--মো.কামাল উদ্দিনঃ
চেরাগি পাহাড়ের বিকেল তখন ক্লান্ত আলোয় ঢেকে গেছে। বাতাসে হালকা ধুলোর গন্ধ, চারপাশে রিকশার ঘণ্টাধ্বনি মিলেমিশে এক অচেনা ছন্দ তৈরি করছে। আমি কাজীর দেউরি ভিআইপি টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে অফিসে যাবো বলে এক রিকশায় উঠলাম। রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বললাম, —“ভাই, অফিসের সামনে যাবো, ভাড়া কত?” সে বলল, “চল্লিশ টাকা।” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “ভাংতি আছে তো?” সে একটু হাসলো, বলল, “হ্যা ভাই, আছে।” একটা সাধারণ আলাপ, তুচ্ছ মনে হওয়ার মতো ঘটনা। কিন্তু সেই ছোট্ট মুহূর্তটা আমাকে আজ ভাবিয়ে তুলেছে—মানুষ হিসেবে আমরা কতখানি মানবিক হতে পারি, আর কতখানি অমানুষ হয়ে উঠতে পারি, তার একটা আয়না যেন এই ক্ষুদ্র লেনদেনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। অফিসের সামনে এসে আমি তাকে ২০০ টাকার একটা নোট দিলাম। সে পকেট থেকে ভাঁজ করা কিছু টাকা বের করে গুনে ১৫০ টাকা ফেরত দিল। সব ঠিকঠাক, শান্তিপূর্ণ। কোনো তর্ক নেই, ঝামেলা নেই, বিরক্তির ছায়াও নেই। কিন্তু আমি জানি—এই স্বাভাবিকতার পেছনে আছে আমার আগের সেই দুইটি প্রশ্ন—ভাড়া কত এবং ভাংতি আছে কি না। এই দুইটি প্রশ্নই হয়তো আমাকে একটি অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া, অপমান কিংবা অমানবিক আচরণ থেকে বাঁচিয়েছে। ভাবুন, যদি আমি তাকে কিছু না জিজ্ঞেস করে উঠতাম? যদি পৌঁছে ২০০ টাকার নোট দিতাম, আর সে বলত—“ভাংতি নাই ভাই।” তাহলে? হয়তো আমার মুখ গরম হয়ে উঠত, হয়তো বিরক্ত হয়ে বলতাম—“তোমাদের এই এক সমস্যা, কোনো কিছুর ভাংতি থাকে না।” হয়তো তাকে দোকানে পাঠিয়ে দিতাম নোট ভাঙাতে। সে হয়তো দোকান থেকে কিছু কিনে ভাংতি আনতে যেত, আমি তখন মনে মনে সন্দেহ করতাম—“এই লোকটা কি আমার টাকা নিয়ে পালাবে না তো?” আর যদি দোকান থেকে দেরি হতো, আমি হয়তো চিৎকার করতাম, “তুই চোর! এই শহরে তোদের জন্যই বিশৃঙ্খলা!” হয়তো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের সামনে তাকে ধমক দিতাম, বাহাদুরি দেখিয়ে অফিসে ঢুকে যেতাম। এটাই কি সভ্যতা? এটাই কি মানুষ হওয়ার অর্থ? আমরা, তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণি, রিকশা চালক, দিনমজুর, মুচি, ভিক্ষুক—তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করি যেন তারা মানুষ নয়, কোনো নিচু জাতের প্রাণী। আমাদের মধ্যে অনেকেই ধর্মকর্মে নিয়মিত, মানবতার কথা মুখে মুখে বলি, সমাজের অনাচারের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিই—কিন্তু বাস্তবে আমাদের আচরণের ভেতর লুকিয়ে থাকে এক ভয়াবহ নির্মমতা। এই লেখাটি আমি শুধু লিখছি না, অনুভব করছি। আমি আজ যে ছবিটি তুলেছি, তাতে আমি একজন রিকশা চালককে ভাড়া পরিশোধ করছি—দেখতে যতটা সাধারণ, তাতে লুকিয়ে আছে গভীর বার্তা। এই ছবিটা যেন শহরের মানুষের কাছে এক নীরব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে— আমরা আসলেই কি মানুষ? না কি মুখে মুখে ‘মানবতা’ শব্দটি উচ্চারণ করে আমরা আসলে দানব হয়ে উঠেছি? চলুন, আমরা একটু ভাবি— একজন রিকশা চালকের দিন কেমন কাটে? ভোরের আলো ফুটতেই সে ঘুম থেকে ওঠে, হয়তো বাচ্চার জন্য দুধ আনতে পারেনি, হয়তো আগের রাতের খাবার শেষ হয়নি ক্ষুধায়। তবুও সে বেরিয়ে পড়ে রিকশা নিয়ে। হাতে কয়েকটি কয়েন, চোখে ক্লান্তি, মনে আশার এক ক্ষীণ আলো—আজ হয়তো ভালো রোজগার হবে। কিন্তু শহরের গরমে, রোদে, ধুলায়, ট্রাফিকের জ্যামে, সিগন্যালের লাল আলোয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়, তবুও সে চালিয়ে যায় কারণ পেট তো থামে না। এমন মানুষকেই আমরা এক মুহূর্তে অপমান করি, তার কণ্ঠে যুক্তি শুনি না, তার মুখের দিকে তাকিয়ে গালাগাল করি। আমরা ভুলে যাই—সে আমাদের মতোই মানুষ, তারও অনুভূতি আছে, তারও