– মো. কামাল উদ্দিনঃ
সাংবাদিকতা একসময় ছিল একমাত্র “ব্রত”— যেখানে কলম মানে ছিল সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ অনেক সাংবাদিকের হাতে কলমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবসার রাশ। কেউ রেস্টুরেন্টের মালিক, কেউ বিল্ডিং কনট্রাক্টর, কেউ বা বিজ্ঞাপনের ব্যবসা করেন নিজের পরিচয়ের আড়ালে। প্রশ্ন উঠেছে— সাংবাদিক কি ব্যবসায়ী হতে পারেন? আর যদি হন, তবে তাঁর কলম কতটা নিরপেক্ষ থাকে? সাংবাদিকতা ও বাণিজ্য: একে অপরের বিপরীত মেরু-সাংবাদিকতার মূল নীতি হলো নিরপেক্ষতা, সততা ও স্বার্থবিরোধ থেকে মুক্ত থাকা। কিন্তু ব্যবসা মানেই স্বার্থ। লাভ-ক্ষতি, মুনাফা ও প্রতিযোগিতা ব্যবসার আত্মা। তাই এই দুই জগতের পথ কখনোই এক নয়। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের আচরণবিধি-তে স্পষ্ট বলা আছে: “সাংবাদিক এমন কোনো আর্থিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থে জড়িত হতে পারবেন না, যা তাঁর সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা, সত্যনিষ্ঠা বা নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করে।” অর্থাৎ, একজন সাংবাদিকের পক্ষে নিজের নামে রেস্টুরেন্ট, ঠিকাদারি বা বিজ্ঞাপন সংস্থা পরিচালনা করা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। কারণ, তখন তাঁর সংবাদ সংগ্রহ বা প্রকাশে ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িয়ে যায়। নৈতিকতার পরীক্ষায় ব্যর্থতার উদাহরণ- আমরা অনেক সময় দেখি— একজন সাংবাদিক তাঁর প্রভাব ব্যবহার করে নিজের ব্যবসা প্রচার করছেন, অথবা নিজের প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম প্রকাশিত না হয় সেই জন্য চাপ দিচ্ছেন। এই অবস্থায় সাংবাদিক আর সংবাদকর্মী থাকেন না, হয়ে ওঠেন স্বার্থরক্ষাকারী ব্যবসায়ী। চট্টগ্রাম, ঢাকা কিংবা অন্যান্য শহরে এর বাস্তব দৃষ্টান্তও অপ্রচুর নয়। কেউ রেস্টুরেন্টের মালিক, কেউ গেস্টহাউস চালান— অথচ একই সময় টেলিভিশন বা পত্রিকায় কাজ করছেন। এই দ্বৈত ভূমিকা শুধু নৈতিক নয়, বরং সাংবাদিকতার মর্যাদারও অবমাননা।
একসময় যিনি দুর্নীতি বা পরিবেশদূষণ নিয়ে প্রতিবেদন করতেন, আজ তাঁর রেস্টুরেন্টের সামনেই ছাগল জবাই হয়ে ফুটপাত রক্তাক্ত হয়, আর তিনি নীরব থাকেন— এ দৃশ্য কেবল একটি ঘটনার প্রতিফলন নয়, এটি পেশার বিবেকের ক্ষয়। আন্তর্জাতিক নীতিমালায় কঠোর অবস্থান- বিশ্বের বড় সংবাদমাধ্যমগুলো এই বিষয়ে কঠোর। BBC, Reuters, The Guardian, Al Jazeera, The New York Times — সব প্রতিষ্ঠানেই স্পষ্ট নিয়ম: “A journalist must not have any financial interest in any business they may cover.” অর্থাৎ, সাংবাদিক যদি কোনো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁকে অবিলম্বে সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হয়। কারণ, সাংবাদিকতা মানে শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়— এটি পাঠকের আস্থা রক্ষার দায়িত্ব। বাংলাদেশের বাস্তবতা ও আত্মসমালোচনা- বাংলাদেশে সরাসরি আইনগতভাবে সাংবাদিকের ব্যবসা নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু নৈতিকভাবে এটি সাংবাদিকতার চরিত্রহানী। দুঃখজনকভাবে এখন অনেক সাংবাদিক নিজেদের প্রভাব, পরিচয়, এমনকি পদমর্যাদা ব্যবহার করে ব্যবসা চালাচ্ছেন। কেউ রেস্টুরেন্ট, কেউ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, কেউ কনট্রাক্টিং— এবং আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের কেউ কেউ আবার নৈতিকতা শেখানোর বক্তৃতাও দেন! প্রশ্ন হলো— যে সাংবাদিক নিজের প্রতিষ্ঠানের অপরাধ ঢেকে রাখে, সে কীভাবে অন্যের অন্যায় উন্মোচন করবে? সংঘাত–স্বার্থের মূল ক্ষতি-একজন সাংবাদিক যখন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন, তখন তাঁর প্রতিটি সংবাদ হয়ে পড়ে সন্দেহের মুখে। পাঠক ভাবেন— এই সংবাদ কি সত্যি, না কি কারও স্বার্থে লেখা? এর ফলে ধীরে ধীরে গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষয়ে যায়। আর আস্থা হারানো মানে সাংবাদিকতার মৃত্যু।
পেশা নয়, বিবেকের প্রশ্ন- সাংবাদিকতার শক্তি তার কলমে নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতায়। ব্যবসা করলে সাংবাদিকের আর সেই স্বাধীনতা থাকে না। তাঁর লেখা, তাঁর প্রতিবেদন, তাঁর মতামত— সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একজন সত্যিকারের সাংবাদিকের জন্য সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস হারিয়ে যদি কেউ কিছু টাকার ব্যবসা দাঁড় করান, তবে তিনি লাভে নয়, ক্ষতিতেই থাকেন। সাংবাদিকতা পেশা নয়, এটি এক বিবেকের দায়িত্ব। যেখানে ব্যবসা ঢুকে পড়ে, সেখানে সংবাদ মরে যায়। “সাংবাদিক ব্যবসায়ী হতে পারেন, কিন্তু তখন তিনি সাংবাদিক থাকেন না— তিনি কেবল এক প্রাক্তন সংবাদকর্মী, যিনি নিজের বিবেক বিক্রি করেছেন টাকার বিনিময়ে।” আপনি চাইলে আমি এই লেখাটি সম্পাদনা করে প্রকাশযোগ্য সংবাদপত্রের কলাম বিন্যাসে (৫০-৭০ শব্দের ইনট্রোসহ) সাজিয়ে দিতে পারি।