প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ২২, ২০২৬, ১২:২৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ১৯, ২০২৫, ৩:১২ পি.এম

— মো.কামাল উদ্দিনঃ
সেই তিরিশ বছর—আগের কথা,১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭—
“অপরাধ জগত’ ম্যাগাজিনে ক্রাইম সাংবাদিকতার কথা
আজও মনে হয় এক দীর্ঘ, অবিরত মৃদু ভূমিকম্পের মতো। প্রতিটি ধাক্কা আমার কলমে ঝাঁকুনি দেয়, প্রতিটি রিপোর্ট কোনো না কোনো মুখোশ খুলে ফেলে। চট্টগ্রামের অপরাধ-রাজনীতি-প্রশাসন—একটি জটিল জাল যেখানে আমি কেবল নিজেকে একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবেই ভাবতাম, কিন্তু বহুতে মনে করত আমাকে ‘ক্রাইম গডফাদার’। সত্যি কথা হলো: আমি শুধু কলম চালিয়েছিলাম—তবুও কলমের কণ্ঠে অনেক শক্তির প্রতিধ্বনি উঠত।
এই পর্বে আমি আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি সেই ভয়-অভিযোগ, ষড়যন্ত্র, মিত্র-বিপক্ষ ও বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছের গল্প—একটি ঘটনা যার শিংগুলো ফেটে পড়ে আমার জীবনের ভেতর।
চট্টগ্রাম তখন রাজনৈতিক উত্তাপে ফুঁসছিল। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ফিরছে আওয়ামী লীগ; শহরের মসনদে বসেছেন এম এ মান্নান—চট্টগ্রামের একমাত্র মন্ত্রী। নগরীতে শক্তি ও আর্থিক ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। আর পাঁচলাইশের লিয়াকত আলী খান—তার অবস্থা রাজনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত বলিষ্ঠ; সে যেন নিজের এক রাজ্য গড়ে তুলেছিল। মানুষ বলত—তার সঙ্গে তাল মিলানো মানেই নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলা।
বিচিত্র ছিল সেই সময়ের চিত্র—একদিকে সরকারি দায়িত্বশীলরা, অন্যদিকে নামী-দামী ব্যবসায়ীরা; মাঝে রাজনৈতিক ক্যাডাররা ও অস্ত্র-আতঙ্ক। আর তাদের মধ্যেই জন্ম নিল ‘দুবাইওয়ালা’ সালামের অপহরণ—যে ঘটনা আমাকে সরাসরি এনে বসালো জীবন-মৃত্যুর ধারেকাছে।
সালাম অপহরণের দিনগুলোর বিবরণ বলে দিলে আপনাদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে। অপহরণকারীরা দাবি করল এক কোটি টাকা মুক্তিপণ। অভিযোগ উঠল—ক্যাটার হাবিব খান, খুখু মনি, মহি বিল্লাহসহ কয়েকজন শিবির-প্রবৃত্তের সদস্যের বিরুদ্ধে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—অস্ত্র কেনার অর্থ। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে তৎক্ষণাৎ ফেঁসে পড়ল ব্যাপারটি। সালাম ছিলেন লিয়াকত আলী খান ও দলের অন্য নেতাদের অর্থদাতা—তাই যখন খবর পৌছালো, মন্ত্রী মান্নান সরাসরি থানায় গিয়ে ওসিকে চাপ দিলেন—সালামকে জীবিত উদ্ধার করতে হবে, অপহরণকারীদের গ্রেফতার করতে হবে।
আমি তখন অনুসন্ধান শুরু করলাম। ওসি আবুল কালাম আজাদ প্রথমদিকে আমার সহায়তা নিলেন—তাঁর সঙ্গে আমি বিভিন্ন সূত্র, ফোনকল, সাক্ষী-প্রমাণ ও খোঁজাখুঁজি ভাগ করে নিচ্ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে পুলিশের ভেতরেই বিভক্তি দেখা দিল। কেউ আমার সহযোগিতা করল, কেউ সন্দেহ করল—কারণ আমার পূর্বে প্রকাশিত কয়েকটি রিপোর্টে লিয়াকত আলী খানের অনৈতিক জমি লেনদেনের কাগজপত্র ছিল। লিয়াকত প্রতিশোধের পরিকল্পনা করছিলেন—সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে সালাম অপহরণ তাঁকে আমার বিরুদ্ধে চালানোর জায়গা দিল।
