মো.কামাল উদ্দিনঃ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি শব্দ বারবার আমাদের বিবেককে কাঁপিয়ে দেয়— “গুম”। এই শব্দটি কেবল একটি মানুষকে হারানোর দুঃখ নয়, বরং পরিবারকে শূন্য করে দেওয়া, সমাজকে আতঙ্কিত করা এবং রাষ্ট্রকে অমানবিক করে তোলার প্রতীক। সেই ভয়াবহ বাস্তবতার শিকার হন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার জনপ্রিয় চেয়ারম্যান ও নেতা হেয়াদ মোহাম্মদ আবু জাফর। ২০১০ সালের ২৭ মার্চ, সকালবেলায় ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি পরিবারের সাথে খালার বাড়িতে বেড়াতে যাবেন বলে। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে গেল তার জীবনের শেষ যাত্রা। সবার চোখের সামনে সাদা পোশাকে সশস্ত্র একদল লোক নিজেদের র্যাব-৭ পরিচয় দিয়ে তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গেল। তারপর থেকে তিনি আর নেই। পরিবার দিন গুনেছে, মাস গুনেছে, বছর গুনেছে—কিন্তু আবু জাফর আর ফেরেননি। এক মানুষের রাজনৈতিক জীবন, এক সমাজের ভরসা হেয়াদ মোহাম্মদ আবু জাফর ছিলেন সাধারণ রাজনীতিবিদ নন। তিনি ছিলেন রাউজান অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে ভরসার নাম।ছাত্রজীবনে ছিলেন রাউজান উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে উপজেলা সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। শিক্ষার প্রসারে তিনি পশ্চিম উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে এক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়তে অবদান রাখেন। তিনি রাজনীতি করতেন মানুষের জন্য, নিজের ক্ষমতা বা স্বার্থের জন্য নয়। তাই গ্রামাঞ্চলের মানুষ তাকে ভালোবেসে বলত—“আমাদের জাফর চেয়ারম্যান”। ঘটনার দিন: আতঙ্কের কালো সকাল- সেই সকালটিকে আজও তার পরিবার ভোলেনি। খোলা রাস্তায়, টুইয়্যা পাড়া জাকির হোসাইন রোডে, একদল লোক মাইক্রোবাস নিয়ে আসে। সবার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, চোখে ভয়ঙ্কর দৃষ্টি। মুহূর্তেই গাড়ি থেকে টেনে নামানো হলো আবু জাফরকে। স্ত্রী, সন্তান, ভাই—সবাই চিৎকার করলেও কোনো লাভ হয়নি। আশেপাশের মানুষও আতঙ্কে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। কারও চোখে প্রতিরোধের শক্তি ছিল না। কারণ তারা জানত—এরা সাধারণ অপরাধী নয়, এরা সেই শক্তি যার বিরুদ্ধে কথা বলার মানে মৃত্যু। এরপর সেই মাইক্রোবাস দৌড়ে পালাল, সঙ্গে নিয়ে গেল একজন মানুষকে, যিনি ফিরবেন না আর কোনোদিন। পরিবার: অপেক্ষার শেষহীন যন্ত্রণা- আজ ১৫ বছর কেটে গেছে। আবু জাফরের স্ত্রী ইসমাত আরা এখনও প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন, যদি হঠাৎ কোনোদিন খবর আসে—“তিনি বেঁচে আছেন, ফিরবেন।” সন্তানরা বড় হয়ে গেছে বাবাহীন জীবনে। তাদের শৈশব কেটেছে প্রশ্নে—“আমাদের বাবা কোথায়?” কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি। শুধু গভীর রাতে কান্না আর দিনের পর দিন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো—এই হল পরিবারের জীবন। গুম: রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নগ্ন রূপ-এই ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তির নয়, এটি একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে যখন ভিন্নমত দমনের নামে গুমকে হাতিয়ার বানানো হয়েছিল, তখন হেয়াদ আবু জাফরও সেই অমানবিক কৌশলের শিকার হন।
২০১৪ সালে কর্নেল হাছিনুর রহমান প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর নির্দেশে র্যাব কর্মকর্তা কর্নেল জিয়াউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে আবু জাফরকে গুম করা হয়। এই বক্তব্য প্রমাণ করে—এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।
গ্রাম ও সমাজ: স্মৃতির ভেতরে বেঁচে থাকা- রাউজানের গ্রামে এখনও মানুষ জাফর চেয়ারম্যানকে স্মরণ করে। কারও স্কুলের ভর্তি, কারও চিকিৎসার খরচ, কারও জমির ঝামেলা—সব জায়গায় তিনি ছিলেন ভরসা। আজও বয়স্করা বলেন, “আমাদের চেয়ারম্যান থাকলে এভাবে দুর্দশায় পড়তে হতো না।” তার অনুপস্থিতি শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, এটি গোটা সমাজের ক্ষতি। রাষ্ট্রের নীরবতা: অমানবিক উদাসীনতা- থানায় জিডি হলো, প্রশাসনের কাছে ধরনা দেওয়া হলো, মন্ত্রী-এমপিদের কাছে কাকুতি-মিনতি হলো। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। শুধু আশ্বাস, আর সময়ক্ষেপণ। রাষ্ট্র যাকে রক্ষা করার কথা, সেই রাষ্ট্রই যদি মানুষকে গুম করে—তাহলে জনগণের আর আশ্রয় কোথায়? আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও বিবেকের প্রশ্ন- মানবাধিকার সংগঠনগুলো একাধিকবার গুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল—সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিন্তু দেশে কোনো পরিবর্তন আসেনি। প্রশ্ন জাগে—একজন জনপ্রতিনিধি যদি এভাবে হারিয়ে যান, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? ইতিহাস কি ক্ষমা করবে? হেয়াদ মোহাম্মদ আবু জাফরের গুম শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি এক প্রজন্মের বিবেকের কাছে প্রশ্ন। একজন জনপ্রিয় চেয়ারম্যান, একজন নেতা, একজন স্বামী ও বাবা—সবাইকে সবার চোখের সামনে থেকে কেড়ে নেওয়া হলো, অথচ ন্যায়বিচার আজও অধরা। তার সন্তানরা বড় হয়ে গেছে বাবাহীন জীবনে, স্ত্রী বেঁচে আছেন এক অনন্ত অপেক্ষার ভেতর। গ্রাম হারিয়েছে তার প্রিয় মানুষটিকে। আর রাষ্ট্র হারিয়েছে নিজের মানবিক মুখ। ইতিহাস এই গুমের দায় কখনও ক্ষমা করবে না। ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনতেই হবে, না হলে প্রতিটি গুমকৃত মানুষের আত্মা এই মাটিকে প্রশ্ন করতেই থাকবে— “আমরা কি এই দেশটিকে স্বাধীন করেছিলাম এ অন্যায়ের জন্য?”