ড. মুহাম্মদ ইউনুস স্যারের প্রতি খোলা চিঠি-
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা,
সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্রহণ করুন।
আমরা চট্টগ্রামবাসী গভীর বেদনা, ক্ষোভ ও অসহায়তা নিয়ে আজ আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে যে “মূল্যায়ন পরীক্ষা” আয়োজন করা হয়, তার আড়ালে প্রায় ৫০০ জন কর্মীকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে এটি ছিলো একটি পূর্বপরিকল্পিত ছাঁটাই প্রক্রিয়া, যেখানে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা বা মানবিকতার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে—এটি দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বহু অভিজ্ঞ কর্মী, যারা ৭-৮ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন, তারাও ছাঁটাইয়ের তালিকা থেকে বাদ পড়েননি। এদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক কর্মী চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিবাসী, যা চট্টগ্রামবাসীর কাছে একধরনের বৈষম্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
চাকরি হারানো কর্মীরা জানিয়েছেন—তাদের কোনো সতর্কবার্তা, প্রশিক্ষণ কিংবা সুযোগ দেওয়া হয়নি। হঠাৎ করেই তাদের হাতে টার্মিনেশন লেটার ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যেই অনেক কর্মী সেই চিঠি প্রকাশ করেছেন, যা তাদের অসহায়তার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের কর্মীরা সংবাদ সম্মেলন করেছেন, প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন আয়োজন করেছেন। বক্তারা অভিযোগ করেছেন—
ইসলামী ব্যাংক চট্টগ্রামবাসীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে।অভিজ্ঞ ও দীর্ঘদিনের কর্মীদের বিনা কারণে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।এতে শুধু কর্মচারীরা নয়, তাদের পরিবারগুলোও মারাত্মক অনিশ্চয়তায় পড়েছে। অনেক পরিবারে একমাত্র উপার্জনকারী সদস্যকেই চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে, যার ফলে তারা আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। শ্রম আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এত বড় আকারে কর্মী ছাঁটাই করে, তবে তা অবশ্যই আইনি কাঠামোর ভেতরে ও যৌক্তিক কারণে হতে হবে। অথচ ইসলামী ব্যাংকের এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না, শ্রমিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনাও হয়নি। এটি শ্রম আইন, মানবাধিকার এবং কর্মীদের মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। মাননীয় স্যার, প্রশ্ন হলো—
ইসলামী ব্যাংক যদি চট্টগ্রামে ব্যবসা করতে পারে, তবে চট্টগ্রামের মানুষ কেন চাকরিচ্যুত হবে?
এ ব্যাংক কি শুধুই মুনাফার জন্য চট্টগ্রাম ব্যবহার করবে, অথচ চট্টগ্রামের মানুষকে চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার করবে?
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীর অধিবাসীদের প্রতি এ ধরনের অবমাননা ও অন্যায় আচরণ কি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য?
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা,
আপনি শুধু এই দেশের নয়, পুরো বিশ্বের কাছে মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক। আর আপনি চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান হওয়ায় আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনার দৃঢ় অবস্থানই হতে পারে আমাদের আশার আলো। আমরা বিনীতভাবে আপনার কাছে কিছু নির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করছি— ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক থেকে অন্যায়ভাবে ছাঁটাই হওয়া চট্টগ্রামের কর্মীদের অবিলম্বে পুনর্বহাল নিশ্চিত করা।
ছাঁটাই প্রক্রিয়ার ওপর একটি স্বচ্ছ তদন্ত কমিটি গঠন করা, যাতে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। ভবিষ্যতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড যেন কোনোভাবেই চট্টগ্রামবাসী বা অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ না করে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। শ্রম আইন অনুসারে কর্মীদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও শ্রম মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় করা। মাননীয় স্যার, আজ চট্টগ্রামের মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন—যদি ইসলামী ব্যাংক চট্টগ্রামবাসীর সন্তানদের এভাবে চাকরি থেকে বঞ্চিত করে, তবে আমরা কি এ ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখবো?
চট্টগ্রামের মানুষের উপর বৈষম্য চলতে থাকলে ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়েও ভাবা শুরু করতে হবে।
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা,
চট্টগ্রামবাসীর এই খোলা চিঠি কোনো প্রতিবাদ মাত্র নয়—এটি ন্যায়বিচারের আহ্বান। আমরা চাই, আপনার প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোতেই এই অমানবিক ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের অবসান ঘটুক।
আপনার সদয় হস্তক্ষেপ এবং ন্যায়সংগত পদক্ষেপের অপেক্ষায় রইলাম।
চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে
সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছান্তে
মো.কামাল উদ্দিন
মহাসচিব- চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।