তবে কাহিনীর অদ্ভুত মোড় ছিল অন্যকোথাও—শিবির নাসিরের বিরুদ্ধে অপহরণের আলাপ-পালাপ না থাকলেও বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর নাম উঠে আসে, এবং জনমনে ধারণা তৈরি হয় যে নাসির দায়ী। বাস্তবে অপহরণে সরাসরি লিপ্ত ছিল খুখু মনি, হাবিব খান ও তাদের সহচররা। শুরুতে তারা সালামকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে রেখেছিল, তারপর হাটাহাজারি মাদাশা গ্রামে আশ্রয়, শেষে কক্সবাজারের চকরিয়া-শাহাবিল অঞ্চলের কোন এক ধারে বোটে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখে—সব পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত আর ভীতসন্ত্রস্ত।
আমি তথ্য দিলাম—দল-পদলের নাম, গন্তব্য, ফোন-কলের রেকর্ড, সম্ভাব্য সাক্ষীর দিকনির্দেশনা; কখনো পাহাড়ি পথ, কখনো বোটের রুট—সবকিছু। কিন্তু একসময় বুঝতে পারলাম—পুলিশ তদন্তকারীরা তথ্যগুলোকে পুরোপুরি গ্রহণ করছে না; রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বার্থের লাইনগুলো নানা রকম চাল-চলন করেছে। আমার পুরোনো রিপোর্টের শত্রুরা—যারা আমার কলমের কারণেই খেপেছিলেন—তারা এখন সুযোগ নিলো আমার ওপর চাপ দিয়েই আমাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে।
এবং তখনই ঘনিয়ে এলো সেই মুহূর্ত—মরনের কিনারা।
এক রাতে খবর এল যে বহদ্দারহাটের চৌধুরীবাড়ীর মুজিবের বাড়িতে নাসির, হুমায়ুন, তৌহিদ ও কয়েকজনের বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেই বৈঠকে আমার ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—আমাকে চিহ্নিত করে যে কেউ হাতে পেলেই হত্যা করতে হবে। মুজিব ছিল আমার আত্মীয়—কিন্তু ঘোর শত্রুদের সভায়ও তার নাম ছিল—এখানেই ভাঁজ। আমার বন্ধু খোকন, যে ওই এলাকায় উপস্থিত ছিল, সেই বৈঠকের কানের কণ্ঠজোগে খবর দিল। খোকনের চোখে ছিল ভয় আর তৎপরতা—সে এলোমেলোভাবে সিদ্ধান্ত নিল আমাকে রক্ষা করার।
সে হট করে এসে বলল—চলো, রোজকার অভ্যাস বদলে আজ তুমি আমার সঙ্গে চলে যাবে। আমি বিশ্রামের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান ভাবতে গিয়েই হোটেল ফোর স্টারের ২০৪ নম্বর রুমে ছিলাম; খোকন আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টেনে নামিয়ে নিল। আমরা রাত-আধাঁরোর মধ্যে চাঁদগাঁও থানায় পৌঁছলাম—মালিকদের চোখে তখন বিস্ময়ের ছাপ। ঠিক সেই সময় হোটেলে থেকে ফোন এলো—ম্যানেজার ফারুক ভাই কেঁদে কেঁদে বললেন, “ভাই, তোমার রুমে হুমায়ুন ঢুকেছে—একটি একে-৪৭ রাইফেল নিয়ে। যদি তুমি রুমে থাকতেন, আজ আর বাঁচতে পারতেন না।”
সে ঘণ্টার মধ্যে এক ভীতিকর সত্য—হুমায়ুনরা আমার রুমে ঢুকেছে, গুলি করেছে, ম্যানেজার ও কয়েকজন কর্মচারীকে অস্ত্রের মুখে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল—“কোথায় সে?” তারা খুঁজছিল আমাকে। তারা ব্যর্থ হল, কারণ আমি তখন খোকনের সঙ্গে চলে গিয়েছিলাম; কিন্তু হুমায়ুন পরে ফিরে এসে বিভিন্ন রুমে গুলি চালায়। হোটেলের কাঁপুনি, দরজার কাঁচ ভাঙা, ম্যানেজারের হাঁক—সবকিছু তখনও আমার কানে বাজে। আমি বেঁচে গিয়েছিলাম; বেঁচে থাকা কেবল সৌভাগ্যের কথা না—খোকনের তৎপরতা, মুজিবের অনুকূলে থাকা বন্ধুদের সদিচ্ছা ও আমার নিজের শান্ত চিন্তার ফলও ছিল।
কিন্তু বেঁচে থাকা মানেই নিরাপদ নয়—এখন আমাকে তিনটি সামরিক-কৌশলগত শত্রুর সম্মুখীন হতে হল: এক) শিবিরের নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা আমাকে ‘শত্রু’ ভাবতো; দুই- পুলিশ প্রশাসনের মধ্যকার কিছু অংশ, যেখানে আমার রিপোর্টগুলোর কারণে অনেকে ক্ষুব্ধ; তিন- এবং সবচেয়ে গুরুতর—রাজনৈতিক নেতারা, যারা ক্ষমতা-প্রপঞ্চের স্বার্থে আমাকে নীরব করতে চাচ্ছিল। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম ত্রিমুখী যুদ্ধক্ষেত্রে—কলম হাতে একজন একাকী সারেনো যোদ্ধা।
এইসময় বোয়ালখালীর একটি কাহিনী এসে মোকাবিলা করলো—জমির ও সফির, তার ভাই রফিক ও নিকটজনেরা মিডিয়া সমাধানের পথ খোঁজে। সফির ও রফিক আমার পক্ষে কণ্ঠস্বর জুড়ে—তারা মিডিয়ায়, থানায়, স্থানীয় নেতাদের কাছে যোগাযোগ করলো। বন্ধু জমির শিবির নাসিরকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে নাসির এই অপহরণে সরাসরি জড়িত নন—এভাবে বিভ্রান্তির কুড়ালটা কিছুটা স্থবির হয়। ধীরে ধীরে, নানা সূত্রের মাধ্যমে সত্যের রশ্মি বের হয়ে আসে—খুখু মনি ও হাবিব খানই অপহরণকারীদের মধ্যকার মূল নায়ক।
আমি তখনও তথ্য-প্রেরণে পিছিয়ে যাইনি। প্রতিটি ছোট টুকরো তথ্য—একটা ফোন কলের রেকর্ড, একজন সাক্ষীর মুখের কণ্ঠ, একটি বোটের রুট—সবকিছু স্তরে স্তরে জমতে লাগল। আমার প্রতিবেদনগুলো সংবাদপত্রে ছাপা হতে থাকে; পাঠকরা এক নতুন তথ্যচিত্র দেখছিল—কেউ হয়তো বলত “এখনই গ্রেফতার হওয়া উচিত”, কেউ বলত “কাগজে কলমে কি বদলে যাবে?” কিন্তু সত্যি কথা হলো—সংবাদ আলোর মতো; অন্ধকার যতো দীর্ঘ থাকুক, আলো ঢুকলে মিলিয়ে যেতে সময় লাগে।
তবে সবচেয়ে মর্মাহত করা ছিল পুলিশের ভেতর থেকে যেসব নাম উঠে আসে—এস আই হাসেম, যার ঘরে আমি পূর্বে একটি কটু প্রতিবেদন করেছিলাম, সে আমাকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের জন্য উদগ্রীব ছিল। পুলিশের মধ্যেই এমন মানুষ ছিল যারা আমার কাজকে চোখরাঙানি হিসেবে দেখত; সেই চোখরাঙানি কখনো নিরাপদ নয়। এক সময় মনে হয়েছিল—আমার সহযোগিতা করা ও সতর্ক করা লোকেরা একে একে চাপে পড়ছে; সমর্থকদের পিছে ভাঙচুর চলছিল।
তবু মানুষের সাহস আছে—সেই সাহসেই আমি টিকে ছিলাম। খোকন, মুজিব, সফির, রফিক—তারা সবাই নানা রকমভাবে আমার পাশে দাঁড়ালেন। আর আমি লিখেছি; লিখেছি অবিরাম—কারণ লেখাই ছিল আমার অস্ত্র, জন্যে ছিল আমার আশ্রয়। আমি জানতাম—একটা তদন্ত যদি ঠিকভাবে করা যায়, যদি সঠিক প্রমাণ সংগ্রহ করা যায়, তাহলে অপরাধীরা এক এক করে ধরানো সম্ভব। আর যখন সাংবাদিকতা সত্যিকার অর্থেই অনুসন্ধানী হয়, তখন তার কাজ থাকে কেবল অভিযোগ তোলা নয়, প্রমাণ দেখানো—সমাজকে সত্যি জানানো।
এই ঘটনাবলীর মাঝেই এক অদ্ভুত রোমান আছে—আমি যেভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি, সেটি কেবল কাহিনি নয়; তা জীবনের উচ্চস্বরে ঘোষণা—“আমি লিখবো, আমি চুপ করবো না।” আমার ওপর যত অভিযোগই উঠুক, মামলার তালা যতই বাড়ুক, জীবন যতই ঝুঁকির সামনে দাঁড়াক—কলমটিকে আমি ছেড়ে দেবো না। আজও মনে পড়ে—ফোর স্টারের ২০৪ নম্বর রুমে আমার মুঠোয়ান নয়, আমার কালম সঞ্চালিত হতো। আজও মনে পড়ে ফারুক ভাইয়ের কাঁদা কণ্ঠ—তার কণ্ঠে ছিল ভয় আর কিছুটা অপরাধবোধ—“আমরা ধরেই নিয়েছি আপনি রুমে ছিলেন”—কথাটা গেঁথে আছে।
এই ছিল ঘটনাটির গহন বিবরণ—শব্দের প্রতিটা শ্বাসে আমার ভেতরের কষ্ট, ভয়, প্রতিরোধ ও অদম্য আরোহণ ধরে রাখা। অথচ এখানেই শেষ নয়—সালাম উদ্ধারের পর পরবর্তী দিনগুলো, আপনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা, রাজনৈতিক চাপ ও পুলিশি হস্তক্ষেপ—সবই আরও ভয়াবহ পর্ব। আমি সেই সব কথাও লিখব; কারণ এটি নোংরা সত্য যাকে প্রকাশ করাটা সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।