একদিন ছিল স্বপ্ন। এই অমানবিকতার চক্রটাই আমাদের সমাজকে ধীরে ধীরে বিবেকহীন করে ফেলেছে। আমরা এখন মানুষকে দেখি পেশার চোখে, নয়তো টাকার চোখে। একজন রিকশা চালক, চায়ের দোকানি বা পথের ফুল বিক্রেতা—তাদের সঙ্গে আমাদের ব্যবহার যেন একধরনের সামাজিক শ্রেণিবৈষম্যের প্রতিফলন। আমরা নিজেদের মহান ভাবতে ভালোবাসি, কিন্তু একবারও ভাবি না—যে মানুষটা ঘাম ঝরিয়ে আমার ভার বইছে, সে আমার চেয়ে কম মানুষ নয়। রিকশা চালকের কাছে আপনার ১০ টাকার মূল্য হয়তো একবেলার খাবার। আপনার কাছে সেই ১০ টাকা তুচ্ছ, কিন্তু তার জন্য সেটা বেঁচে থাকার অংশ। তাই যদি কোনো দিন কেউ ১০ টাকা বেশি নেয়, তাতে আপনি গরীব হয়ে যাবেন না, কিন্তু সেই মানুষটি হয়তো ঘরে এক মুঠো চাল কিনে নিতে পারবে। এই বোঝাপড়াটুকুই মানুষ হওয়ার আসল মানদণ্ড। একবার ভেবে দেখুন— আমরা অনেকেই সকালবেলা অফিসে যাওয়ার পথে রিকশাওয়ালাকে ধমক দিই, বিকেলে কোনো মানবাধিকার সেমিনারে গিয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের কথা বলে হাততালি দিই। এ কেমন দ্বিচারিতা! যে মানুষকে আমরা সকালে অপমান করেছি, বিকেলে তার নামেই বক্তৃতা দিই। এ যেন এমন এক সমাজ, যেখানে মুখে মুখে মানবতা আর বাস্তবে অমানুষতা। আমরা যদি সামান্য সচেতন হই, এই সমাজটা বদলে যেতে পারে। রিকশায় উঠার আগে একটু হাসিমুখে বলুন, —“ভাই, ভাড়া কত?” আর জিজ্ঞেস করুন, “ভাংতি আছে?” যদি না থাকে, নিজের দায়িত্বে ভাংতি জোগাড় করুন। কারণ আপনার পরিচিত জায়গায় আপনি সহজেই টাকা ভাঙাতে পারেন, কিন্তু সেই মানুষটার তো তেমন পরিচয় নেই। সে শহরে অপরিচিত, গরমে, বৃষ্টিতে, রাস্তায় ঘাম ঝরিয়ে দিন কাটায়— তবু সম্মান চায় না, চায় শুধু একটু মানবিক আচরণ।মানুষ হওয়া মানে শুধু শিক্ষা নয়, মানে সহমর্মিতা। একটি ধন্যবাদ, একটি হাসি, কিংবা বিনা রাগে বলা—“ঠিক আছে ভাই, আজ নিন”—এই শব্দগুলোই হয়তো কারও সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে পারে। আপনি জানেন না, হয়তো আপনার হাসি দেখেই সেই রিকশা চালক আবারও সাহস পাবে বাঁচার। রিকশা চালক আপনাকে শুধু গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না, সে প্রতিদিন আপনার বিবেককে পরীক্ষা করে। আপনি তার সঙ্গে কেমন আচরণ করলেন, সেটিই নির্ধারণ করে আপনি কতটা মানুষ। আজকের এই ছবিটি আমি তুলেছি শুধু এক ভাড়া পরিশোধের দৃশ্য হিসেবে নয়— এটি এক সমাজের আত্মদর্শন। একটি আয়না, যেখানে স্পষ্ট দেখা যায়— আমরা কতটা স্বার্থপর, কতটা অহংকারী, কতটা অবিবেচক হয়ে গেছি। যখন আমরা নিজেদের শ্রেণি, অর্থ আর অবস্থানের অহংকারে চোখ অন্ধ করি, তখনই এই সমাজে জন্ম নেয় অমানবিকতা। তাই আজ আমি এই লেখার মাধ্যমে সবাইকে আহ্বান জানাই— রিকশা চালককে শুধু যাত্রী নয়, মানুষ হিসেবে দেখুন। তার ঘামের মূল্য দিন, তার পরিশ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন। রিকশায় উঠার সময় যেন আপনার মুখে তাচ্ছিল্যের ছায়া না থাকে, বরং থাকুক সহানুভূতির উষ্ণতা। মানুষ হিসেবে আমাদের পরিমাপ হয় না কতটা আমরা জানি, বরং কতটা আমরা অনুভব করতে পারি তার ওপর। রিকশাওয়ালা হয়তো আপনার নাম জানে না, কিন্তু আপনি তাকে চেনেন না বলেই তার প্রতি অমানবিক হবেন, তা হতে পারে না। সে আপনাকে কায়িক শ্রমে বহন করে নিয়ে যায়—আপনি অন্তত একটা ‘ধন্যবাদ’ দিতে পারেন। একজন রিকশা চালককে সম্মান জানানো মানে শুধু একজন শ্রমজীবী মানুষকে নয়, মানবতাকেই সম্মান জানানো। কারণ যে সমাজ শ্রমিককে সম্মান দিতে জানে না, সেই সমাজ কখনও আলোকিত হতে পারে না। তাই মনে রাখবেন— রিকশার প্যাডেলে শুধু চাকা ঘোরে না, ঘোরে আমাদের মানবিকতার পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় পাশ করতে হলে দরকার নয় বড় ডিগ্রি, দরকার শুধু একটু হৃদয়। মানুষের মুখোশ খুলে ফেলুন—রিকশাওয়ালার চোখে একবার তাকান, দেখবেন সেখানে এখনো মানুষ বেঁচে আছে।