দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করেন এবং রাষ্ট্রকে নতুন পথে পরিচালিত করতে চেষ্টা করেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশ সামরিক শাসনের ছায়ায় ছিল, তবে তিনি গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে তাঁর বর্ণিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ গুলিতে প্রকাশ পায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় এই দিনটিকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে স্মরণ করা হতো, বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের জীবন রক্ষার পর তার নেতৃত্বে সেদিন ঘটে যাওয়া সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিপ্লব এবং সেই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার গল্প এখনো ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে। এ দিবসটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। জিয়াউর রহমানের সাহসী পদক্ষেপ, দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা পুনঃস্থাপন এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা সেই সময়ে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। জনগণের কাছে এ দিনটি এক সার্থক বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত হয়, যা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করেছিল।
কিন্তু, শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর, এই ঐতিহাসিক দিনটি সরকারি স্বীকৃতির বাইরে চলে যায়। তারা ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করা বন্ধ করে দেন। এ সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। কেননা, ইতিহাসের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনকে উপেক্ষা করা মানে ইতিহাসের এক দিককে মুছে ফেলার প্রচেষ্টা বলা চলে। এটি প্রকারান্তরে আমাদের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায়কে ভুলে যাওয়ার শামিল। শেখ হাসিনার এ সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং একপক্ষীয় মনে হয়েছে। ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনারই বিভিন্ন মাত্রা থাকে, কিন্তু একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে সেগুলোর কোনো দিককে মুছে ফেলা সঠিক নয়। জাতি হিসেবে আমাদের উচিত ছিল ঐক্যের বার্তা দিতে এবং দেশের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর স্বীকৃতি প্রদান করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিকভাবে ইতিহাস জানতে পারে। সুতরাং, এই সিদ্ধান্তকে পুনর্বিবেচনার দাবি আছে। শেখ হাসিনা সরকারের উচিত ছিলো ইতিহাসের এই দিনটিকে তার প্রাপ্য সম্মান দিয়ে জাতির সামনে উপস্থাপন করার। লেখকঃ চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান ও যুগ্ন সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আওয়াজ ও The Daily banner এবং গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক।