মো.কামাল উদ্দিনঃ
চলে গেলেন চিরতরে, তবু রয়েছেন প্রাণে,
স্মৃতির আকাশে আজও জ্বলে আলো তার টানে।
ভালোবাসার স্পর্শে ভেজে চোখের কোণ,
চাচা তুমি আছো এখনো হৃদয়ের মধ্যখানে।
দেখতে দেখতে চব্বিশটি বছর কেটে গেল— অথচ মনে হয় যেন গতকালের ঘটনা। আজও চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে প্রিয় মানুষ চাচা গোলাম আকবর খন্দকারের মুখখানি। সময়ের স্রোতে মানুষ বদলায়, প্রজন্ম পাল্টে যায়, কিন্তু কিছু সম্পর্ক, কিছু স্মৃতি হৃদয়ের গভীরে অমলিন থেকে যায় — ঠিক তেমনি এক চিরস্মরণীয় সম্পর্ক ছিল আমার সঙ্গে এই মহৎ মানুষের। তিনি আমার বন্ধু জসিম উদ্দিন খন্দকারের বাবা হলেও, স্নেহ-ভালোবাসায় আমাকেই যেন আপন ভাতিজা মনে করতেন। তাঁর ঘরে আমার ছিল অবাধ চলাফেরা, ছিল অগাধ মমতা। প্রায়ই সবার সামনে হাসিমুখে বলতেন — “এ আমার ভাতিজা, আমার আপনজন।” সেই কথাগুলো আজও কানে বাজে, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়। চাচা গোলাম আকবর খন্দকার ছিলেন মেধা, প্রজ্ঞা আর মানবিকতার এক অনন্য সমন্বয়। তিনি চট্টগ্রামে প্রথম দিককার রিয়েল এস্টেট ব্যবসার অগ্রদূত ছিলেন— একজন দূরদর্শী চিন্তাশীল মানুষ, যিনি তাঁর প্রজ্ঞা আর পরিশ্রমে অসংখ্য মানুষকে স্বাবলম্বী করে তুলেছিলেন। তাঁর হাতে গড়ে উঠেছে বহু মানুষের ভাগ্যের সিঁড়ি। শুধু ব্যবসায়ী নয়, তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে একজন ভূমি বিশেষজ্ঞ — চট্টগ্রামের যে কোনো স্থানের নাম বললেই সেই জায়গার ইতিহাস, চরিত্র, মালিকানা সব কিছু তিনি অনর্গল বলে দিতে পারতেন। তিনি পেশাগত জীবনে ছিলেন আনসার বাহিনীর সফল কমান্ডার। দায়িত্ব পালনে তাঁর সততা ও নিষ্ঠা তাঁকে এনে দিয়েছিল সরকারের স্বীকৃতি ও ভালোবাসা। দেশের সেবায় অবদানের জন্য তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় স্বর্ণপদক (গোল্ড মেডেল) — যা তিনি সরাসরি গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত থেকে। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন পরিমিত জীবনযাপনকারী, মার্জিত, সৌখিন এবং সাহসী মানুষ। বৃদ্ধ বয়সেও দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন, নিজের নিরাপত্তার জন্য লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ব্যবহার করতেন, কারণ তিনি জানতেন— জীবন হলো সংগ্রামের নাম। কিন্তু তিনি জানতেন না, সেই শক্ত মনের মানুষটির শরীরে নিঃশব্দে বাসা বেঁধেছে জন্ডিসের মরণব্যাধি। ২০০১ সালের অক্টোবরের এক সকালেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন— হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও হাসিমুখে কথা বলেছেন, সবার খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু সেই ১১ অক্টোবর, কথা বলতে বলতেই তিনি আমাদের চিরতরে ছেড়ে চলে গেলেন— রেখে গেলেন অগণিত শূন্যতা আর অশ্রুজল।
তাঁর মৃত্যুর পর পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়। আমি নিজেই বহদ্দারহাট পানি উন্নয়ন অফিসে তাঁর জানাজার ব্যবস্থা করেছিলাম এবং সাতকানিয়ার গ্রামের বাড়িতে তাঁকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলাম। সেই দিনটির স্মৃতি আজও আমার চোখে জল এনে দেয়। মনে হয়েছিল— যেন দ্বিতীয়বার বাবাকে হারালাম। চাচা গোলাম আকবর খন্দকার শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক প্রেরণার প্রতীক, এক আলোর মানুষ, যার মমতা, সাহস ও পরিশ্রম আজও আমাদের জীবনে অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। তিনি আমাকে নিয়ে গর্ব করতেন, ভালোবাসতেন, দোয়া করতেন — এই অনুভূতিগুলো আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ। আজ তাঁর ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করছি। চাচা গোলাম আকবর খন্দকারের আত্মা আল্লাহ তায়ালা যেন জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চতম স্থানে স্থান দেন— এ দোয়া করি অন্তরের গভীরতা থেকে। আরও একদিন তাঁর স্মৃতির পাতায় ফিরে গিয়ে লিখবো সেই মানুষটির জীবন ও কর্মের পূর্ণ ইতিহাস— ইনশাআল্লাহ।